সোমবার, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১২:৪৮

সঞ্চয়

Ant-individual-মনযূরুল হক : এক বনে বাস করতো একটি ছোট্ট পিপিলিকা। সে তার বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে থাকতো।

ছোট্ট পিপিলিকার মা যতদিন সুস্থ ছিলেন, ততদিন তার নিজের জন্য এবং বাচ্চা পিপিলিকাটির জন্য সুস্বাদু খাদ্যকণা জোগাড় বরে আনতেন। কিন্তু তিনি যেই না অসুখে পড়লেন, আর বুড়িও হয়ে গেলেন, তখনি খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব এসে পড়লো ছোট্ট পিপিলিকার কাঁধে।

তার মা তাকে খুব করে বুঝিয়ে বললেন— দেখো, বর্ষকাল আসছে। বৃষ্টি ঝেঁপে আসার আগে আগেই অনেক শস্যদানা সঞ্চয় করে রাখতে হবে। যেনো শীতের দিনে ঠা-ায় আরামে নিশ্চিন্তে দিন কাটানো যায়। তখন যেনো খাবারের অভাব দেখা না দেয়।

ছোট্টমণি প্রথমদিন বেশ পরিশ্রম করলো। বহুদূর থেকে কিছু দানা-কণা জোগাড় করে ঘরে আনতেও পারলো। কিন্তু পরদিনই বেঁকে বসলো। আরো বেশি খাদ্যের তালাশে যেতে অস্বীকার করলো। বললো— আমি আর পারবো না মা। আমার খুব কষ্ট হয়। আর আমি এখনো অনেক ছোট।

মা বড় ভাবনায় পড়ে গেলেন। বললেন— ছোট্টমণি, এই অল্প ক’টি দানায় তো আমদের কিচ্ছু হবে না। পরে শীত এলে আমরা কী দিয়ে পেট ভরবো। সে সময় খাবার মোটেই পাওয়া যাবে না। সামান্য শস্যকণাও নেই হয়ে যাবে।

ছোট্ট পিঁপড়েটি বললো— এ অনেক শক্ত কাজ। আমি তো ছোট। তাই সামান্য খাদ্য আনতেই আমার দম ফুরিয়ে যায়।

এইটুকু বলেই অলস পিপিলিকা ঘুমিয়ে গেলো।

তবে মায়ের আবদার দেখে পরদিন আবার সে খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো। যেতে যেতে ভাবলো— আজ থেকে আমি বড় বড় খাদ্যদানা কুড়িয়ে নেবো। তাহলে অল্পতেই অনেক হয়ে যাবে। একটি গাছের নীচে অনেকগুলো পিঁপড়েকে সারি বেঁধে যেতে দেখলো সে। গাছের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছার পর তার নজরে এলো সেখানে এত রুটির টুকরো পড়ে আছে, গুণে শেষ করা যাবে না।

সেখানে আরো দেখলো, যে সব পিপিলিকা তার মতোই ক্ষুদ্র, ওরা বেশ হেসে খেলে দৌড়ে দৌড়ে রুটির ছোট ছোট কণা মুখে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর বড় পিঁপড়েরা মুখে আঁকড়ে নিয়ে যাচ্ছে বড় বড় দানা। সেও একটি বড় দানা মুখে কামড়ে ধরলো এবং বাড়ির পথে চললো। কিন্তু খানিক যেতে না যেতেই তার পা ভারী হয়ে এলো। পায়ের গোছা ফুলে হয়ে গেলো ঢোল। ক্লান্তিতে নুয়ে পড়লো সে।

এ সময় এক বুড়ো পিঁপড়ের চোখ পড়লো ছোট্ট পিপিলিকার ওপরে। সে ছোট্ট পিপিলিকার এই কা- দূর থেকে লক্ষ করছিলো। কাছে এসে বললো— ভাই ছোট, কী ব্যাপার বলতো আমাকে?

—কী বলবো, আমার খুব কষ্ট।

—কী কষ্ট তোমার আমাকে বলো। তুমি ছোট হয়েও এত বড় একটা দানা নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?

একজন সুহৃদ বন্ধু পেয়ে কষ্ট উথলে উঠলো হৃদয়ে। ঝর ঝর করে কেঁদে ভাসিয়ে দিলো ছোট্ট পিঁপড়ে। তারপর সব কথা খুলে বললো বুড়ো পিঁপড়ের কাছে।। সব শুনে বুড়ি তো হেসে কুটিকুটি। এরপর বুড়িমা ছোট্ট পিপিলকাকে এক ছায়াময় বটবৃক্ষের নীচে নিয়ে বসালো। শীতল হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেলো দুজনারই।

এবার বুড়ি সেই ছোট পিপিলিকাদের কথা মনে করিয়ে দিলো, যারা দল বেঁধে নেচে গেয়ে রুটির টুকরো নিয়ে ফিরছিলো। বললো— চলো, তুমিও এদের মতো আনন্দে কাজ করবে। খাবারের ছোট ছোট কণা ঘরে নিয়ে যাবে তুমি। বড় দানা তুমি পারবে না বইতে।

ছোট্ট পিপিলিকার চেহারা মলিন হয়ে গেলো।

—আচ্ছা যাও, তুমি ছোট ছোট কণা আমার ঘরে নিয়ে যাবে। বিনিময়ে আমি বড় বড় দানা তোমার ঘরে পৌঁছে দেবো। এখন হলো তো!

এবারে খুশির আলো দেখা গেলো ছোট্টমণির মুখে।

—তবে আমার একটি শর্ত আছে। বুড়ি বললো।

—আমি আপনার সব শর্ত মানতে রাজি খালামণি। খুশি হয়ে বললো সে।

বুড়িও ওর মুখে খালামণি ডাক শুনে ভারি খুশি হলো। বললো— প্রতিদিন তোমাকে তিন ঘণ্টা করে কাজ করতে হবে। পারবে না?

বুড়ির শর্ত শুনে ছোট্টমণি মহাখুশি। তক্ষুণি শর্তে রাজি হয়ে গেলো। কাজ করবে বলে কথা দিলো সে।

দিন চলে যাচ্ছে। ছোট্ট পিপিলিকা প্রতিদিন নিয়ম মতো কাজ করছে। খাবারের ছোট ছোট কণা বুড়ির ঘরে নিয়ে যায়। আর বুড়ি তার ঘরে পৌঁছে দেয় বড় বড় দানা।

ছোট্টমণির মা-ও বুড়িকে পেয়ে চিন্তামুক্ত। খাবার সংগ্রহে সে কতই না সাহায্য করছেন তাদের। ছোট্টমণি যেই না আলস্যে গা এলিয়ে দিতে যায়, অমনি বুড়ি তাকে শর্ত মতো কাজ করার জন্য তাগিদ দেন।

—ব্যস্। আজ ক্ষান্ত দাও, পিলি। আর তোমাকে খাবারের খোঁজে বেরোতে হবে না। একদিন বুড়ি এসে ছোট্ট পিপিলিকাকে বললো। এতদিনে বুড়ি তাকে আদর করে ‘পিলি’ ডাকা শুরু করেছেন।

—কিন্তু খালামণি, আমি তো আরো কিছু খাদ্য জমিয়ে রাখতে করতে চাই। পিলি আবদার করলো।

আসলে পিলি চাচ্ছিলো বুড়িমা যেনো আরো কিছুদিন তাদের ঘরে বড় খাবারের দানা পৌঁছে দেন।

বুড়ি উত্তর দিলো— না, ভাই। দেখো তুমি, কত বেশি খাবার তোমার ঘরে মজুদ হয়েছে। এগুলোই যথেষ্ট। বুড়ি তাকে বুঝিয়ে বলার পর পিলি শান্ত হলো।

ছোট্ট পিলির ঘরে সত্যিই অনেক খাবার জমে ছিলো। খাবারের বড় বড় দানা দেখে পিলি তার বুড়িমা ওরফে খালমণির যারপরনাই কৃতজ্ঞ।

সময় বয়ে যায়। ঋতুর বদলে এক সময় উত্তুরে ঠা-া বাতাস বইলো। হু হু করে জেঁকে এলো শীত। পিঁপড়ের বস্তিতে সবাই ঘর-দোর আটকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম করছে। এই ঋতুটি তাদের বেশ আরামে আহ্লাদে কেটে যায়।

আচানক পিলির দরোজায় খুটখুট আওয়াজ শোনা গেলো। দরোজা খুলেই পিলি খুশিতে আত্মহারা। মেহেরবান খালামণি যে সামনে দাঁড়িয়ে। আনন্দে চিৎকার করে বললো— মা, দেখে যাও খালামণি এসেছেন।

পিলি তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে নিয়ে এলো। মন ভরে আদর আপ্যায়ন করলো বুড়িমার। তার মা-ও এই দয়মন্ত বুড়িকে শুকরিয়া জানতে ভুললো না।

—খালামণি, আপনার দয়ার কথা ভুলবো না আমি। বুড়িকে বললো পিলি।

—কেনো পিলি? কোন দয়ার বলছো তুমি? বুড়ি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

—আপনি কত কষ্ট করে এই সব জমানো খাবার আমাদের দিয়েছেন! খাবার বড় একটি স্তূপের দিকে ইশারা করলো পিলি।

—আচ্ছা। তাই নাকি! এই বলে বুড়ি হাসিতে ফেটে পড়লো। কিন্তু তুমি তো সেই খাবার দেখোই নি, যা আমি গুদাম ভরে আমার বাড়িতে রেখে দিয়েছি। আর তার সবটাই তুমি এনে দিয়েছো।

গুদাম ভরা খাবার, সব আমি এনেছি! বুড়িমার কথা শুনে পিলি যেনো আকাশ থেকে পড়লো। বললো— খালমণি, কী বলেন এসব। সে তো ছোট ছোট কিছু খাদ্যের কণা ছিলো! তার সাথে আপনার দেয়া এই বড় বড় দানার কি কোনো তুলনা হয়?

—আচ্ছা চলো, নিজে দেখবে, তবে তুমি বুঝতে পারবে যে, কার সঞ্চয় বেশি। তুমি যা আমাকে সংগ্রহ করে দিয়েছো সেগুলো, নাকি আমি তোমার ঘরে যা পৌঁছে দিয়েছি, তা?

মায়ের অনুমতি চাইলো বুড়ি, যেনো পিলিকে তার বাড়িতে একটিবার নিয়ে যেতে দেন। যেনো তার সঞ্চিত খাদ্য চাক্ষুস দেখাতে পারেন। মা খুশি মনে যাবার অনুমতি দিলেন। বুড়ি ছোট্ট পিলিকে নিয়ে তার বাড়ির পথে রওনা হলো।

—আরে বুড়িমা…! গুদাম ভর্তি খাদ্য দেখে বিস্ময়ে চিৎকার বেরিয়ে এলো পিলির মুখ থেকে।

—কী ছোট্টমণি, দেখলে তো তুমি কত কণা জমা করেছো। এখন বলো, আমার ওটা বেশি, নাকি তোমার এই ছোট ছোট কণা? মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন বুড়িমা।

—আমি তো মানতেই পারছি না, খালমণি। কী করে আমি এত খাবার জমা করেছি?

—দেখো পিলি..। বুড়ি তাকে বুঝিয়ে বললেন— এই সব খাবার তোমারই সংগ্রহ করা। এটা এত বেশি হয়েছে, কারণ, তুমি পূর্ণ একটি মাস ধরে প্রতিদিন অত্যন্ত পরিশ্রম আর সততার সঙ্গে কাজ করেছো। আমার বিশ্বাস রক্ষা করে কাজ করেছো। কাজের মাঝে কখনো একটুখানি অলসতা করো নি তুমি। কাজ করেছো তুমি নিয়ম মেনে ধারাবাহিকতার সাথে। এটা তারই মাজেজা। মনে রেখো, চেষ্টা ও পরিশ্রমকে নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে সফল তুমি হবেই। এত বড় কাজ তখন আঞ্জাম দিতে পারবে তুমি, যা দেখে নিজের কাছেই অবাক লাগবে। যেমন অবাক হয়েছো তুমি এখন।

বুড়িমা আরো কিছু খাদ্য পিলিকে দিলেন তার বিশাল মজুদ থেকে। পিলির জমানো সেই ছোট ছোট শস্যদানা আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাদ্যকণার সম্ভার থেকে। কৃতজ্ঞতা আর অুনগ্রহের ভারে নুইয়ে পড়া ছোট্ট পিপিলিকা পিলি কেবল বলতে পারলো— এর চেয়ে অনেক ভালো বিনিময় খোদা আপনাকে দান করুন।

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

৪৩ টি পতিতালয়ের মালিকের লেখা কবিতা কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত?

ফেসবুকীয় মতামত-:: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী রবী ঠাকুরের কবিতা কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত? জাতি তা জানতে চায়…… ...