শনিবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ১০:৩৫
Home / কওমি অঙ্গন / কওমি শিক্ষা বনাম সাধারণ শিক্ষা (দুই)

কওমি শিক্ষা বনাম সাধারণ শিক্ষা (দুই)

Hathajariআবুল কাসিম আদিল : সমস্যা আমাদের মূলে। গোড়ায় গলদ। ভোগবাদী সমাজে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যই ভ্রান্ত। পড়ো, মুখস্থ করো, ভালোভাবে পরীক্ষা দাও; নইলে চাকরি পাবে না— বিদ্যার্থীদের প্রতি আজকের অভিভাবক ও শিক্ষকসমাজের নসীহত। সমাজের এই মনোভাব আগেও ছিল, বঙ্কিমযুগে। এখন আরো প্রকট হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর যুগের বিদ্যাকে অর্ধেক মানুষ বানানোর বিদ্যা বলেছেন। এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে হয়ত একে অমানুষ বানানোর বিদ্যা অথবা অবিদ্যা বলতেন। যে শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য শুধু চাকরিলাভ, সে শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে ভোগবাদী চিন্তা ছাড়া আর কোনো মহৎ চিন্তা থাকার কথা নয়। ফলে আজকের শিক্ষালয়গুলো হয়ে উঠেছে চাকর তৈরির কারখানা।

আগের যুগে মানুষ প্রিয় সন্তানকে পাঠশালায় পাঠাত মানুষ বানানোর জন্য, আর এযুগে পাঠায় চাকর বানানোর উদ্দেশ্যে। ফলে এযুগে যে যত বড় শিক্ষিত হচ্ছে, সে হচ্ছে তত বড় চাকর। যে শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য চাকরিপ্রাপ্তি, পড়াশোনার পর তার দ্বারা ভালো কিছু হবে, এরূপ আশা করাও পাপ। এদেশের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য পড়াশেনা করে, জ্ঞানার্জনের জন্য নয়। পরীক্ষা শেষ হলে বই-পুস্তক ঠোঙার দোকানে বিক্রি করে কম্ম কাবার। শাস্ত্রজ্ঞানের এদেশে কদর নেই। এখানে মূল্য শুধু সনদপত্রের। এজন্য ছাত্রদের সকল মনোযোগ সনদপত্র অর্জনের প্রতি।

এমন এক যুগে আমরা বাস করছি, যখন বলতে গেলে সনদপত্র বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার আগেই এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া অবধারিত। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য আগে মনোযোগী ছাত্র হওয়া না লাগলেও চতুর পরীক্ষার্থী হতে হতো। এখন তারও প্রয়োজন হয় না। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া পরীক্ষা দিয়ে চতুর পরীক্ষার্থী নির্ণয়েরও সুযোগ এখন রহিত। এখন গাধা-ঘোড়ার সমান দাম, ভালো-খারাপ সব ছাত্রই জিপিএ ফাইভ পাচ্ছে। এত শিক্ষাহীন সনদধারী জাতির কী উপকারে আসবে? এদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আগে থেকেই অনেক। শিক্ষিত বেকার, কারণ এদেশের মানুষ কোনোমতে সনদ একটা সংগ্রহ করতে পারলেই চাকরির জন্য বসে থাকে। নিজ উদ্যোগে কিছু করে না, বা পারে না। ফলে বেকারত্বের অভিশাপ ভোগ করতে হয়। সেসব বেকার তো আছেই, এখন পাইকারি দরে সার্টিফিকেট বিলি করে বেকারের সংখ্যা আরো বাড়ানো হচ্ছে। মেধাহীনদের প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে সনদ অর্জনের সুযোগ দিয়ে বেকারসম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছ। যে ছেলেটা মেধাহীনতার কারণে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে শারীরিক পরিশ্রম দ্বারা অর্থোপার্জনে প্রয়াসী হত, সে প্রশ্নফাঁসের বদৌলতে পাশ করছে। ফলে শিক্ষিত তকমার বলে শিক্ষিত সুলভ অহং দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। একারণে সে পরিশ্রমের কাজ করতে রাজি হচ্ছে না; এবং বেকারত্বের অভিশাপ তাকেও ভোগ করতে হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের বহুবিধ সমস্যা নিরসনে কওমী মাদরাসা উদাহরণ হতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানীরা কওমী মাদরাসার শিক্ষাধারা অনুসরণ করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। কওমী শিক্ষিতরা শিক্ষাকে পণ্য মনে করে না। তারা সার্টিফিকেটলাভ ও চাকরিপ্রাপ্তির জন্য পড়াশোনা করে না। তারা বিদ্যার্জনের জন্য পড়াশোনা করে। তারা শুধু শিক্ষালাভই করে না, দীক্ষালাভও করে। কওমী মাদরাসা-ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়। কওমীশিক্ষার্থীদের মূল উদ্দেশ্যই হলো ইহজাগতিক কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি। গুরুমারা বিদ্যা কওমী মাদরাসা শিক্ষা দেয় না। কওমী মাদরাসার সুদীর্ঘ ইতিহাসে ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক প্রহৃত হওয়ার ঘটনা ঘটে নি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মারামারি-হানাহানির জন্য কখনো কোনো মাদরাসা বন্ধ করতে হয় নি। শিক্ষা মানে তথ্য গলধকরণ— কওমী শিক্ষা এই ধারণায় বিশ্বাসী নয়। শিক্ষার আলোকে মানুষের হৃদয় আলোকিত করা ও আলোকিত মানুষ দ্বারা দুনিয়া আলোকিত করা কওমী শিক্ষার উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যেই কওমী শিক্ষার আজন্ম সচেতন প্রয়াস চলমান। ইন্না মিনাল-ইলমি লাজাহলান— কিছু জ্ঞানও অজ্ঞতা।ৎ

অজ্ঞতা মানে অন্ধতা। কওমী মাদরাসা অন্ধতা শেখায় না। তথ্যকেন্দ্রিক শিক্ষা মানুষকে যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলে। কওমী মাদরাসা এক্ষেত্রে সদা-সচেতন। কওমী মাদরাসা তাথ্যিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তবজীবনে তা প্রতিফলনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। কওমী শিক্ষায় অনেক অপূর্ণতা আছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, কওমী শিক্ষিতরা বেকার থাকে না। দেশের বোঝা হয় না। চাকরির জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয় না। তারা নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরা তৈরি করে নেয়। সবচে বড় কথা কওমী মাদরাসা এই যন্ত্রযুগেও মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। কওমীশিক্ষার্থীরা গ্রন্থগত বিদ্যাগ্রহণের পাশাপাশি হৃদয়বৃত্তির স্ফুরণ ঘটায়।

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে জরুরী কিছু কথা!

কমাশিসা ডেস্ক: শুক্রবার ২৫সেপ্টেম্বার ২০২০. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আপনি যখন কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির ...