শুক্রবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৫:৪৬
Home / কবিতা-গল্প / একজন কিন্তু দেখছেন
Apples, Pink lady

একজন কিন্তু দেখছেন

Apples, Pink lady

মনযূরুল হক : চারিদিকে মন্দ লোকের ভিড় দেখা গেলেও ভালো মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। অনেকেই আছেন, তারা হয়তো খুব বুদ্ধিমান নন, ধনবান নন, দেখতেও তেমন সুন্দর নন, কিন্তু তার ভেতরে এমন রতœ লুকিয়ে আছে, যা আমাদের খোলা চোখে ধরা পড়ে না। কবি বলেছেন-

আমার মতে জগৎটাতে ভালোটারই প্রাধান্য

মন্দ যদি তিনচল্লিশ, ভালোর সংখ্যা সাতান্ন

এর মানে হলো, মন্দ যত বেশিই মনে হোক, ভালোর চেয়ে বেশি নয়। ভালো সবসময় একটু হলেও বেশি থাকে। যদি একশজন মানুষ তোমার আশপাশে থাকে, দেখবে তাদের তেতাল্লিশ জন মন্দ হলেও হতে পারেন, তবে বাকি সাতান্ন জন অবশ্যই ভালো।

তেমনই একজন ভালো মানুষ বাস করতেন আমাদের দেশ থেকে বহুদূরের এক দেশে। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে। এক নির্জন গ্রামে তিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেশ সুখেই বসবাস করছিলেন তিনি। নাম তার আব্দুর রহমান।

তিন ছেলেই বাবাকে মনে-প্রাণে ভলোবাসতো। বাবাও ভালোবাসতেন ছেলেদের। বাবা ছেলেদের খুব বেশি লেখাপড়া শিক্ষা দিতে পারেন নি। গরিব বলে নয়। তাদের গ্রামে বড় স্কুল নেই। ছেলেরা যা কিছু শেখার বাবার হাত ধরেই শিখেছে।

বাবা সব সময় তার ছেলেদের বলতেন সৎ হতে। বলতেন আল্লাহকে ভয় করতে। পাপ, অন্যায় আর অসুন্দর থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিতেন ছেলেদের।

কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম মতো সবাই চিরদিন বেঁচে থাকতে পারে না। তেমনই করে এক সময় এই ভালো মানুষ বাবার জীবন ফুরিয়ে এলো। তিনি বুঝতে পারলেন, খুব বেশিদিন বেঁচে থাকার সুযোগ হবে না তার।

গরিব হলেও আব্দুর রহমানের কাছে বিশাল এক ধনভাণ্ডারের খোঁজ ছিলো। এটা তার পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া সম্পদ। তিনি তা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আগলে রেখেছেন। তার ইচ্ছে হলো, ছেলেদের তিনি বলে যাবেন, তার যেনো সেই ধন উদ্ধার করে নিজেদের কাজে ব্যয় করে। কিন্তু এই ইচ্ছার কাছে এসেই তিনি ভাবনায় পড়ে গেলেন। আশঙ্কা হলো, তার মৃত্যুর পর ছেলেরা যদি সত্যি সত্যি সেই ধন-সম্পদ তুলে আনতে পারে, তাহলে তাদের সবচে’ বড় শত্রু হয়ে যাবে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-পড়শিরা। তারা যখন জানতে পারবে এই ছেলেদর কাছে এত সম্পদ, তখনই নানা রকমের ঝামেলায় পড়ে যাবে তারা।

বাবা খুব ভাবলেন। ভাবলেন ছেলেদের জন্যে। ভাবলেন, তিনি চলে গেলে তার ছেলেরা পৃথিবীর এত মন্দ ও অসুন্দরের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে তো! তার ভাবনা হলো, ছেলেদের যদি সম্পদ গোপন রাখার বিষয়টি বুঝিয়ে  যেতে না পারেন, তাহলে হয়তো তারা বিপদে চলে যেতে পারে। শান্ত ও সুন্দর জীবন তারা হরিয়ে ফেলবে, যদি আল্লাহকে ভুলে যায় তারা।

তাই বাবা আব্দুর রহমান তার তিন ছেলেকে ডাকলেন। পরখ করে দেখতে চাইলেন, তারা কতটুকু তাদের সম্পদ গোপন রাখতে পারবে। মানুষকে না জানিয়ে কতটুকু তারা রক্ষা করতে পারবে। সম্পদ যদি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে তারা, তাহলে একটু একটু করে তা থেকে তারা ভালো কাজেও ব্যয় করতে পারবে। নিজেদের অভাবও মুক্ত থাকবে। মানুষের সাহায্য চাইতে হবে না তাদের। কিন্তু যদি দেখা যায়, ছেলেরা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, তাহলে তিনি তার ধণভাণ্ডারের  কথা বলবেন না ছেলেদের।

তিনি তিন ছেলের হাতে একটি করে আপেল ধরিয়ে দিলেন। বললেন- যাও, এই আপেল এমন জায়গায় লুকিয়ে খেয়ে আসবে, যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না। তোমাদের মধ্যে যে এ কাজটি ভালোভাবে করতে পারবে, তাকে কাল আমি পুরস্কার দেবো।

তিন ভাই প্রথমে বাবার দোয়া নিলো। তারপর ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো। সেদিন দিনমান বাবা আর ছেলেদের কাজের কথা জানতে চাইলেন না।

এদিকে তিন ভাইও কাজে নেমে পড়েছে। যেহেতু বাবা বলেছেন, কেউ যেনো দেখতে না পায়, তাতে বোঝা যায়, বিষয়টা বেশ গোপনেই সারতে হবে। তিন ভাইই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। কারো সাথে কারো দেখা নেই। বাবা এভাবে বলেন নি যে, তোমাদের ভাইয়েরা একজন আরেকজনের খাওয়াটা যেনো না দেখে। বরং তিনি বলেছেন কাউকেই দেখানো যাবে না। সুতরাং নির্জন জায়গার খোঁজে মগ্ন হলো সবাই।

পরদিন। আব্দুর রহমান আবার তিন ছেলেকে ডাকলেন। এক এক করে সবার কথা শুনলেন।

বড় ছেলের নাম আব্দুল্লাহ। বাবা সবার আগে তাকেই জিজ্ঞেস করলেন- কি, তুমি এমন জায়গা খুঁজে পেয়েছো, যেখানে আপেল খাওয়ার সময় তোমাকে কেউ দেখে নি?

আব্দুল্লাহ বললো- শুকরিয়া বাবা! আমি আপনার দেয়া আপেল একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে খেয়ে ফেলেছি। ওখানে আমাকে কেউ দেখতে পায় নি।

‘ও আচ্ছা’ বলে বাবা এবার মেজো ছেলেকে প্রশ্ন করলেন। মেজো ছেলে ইউসুফ। বাবা বললেন- বলো ইউসুফ। কী করেছো তুমি?

ইউসুফ উত্তর করলো- বাবা, আমি সেই আপেলটি খেতে একটি নির্জন ঘর বেছে নিয়েছিলাম। তারপর দরোজা জানালা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে তবেই খেয়েছি। আমি নিশ্চিত বাবা, আমাকে তখন কেউ দেখে নি।

সবার ছোট সালিম। বাবা সবেশেষে তার কাছে জানতে চাইলেন- সালিম, বলো বাবা, তুমি কী করলে?

সালিমের মন খারাপ হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে বসে রইলো সে। ভেবে পেলো না কী জবাব দেবে। বাবা দেখলেন, সালিমের মুখ মলিন হয়ে এসেছে। তিনি কাছে টেনে নিলেন সালিমকে। বললেন- লজ্জা করো না বাবা। বলো। যদি তোমার কোনো কষ্ট থেকে থাকে তাও বলতে পারো।

সালিম মাথা তুললো। তারপর ধীরে ধীরে জবাব দিলো- বাবা, আমি পারি নি।

-পারো নি? তুমি একাট আপেল লুকিয়ে খেতে পারো নি? অবাক হলেন বাবা।

-আমি খুব ভেবেছি, বাবা। অনেক খুঁজেছি। কিন্তু আমার একটি জায়গাও এমন মেলে নি, যেথায় কেউ আমাকে দেখছে না। তাই আপেলটি আমার আর খাওয়া হয় নি, বাবা। আমি দু:খিত।

সালিম তার আপেল বাবার সামনে রেখে দিলো।

বিস্মিত বাবা জানতে চাইলেন- কেনো? কেনো পেলে না তেমন একটি লুকানোর জায়গা? তোমার বড় দুই ভাইয়ের থেকে তোমার বুদ্ধি কিছু কম, তা তো আমি জানি না।

সালিম এবার সঙ্কোচ ছেড়ে বললো- বাবা, তুমি না একদিন আমাদের বলেছো, আল্লাহর এক নাম ‘বাসীর’। এর অর্থ সব সময় সব জায়গায় সবকিছু যিনি দেখেন। মানে আমি যেখানে যাবো সেখানেই তো তিনি দেখবেন। আমি যে লুকানোর কোনো জায়গা খুঁজে পাই নি, তা নয় বাবা। কিন্তু যেখানেই গেছি, আমার মনে হয়েছে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। তাই আপেলও খেতে পারি নি।

আব্দুর রহমান তার সবচে’ ছোট ছেলের বুদ্ধিতে মুগ্ধ হলেন। দেখলেন, সন্তানের মধ্যে আল্লাহর ভয় পরিপূর্ণ হয়েই আছে। তিনি বুঝলেন, যেই সন্তানের হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয় এতটা গভীর, তার শক্তি সম্পর্কে এতটা নির্দ্বিধ, তার কাছে পৃথিবীর সম্পদ সবচে’ নিরাপদ। এ সম্পদ তাকে বিপদে ফেলবে না। সে-ই এ সম্পদ সবচে’ সুন্দর বণ্টন আর সুরক্ষা দিতে পারবে।

অতএব, বাবা সালিমকেই পুরস্কার দিলেন।

শেষে সব ছেলেকে লক্ষ করে বাবা বললেন- আমার প্রিয় সন্তানেরা! নিশ্চয় আল্লাহ আমদের সবাইকে সব সময় দেখেন। আমাদের সব কথা শোনেন। আমরা মনে মনে যা কিছু ভাবি, তাও তিনি জানেন। তিনি অন্তর্যামী। অর্থাৎ আমাদের মনের গোপন কথাও তিনি শুনতে পান।

আমি সালিমের দায়িত্বে কিছু সম্পদ রেখে যাচ্ছি। তোমরা মিলেমিশে তা থেকে খরচ করবে। মানুষের উপকারে ব্যয় করবে। আমার বিশ্বাস, যেহেতু একটি আপেল লুকিয়ে খাওয়ার সময়ও তোমাদের আল্লাহর কথা মনে হয়েছে, সুতরাং এ সম্পদ অন্যায় কাজে খরচ করতে গেলেও তাকে তোমরা ভয় করবে। তখন আর পাপের পথে যাওয়া হবে না তোমাদের।

আল্লাহর হুকুম কখনো অমান্য করো না। তার সকল আদেশ-নিষেধ পালন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ওপরে খুশি হবেন। সন্তুষ্ট থাকবেন। এ পৃথিবীতে তোমরা সুখে শান্তিতে ও নিরাপদে থাকবে। আর মৃত্যুর পরে পাবে বেহেশতের অনাবিল আবাস। চিরকাল চিরসুখে কাটবে সেখানে। সেখানে মানুষ যা চাইবে, তা-ই মিলে যাবে। তোমাদের মনে যে বাসনা হবে, সব সেখানে পূরণ হবে। বেহেশতে আমরা একটি পাখি দেখবো। এত সুন্দর। খেতে ইচ্ছে করবে। তখনি সে পাখি রান্না হয়ে সামনে হাজির হয়ে যাবে। খাওয়া শেষ হলে আমাদের অভুক্ত হড্ডির গায়ে আল্লাহ নতুন করে গোশত পরিয়ে দেবেন। প্রাণ দেবেন। আবার সে শূন্যে উড়ে যাবে।

আমরা সবাই আবার একদিন সেই বেহেশতের বাড়িতে মিলিত হবো। তাহলে বলো, কী মজাই না হবে!

বাবা বলে চলছেন..। তিনটি বালকের চোখে স্বপ্ন হয়ে ভাসছে এক সীমাহীন সুখের রাজ্য।..

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

৪৩ টি পতিতালয়ের মালিকের লেখা কবিতা কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত?

ফেসবুকীয় মতামত-:: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী রবী ঠাকুরের কবিতা কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত? জাতি তা জানতে চায়…… ...