সোমবার, ২৭শে মে, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৩:৩৩
Home / সিলেবাস-সংস্কার / কওমি মাদরাসা শিক্ষা সংস্কার পথ ও পদ্ধতি (চতুর্দশ পর্ব)

কওমি মাদরাসা শিক্ষা সংস্কার পথ ও পদ্ধতি (চতুর্দশ পর্ব)

13450258_491977211013293_2291914300146829271_n(চ) বর্তমান প্রগতি ও উন্নতির যুগ ব্যবসা বাণিজ্য ও  লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিদিনএমন নতুন নতুন প্যাচালো লেনদেনের প্রচলন হচ্ছে যে, একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর সামনে ক্ষণে ক্ষণে অভিনব অর্থনৈতিক কারবার পদ্ধতি উপস্থিত হচ্ছে যার হুবহু ধরন ও শরয়ী সুরাহা আমাদের আগের আমলের কিতাবগুলোতে নেই। কারণ তখন এ ধরনের লেনদেনের পরিকল্পনাও ছিল স্বপ্নাতীত। এসব হচ্ছে বর্তমান যুগে সৃষ্ট ও আবিস্কৃত। এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে নিরূপন করে তার যথাযথ ইসলামি সমাধান পেশ করা আলেম সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব ঐ সময় তারা পালন করতে পারবে যখন তারা সেসব লেনদেনের আগাগোড়া বিশ্লেষণ, ধরণ ও নেপথ্য বুঝবে ও পরে ফেকাহর সূত্রের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করে সমাধান আবিস্কার করবে।

এখন অবস্থা হচ্ছে মাসআলার ধরণ বর্ণনা করার দায়িত্ব ফতোয়াপ্রার্থির কাধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। কারণ মুফতি সাহের তো আর ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন ধরণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন না। এজন্য ফতোয়াপ্রার্থি যেমন প্রশ্ন লিখে দেয় সেমতেই জওয়াব দেওয়া হয়। যেহেতু ফতোয়াপ্রার্থি আলেম নয়, সে তার অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় সমস্যার মূল দিকগুলো -যার উপর সমাধান নির্ভর করে- তার বর্ণনায় উহ্য থাকে। ফলে জবাব ভিন্নরকম হয়ে যায়। এ অবস্থা তো ঐসব বিষয় সম্পর্কে যে সম্পর্কে ব্যবসায়ীর অন্তরে সংসয় সৃষ্টি হয় যার ভিত্তিতেই নস ফতোয়া প্রদান করে। কিন্তু অধিকাংশ বিষয় এমন যা সম্পর্কে তাদের কোনো সন্দেহও সৃষ্টি হয় না। এছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে তো বৃহদাংশ এমন যাদের অন্তরে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হয় না। ফতোয়া প্রার্থনা করার কোনো তাগিদ অনুভব তারা করে না।

বাণিজ্যিক সব কায়কারবারের শরঈ বিধান প্রনয়ন করতে যেন সুবিধা হয় এবং ফতোয়া প্রদানের সময় ফতোয়াপ্রার্থীর কাছে বিবরণ জানতে না হয় এজন্য ইমাম মোহাম্মদ রহ. বাজারের অলি-গলিতে ঘুরে ঘুরে নিজেই ব্যবসায়ীদের লেনদেনের ধরন বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। অনুরূপ বর্তমান যুগের আলেম সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব হল তারা বর্তমানে প্রচলিত সব অর্থনৈতিক লেনদেনকে খুব ভাল করে বুঝে পরে সুযোগ মত ফতোয়া ও লেখালেখির মাধ্যমে তার শরঈ বিধান উম্মতের সম্মুখে সুস্পষ্ট করে দিবেন। এজন্য অর্থনীতি সম্পর্কে  জ্ঞান অর্জন করা একজন আলেমের জন্য  আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

(ছ) আধুনিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মত ও দর্শগুলো বর্তমান বিশ্বকে যুদ্ধ ক্যাম্প হিসেবে বিভক্ত করে দিয়েছে। কার্যতঃ সব ইসলামি রাষ্ট্র যেকোনো ক্যাম্পের সাথে সম্পৃক্ত এবং বিশ্বের উন্নত অনুন্নত প্রত্যেক দেশ সেসব মতবাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ উভয়ে মুসলমানদের নিজেদের রঙ্গে রঞ্জিত করে  নিজ নিজ দলভূক্ত করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ। এ প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সার্থক মোকাবেলা করা ওলামাদের দায়িত্ব । কারণ তারাই দীনের পরিপূর্ণ সংরক্ষণ করে মুসলমানদের সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য পূর্বশর্ত হলো সব মতবাদ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা অর্জন করা।

(জ) আধুনিক সব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পশ্চিমা বলে দূরে সরিয়ে দিয়ে আমরা জাতীয়ভাবে যে মারাত্মক ভুল করছি সে অনুভুতি, অনুশোচনা মুসলিম বিশ্বের সর্বতত্র প্রবল বেগে শিকড় গজাচ্ছে। আজ প্রায় প্রত্যেক দেশে সেসব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ইসলামিকরণের মাধ্যমে নবতর আঙ্গিকে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পাঠদানের দাবি তীব্র হয়ে উচ্চকিত হচ্ছে। সেসব বিষয়ের পাঠ্য ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থগুলোতে ইসলামী শিক্ষা, আদর্শ, মুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা ও তাদের অবদানকে এভাবে সংযোজন করতে হবে যেন পাশ্চাত্য চিন্তাধারার আধিপত্য ও মোড়লিপনা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এ উদ্দেশ্য সাধনকল্পে এখন মুসলিম বিশ্বের স্থানে স্থানে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের অর্থবহ পরিচালনার জন্য এমন মানুষের প্রকট প্রয়োজন যারা দীনি জ্ঞান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ পারদর্শীতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়েও সুগভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী। যেহেতু এ ধরণের দক্ষ, জ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ মানুষের সংখ্যা অত্যল্প বরং বিরল ও দুর্লভ সে জন্য ঐসব গবেষণা কেন্দ্রের যারা দায়িত্ব গ্রহণ করছে তারা দীন সম্পর্কে যথাযথ সচেতনতার অধিকারী নয়। এ কেন্দ্রগুলোর ফলাফল ও প্রতিক্রিয়াতো তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ হবে না। কিন্তু দশ বিশ বৎসর পর তা চতুর্দিকে চমৎকারভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। এবং প্রত্যেক আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান কেন্দ্রে সেগুলো দৃঢ় হয়ে আসন গড়ে নিবে। সুতরাং সে সব কেন্দ্রগুলোর গবেষনাকার্যে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান আলেমদেরই ধর্মীয় দায়িত্ব। এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন আবশ্যক। এসব তৎপরতার গুরুত্ব ও প্রয়োজন সম্ভবত কোন উম্মতদরদী সুষ্ঠু বিবেক সম্পন্ন মুসলমান অস্বীকার করতে পারবে না। তা শুধু এক দুজন মানুষ দ্বারা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এ প্রয়োজনগুলো অল্প সময়ের মধ্যেও পূর্ণ হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রখর মেধাবী, যোগ্য ও চিন্তাশীল আলেমের এক বিশাল দল। যারা নিজ নিজ রুচি ও চাহিদা অনুসারে কাজের সীমা নির্ধারণ করে দিনরাত অবিরাম শ্রম দিয়ে দীন ও উম্মতের এ মহান  খেদমত আঞ্জাম দিবে। কিন্তু এসব কাজের উপকরণ মাদরাসাগুলো থেকেই সংগ্রহ করতে হবে।

এখানে বিশেষভাবে স্মর্তব্য যে, মাদরাসাগুলোতে এসব বিষয় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য এ বিষয়গুলোতে পারদর্শী ও পণ্ডিত তৈরী করা কখনো নয়। এ ধারণা রাখাও ঠিক হবে না যে এ বিষয়গুলো পাঠদানের প্রচুর সময় ব্যয়িত হবে। কারণ, আল্লাহর ফজলে দরসে নেজামীর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল যারা এ কারিকুলাম অনুযায়ী যথাযথ পাঠ গ্রহণ করে তাদের মেধা তীক্ষ্ম হয়ে উঠে এবং গভীর ও গবেষণাধর্মী বিষয় বুঝতে তারা তৈরী হয়। তারা দীর্ঘবিষয় খুব অল্পতে আয়ত্ব করে ফেলতে সক্ষম যার জন্য অন্যদের প্রচুর সময়ক্ষেপনের প্রয়োজন হয়। যদি মাদরাসার ছাত্রদেরকে ইংরেজি ভাষার সাথে উপরোক্ত কয়েকটি মৌলিক ধারণা দেয়া হয়। তাহলে পরবর্তীতে সময়ের ডাকে সে ভিত্তি প্রস্তরের উপর নিজেই সুদৃঢ় প্রাসাদ সহজে বিনির্মান করতে পারবে। আমাদের দৃষ্টিতে ওলামাদের অবদান ও প্রচেষ্টা সুসংহত ও প্রসারিত করতে পূর্ব উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু (এ “কিন্তু”ও আমাদের দৃষ্টিতে বেশ গুরুত্ববহ) এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণের পূর্বে বা সাথে সাথে মাদরাসা শিক্ষার প্রাণশক্তি ও সবচেয়ে দামী মূলধন “সুন্নত” অনুসরনের প্রবল আগ্রহ উদ্দীপনা মাদরাসাসমূহে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পর্যায়ে যাতে সুন্নতের অনুসরনের প্রতি যেন সামান্য  অবজ্ঞা প্রদর্শন করা না হয়। এ সম্পর্কে আমাদের নিবেদন নিবদ্ধের সূচনাপর্বেই পেশ করেছি। এ মহৎ মূল্যবোধের সংরক্ষণ মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে যে কোন মূল্যে করতে হবে। কারণ এটাকে আহত করে যে উন্নত পদক্ষেপই গ্রহণ করা হোক তা মাদরাসাকে ক্রমোন্নতির পরিবর্তে ক্রমাবনতির দিকে প্রচণ্ডভাবে ঠেলে দিবে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, যে বিষয়গুলো সংযোজনের প্রস্তাব পূর্বে পেশ করা হয়েছে তা ফলপ্রসূ হবার জন্য শর্ত হলো- মাদরাসা শিক্ষার মূল প্রতিপদ্য বিষয় যথাঃ- তাফসির, হাদিস, ফেকাহ প্রভৃতি বিষয়ের পাঠদানের মানে যেন সামান্যও ক্ষতি না হয়। শুধু তাই নয় বরং এসব বিষয়ে শিক্ষার মান অধিক উন্নত ও সুদৃঢ় হতে হবে। এ দু’ অপরিহার্য শর্তের প্রেক্ষিতে আমরা মনে করি পাঠ্যক্রমভূক্ত পরিকল্পিত আধুনিক বিষয়গুলো শিক্ষাদানের জন্য এমন সুদক্ষ শিক্ষক অপরিহার্য যার ধ্যান-ধারনা ও মাদরাসার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন হবে এবং শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্রদের মানসিকতাকে মূল লক্ষ্যর জন্য গড়ে ‍তুলতে পারবেন। এমন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া না গেলে যদি মাদরাসার কোন শিক্ষককে সাময়িক কর্ম বিরতি দিয়ে এ কাজের জন্য তৈরী করতে হয় তাতেও কোন অসুবিধে নেই। আর এসব বিষয়ের সংযোজন ও পাঠদান ক্রমান্বয়ে করা উচিত। উদ্দেশ্যাবলী সাধনের প্রতি যদি প্রথমেই মনোযোগ দেওয়া হয় তবে ধীরে ধীরে এর প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করা মোটেও দুস্কর হবে না। ইনশাআল্লাহ।

৭। পাঠ্যসূচী সম্পর্কিত সপ্তম কথা হল-গ্রীক দর্শন ও মানতেক-তর্কশাস্ত্র প্রসঙ্গে। অনেকে মনে করে গ্রীক-ফিলোসফির পতনের পর তা শিক্ষাদানের আর কোন যৌক্তিকতা নেই। কোন প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমাদের মতে এ মন্তব্য বিবিধ কারণে অসঙ্গত। এ বিষয়দ্বয়ের শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তার জন্য এতটুকুও কি যথেষ্ট নয় যে, আমাদের পূর্বসূরী আলেমদের রচিত সুবিশাল গ্রন্থাবলি বিশেষ করে উসূলে ফেকাহ মানতেক ও ফিলোসফির পরিভাষা ও বর্ণনারীতি অনুযায়ী প্রনীত। যা যথাযথ বুঝে উপকৃত হাবার জন্যে ‘‘মানতেক ও ফিলোসফি’’পড়ার বিকল্প নেই। তাফসিরে কাবির গ্রন্থের মত জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে উপকৃত হওয়া মানতেক ও ফিলোসফির মৌলিক জ্ঞান ছাড়া কি আদৌ সম্ভব? সুতরাং এ বিষয়কে সিলেবাস থেকে সম্পূর্ণ উৎপাটন করে দেয়া আমাদের মতে ক্ষতিকর। অবশ্য এ বিষয় মূল ইসলামি বিষয়ের জন্য সোপান ও মাধ্যম হিসাবে সাব্যস্ত হতে পারে যতটুকু ঠিক ততটুকু পড়ানো উচিত। পূর্ণাঙ্গ মূল বিষয় হিসাবে তা পড়ানোর কোন বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা নেই।  সুতরাং যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে এসব বিষয় অধিক পড়ানো হচ্ছে তা প্রয়োজন অনুসারে সংকুচিত করে অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা দানের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। তাছাড়া প্রাচীন ফিলোসফির যেসব অংশ গবেষণা ও বাস্তবতার নিরিখে ভূল প্রমানিত তা সংশোধন করে আধুনিক মতবাদ পড়ানো উচিত। এ ক্ষেত্রে আল্লামা নজীর রচিত “তাওফীকুর রহমান” আল্লামা আলুসীর “মাদাল্লা আলাইহিল কোরান, এবং মাওঃ মোহাম্মাদ মূসা সাহেবের “জদীদ ফলকীয়াত” থেকে সহয়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।

৮। সিলেবাস সম্পর্কে আরেকটি নিবেদন হল মানুষের মেধার ক্রম অবক্ষয়। এ বিষয়ের গুরুত্ব ও দুর্বোধ্যতার প্রতি লক্ষ্য করে দীর্ঘদিন যাবত তীব্রভাবে অনুভূব হচ্ছে যে, দাওরায়ে হাদীসের জন্য শিক্ষাকাল এক বছর যথেষ্টে নয়। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে পবিত্র হাদিসের পঠন-পাঠনের যথাযথ হক আদায় হয় না। সাধারণতঃ  হাদিসের হাতে গোনা কয়েকটি অধ্যায় মাত্র খুব স্থিরতা ও গবেষনার সাথে পড়া হয় আর যখন বছরের চাকা ঘুরতে ঘুরতে শেষের দিকে চলে আসে তখন অবশিষ্ট সিলেবাস সমাপ্ত করার মহা হিড়িকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় চাপা পড়ে যায়। সহিহ বোখারী  নিয়ে ছাত্র শিক্ষক দিনরাত আপ্রাণ মেহনতের পরও বছর শেষে সিলেবাস সমাপ্তির জন্য ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করতে হয়। অথচ সহিহ বোখারী-র এমন কোন অংশ কি আছে যা অনবরত উল্কাবেগে রিডিং পড়ে সমাপ্ত করা যায় ?

অনুরূপ দাওরায়ে হাদিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিতাব যেমনঃ- ত্বহাবী শরীফ, দুই মোয়াত্তা বছর শেষে যৎ কিঞ্চিত নামে মাত্র পড়ানো হয় অথচ তা অত্যন্ত গুরুত্বসহ পড়া ও পড়ানো উচিত।

যদি দাওরায়ে হাদিসকে দু’বছরের কোর্সে পরিণত করা হয় তবে আশা করা যায় হাদিসের সাথে ছাত্রদের প্রত্যাশিত নিবিঢ় সম্পর্ক  কিছুটা হলেও গড়ে উঠবে। ছাত্ররা হাদিসের সব অধ্যায় খুব ধীরে সুস্থে পড়ার সুযোগ পাবে। তার সাথে উসুলে হাদিসের কোন গ্রহণযোগ্য কিতাবও যেমন “তদরীবুর রাবী” বা “ফতহুল মুগীস” প্রভৃতি গুরুত্বসহ পড়ানো যেতে পারে। এগুলো হাদিসের ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

৯। ফেকাহ-র সাথে আধুনিক অর্থনীতি এবং আইনশাস্ত্রকেও সিলেবাসভূক্ত করা হোক। আমাদের একশ’ ভাগ আশা যে, মাদরাসাসমূহে গ্র্যাজুয়েশন‌ পর্যায়ে পর্যাপ্ত পাঠদানের জন্য কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দীর্ঘ সময় ব্যয়িত হয় তার এক দশমাংশ সময়ও ব্যয় হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়গুলো যথারীতি তাৎক্ষণিকভাবে সিলেবাসভূক্ত করা যাবে না, সেখানে অন্তত সাপ্তাহিক একদিন এ বিষয়ে সাধারণ আলোচনা উপস্থাপন করা উচিত। আলোচনায় হেদায়া ও তার উপরের ছাত্ররা অংশ গ্রহণ করবে।

১০। প্রত্যেক মাদরাসার শিক্ষা সমাপ্তকারী ছাত্র শিক্ষক থেকে এমন কিছু ব্যক্তি মনোনয়ন করা দরকার যারা এলমে পারদর্শী হবার পাশাপাশি বক্তৃতা ও লেখালেখিতেও পারদর্শী। তাদেরকে বিশেষভাবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দিয়ে পাশ্চাত্য দর্শন, অর্থনীতি, আইন, রাষ্ট্রনীতি প্রমুখ বিষয় হতে যে কোন একটি বিষয় নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শীতা অর্জন করবে। আর এ সময় দীনি এলমের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য তাদের থেকে কিছু শিক্ষকতার দায়িত্বও নেয়া হবে। এভাবে যখন তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করার যোগ্যতা হবে তখন তারা সে বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনাকে নতুন আঙ্গিকে জাতির সামনে উপস্থাপনা করতে পারবে এবং পাশ্চাত্যনীতির সাথে তার তুলনামূলক পর্যালোচনা করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় করতে পারবে।

উপরে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মাধ্যমে এখলাস ও ব্যথার সাথে মনের কথাগুলো স্পষ্ট করার প্রয়াস পেয়েছি। প্রত্যেক প্রস্তাবই যে যথার্থ হবে তা জরুরী নয়। তবে আহলে এলমের বরাবরে এসব উপস্থাপনের উদ্দেশ্য হল যদি তারা দলিল ও যুক্তির নিরিখে কোন প্রস্তাবকে যথার্থ মনে করেন তাহলে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন। আর যদি আমার কোন প্রস্তাব অযৌক্তিক প্রমাণিত হয় তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করে দিবেন।

সমাপ্ত

মূল : আল্লামা তকি উসমানি

ভাষান্তর : কাজী মোহাম্মদ হানিফ

শাইখুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া মারকাজুল উলুম, কাঁচপুর, নারায়ণগঞ্জ

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

আরজাবাদ মাদরাসার নয়া মুহতামিম মাও. বাহাউদ্দীন জাকারিয়া

রাজধানী ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া (আরজাবাদ মাদরাসা)’র নয়া মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত ...