বুধবার, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ দুপুর ২:৪১
Home / কওমি অঙ্গন / কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাসংস্কার ভাবনা (পর্ব-৩)

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাসংস্কার ভাবনা (পর্ব-৩)

13836022_585213701666426_1402566240_oফারহান আরিফ:

ছোটববেলায় আমাদের গ্রামাঞ্চলের মসজিদ গুলোতে যখন নামাজ আদায় করতাম দেখতাম মসজিদের টিন দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়তো।বস্তা বা টাট জাতীয় মাদুরের উপর মানুষেরা নামাজ আদায় করতেন। এখন শুধু শহর নয় গ্রামাঞ্চলেও দৃষ্টিনন্দন সুন্দর সুন্দর মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে। মসজিদ গুলোর অবয়ব এত সুন্দর হওয়ার পিছনে যে চিন্তাটা কাজ করছে তা হচ্ছে সংস্কার। আজ কাল কিছু কিছু মাদ্রাসার মনোরম কেম্পাস ও বিল্ডিং গুলো দেখতে কত ভাল লাগে এর পিছনে যে পরিশ্রমটা হয়েছে তা হচ্ছে সংস্কার । মোট কথা স্থান কাল পাত্র বেধে সংস্কার করতে হয় কল্যাণের জন্য, সময়ের চাহিদার প্রতি খিয়াল রেখে বুদ্ধিমানরা সংস্কার করে দেন করে নেন । কিন্তু কওমি মাদ্রাসার প্রাচীন সিলেবাস সংস্কার হচ্ছেনা। আজ কত যুগ অতিবাহিত অথচ আমরা কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস সংস্কারের কথা চিন্তা করছিনা। ২৫০ বছর পুরানা দারসে নেজামি নামক সিলেবাস দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত চালিয়ে যেতে যেন কওমিরা অঙ্গিকারাবদ্ধ। আমরা এমন এক সময়ে পদার্পণ করেছি যে, যখন চারপাশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মিছিলের আওয়াজে আমাদের কর্ণকোহর বিদীর্ণ হওয়ার উপক্রম।আমরা ইসলাম ও মুসলিম দুনিয়ার জাতিকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখি, কত ভাবে নিজেকে ভাসিয়ে তুলতে পরিকল্পনা করি।কিন্তু বার বার আমরা ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ঘরে ফিরছি। আমাদের প্রজন্ম কোথা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে, কি শিখছে, আমরা এগুলো নিয়ে যতসামান্ও ভাবিনা। আমরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি অথচ আমরা আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান পড়িনা, আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখি অথচ রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়িনা। আমরা কৌর্ট খাছারিতে উকালতি করার স্বপ্ন দেখি কিন্তু উকালতি বিষয়ক কোন পাঠ্যপুস্তক আমাদের সিলেবাসে নেই। কওমি ঘরনার কোন আলেম মামলা মুক্বাদ্দমায় জড়িত হলে কওমির কোন উকিল আদালতে খুঁজে পাওয়া যায়না। ডাক্তার পুলিশ আর্মি বলেন, সাংবাদিক বলেন, বৈজ্ঞানিক বলেন, কি আর বলবো? কোন শাখাতেই কওমির কোন মানুষ দেখতে পারবেন না। আমরা কওমিরা সব দিকে পিছিয়ে রয়েছি, অনেক পিছিয়ে যা ভাবার মত নয়। কোন দিকে আমরা নিজেদেরকে জায়গা করে নিতে পারছিনা। মোট কথা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থেকে নিয়ে সমাজের সব স্থানে আমাদের কোন বিচরণ নেই বললেই চলে। অথচ এগুলো প্রত্যাক্ষ করে আমরা হায় হুতাশ করি, দাঁতে দাঁতে কামড় দেই। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নে্নই, আমাদের কাছে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যবস্থা করছিনা। আমরা কওমিপন্থী যারা, আমাদের বেইজমেন্ট ও আমাদের নলেজহুম হচ্ছে বর্তমানে স্থানে স্থানে পাড়া মহল্লায় অবস্থিত কওমি মাদ্রাসা গুলোকে কেন্দ্র করে। আমরা আমাদের কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস সিস্টেমের দিকে মনযোগ দিয়ে থাকালেই বুঝতে পারবো এযুগে আমাদের অভাবটা কোথায়? কোথায় আমাদের কি কি সমস্যা এবং কি প্রয়োজন? কি করলে আমাদের সব অভাব পূরণ হবে? কি ভাবে আমাদের সিলেবাস কে সাজালে এযুগের ছাত্রদের চাহিদা মেঠতে পারবো, এবং ছাত্ররা একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবো। আজ যদি আমরা সিলেবাসকে ঢেলে সাজাই, এক সময় দেখতে পাবো ছাত্ররা সমাজ, রাষ্ট্র, আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখায় ইসলাম ও মুসলিম কে সাথে নিয়ে আগামিকে জয় করার সক্ষমতা নিয়ে গড়ে উঠেছে।

ইসলামের কোথা্ওতো লেখা নেই যে, জাগতিক শিক্ষা গ্রহণ করা হারাম ও পাপ, এমনটাতো ইসলাম বলেনি। মানব জীবন পরিচালনা করতে যতটুকু ইলমের (জ্ঞানের) প্রয়োজন ততটুকু ইলম হাসিল করা ফরজ বলে ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে।এগুলোর পরে দুনিয়াবী ইলম হাসিল করা অন্যায়ের কিছু নেই। তা যে কেউ অর্জন করতে পারে, কোন সমস্যা নেই। যেহেতু দুনিয়ার নেজাম ঠিক রাখতে, দুনিয়ায় চলতে ফিরতে জাগতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই জাগতিক শিক্ষা গ্রহণ করা আমাদের দরকার ও অবিশ্যই প্রয়োজন। সুতরাং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় জাগতিক বিষয়ক বই- পুস্তক শামিল করলে অন্যায় হবেনা। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় জাগতিক বিষয় প্রবেশ করানো এখন সময়ের দাবী। যেহেতু আমরা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে সামনে নিয়ে যেতে চাই, তাই ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষা তথা দুনিয়াবী শিক্ষার অতি প্রয়োজন। ফিক্বহী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাগতিক শিক্ষা থেকে বিমুখ হয়ে থাকলে এই পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা হারিয়ে যেতে থাকবে।কারণ-যে প্রতিনিধিত্ব করতে চায় তাকে সর্ব জ্ঞানেজ্ঞানী হতে হবে। তবেই পুর্ণ প্রতিনিধিত্ব করা যাবে ও প্রতিনিধিত্বকারী হওয়া যাবে।এই না হলে আল্লাহ তালার খলিফা হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করতে সমস্যা হতে পারে। সুতরাং সবদিক বিবেচনা করে আমাদের উচিৎ আমাদের কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এখন গভীর ভাবে নজর দেওয়া।সময় উপযুগী মানসম্মত সিলেবাস প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে কুলিয়ে ওঠা ও গঠন মূলক সিলেবাস রচনা করা একান্ত প্রয়োজন।

আজ কমাশিসা যে পরিকল্পনা হাতে নিয়ে রাতারাতি সম্মুখ পানে এগুচ্ছে হয়তো কারো মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে। কারণ কমাশিসা যে ২১ দফা প্রকাশ করেছে এই দফাগুলো দেখে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কারণ এই সমাজে অনেক আলেম আছেন বাপের ছেলে বা বড় হুজুরের ছেলে হিসাবে প্রিন্সিপাল হয়ে যান, নাজিম হয়ে যান, শিক্ষাগত যোগ্যতা তাদের লাগেনা। তাদের একটা ডিগ্রী হল তারা- বড় হুজুরের ছেলে। এই পদ্ধতিটা অবিশ্যই বন্ধ করতে হবে।এবং যোগ্য আলেম, মেধা সম্পন্ন ও অভিজ্ঞদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এমন ব্যক্তিদেরকে প্রধান হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে যে, দ্বীনী শিক্ষায় পাণ্ডিত্য হওয়ার পাশাপাশি দুনিয়াবী জাগতিক শিক্ষায়ও পারদর্শি হবেন এমন ব্যক্তি চাই। তবেই এমন অভিভাবকদের দ্বারা যুগোপযোগী চিন্তা, সময়ের চাহিদা ও ছাত্রদের মঙ্গলজনক চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। আর যেখানে বৃদ্ধ বয়সের আলেমরা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ত্বে আছেন, আমি তাদেরকে হেয় করে বলছিনা, পূর্ণ সম্মান দিয়েই বলছি যে, তাদের চিন্তা চেতনায় প্রাচীনতা বা পিছিয়ে থাকার প্রবণতা পরিলক্ষীত হবে। তারা আধুনিকতা, সময়ের চাহিদা একটু কম বুঝেন, জাগতিক শিক্ষা তাদের কাছে দোষ মনে হয়। জাগতিক শিক্ষার গুরুত্ত্ব এদের কাছে নেই। সময়ের চাহিদা, সময়ের খাবার, এযুগের ছাত্রদের মাইন্ড ও মানসিকতা সম্পর্কে বেমালুম। হ্যাঁ ব্যাক্তিগত জীবনে আবশ্য সেই বৃদ্ধ্যরা  আপন ঘরবাড়ি ছেলেমেয়েদের বিয়ে শাদীতে যে কোন উপায়ে দৌলতের মালিক হতে মরিয়া। নিজের ব্যাপারে মতলবি আর উম্মাহর প্রজন্মদেরকে যুগোপগোগী করে গড়ে তুলতে যতনা ্আপত্তি।

কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস সংস্কারের আওয়াজ না তুললে কিয়ামত পর্যন্ত তারা চালিয়ে যাবেন। এতে তাদের কোন সমস্যা হবেনা। তারা নতুন প্রজন্মকে পুরানা মডেলের অকেজো গাড়িতে ছড়িয়ে বেহেস্তে নিয়ে যাবেন। তাদের আরোহণে চড়ে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে পাঁচশত বছর লাগলেও আমাদের বৃদ্ধ ও বর্ষিয়ান আলেমদের যায় আসেনা। আজ আমাদের সমস্যা আমাদেরকেই সমাধান করতে হবে। যারা কওমি মাদ্রাসা চালান তাদের অধিকাংশ এবিষয় গুলোকে নিয়ে ক্ষনিকের জন্য ভাবতে নারাজ। কেন তাহলে এ বিষয়ে এতো উদাসীনতা? তাদের কাছে সংস্কার নাজায়েজের মত মনে হয়। এইসব বাজে চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আসুন আমরা ভাবি। বড়দের বলবো দয়া করে আর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না। নবীন ও তরুণদের এবিষয় নিয়ে ভাবনার  আহব্বান জানাই। মাস্টার প্লান তৈরী করি। সবাই মিলে কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণা করি। ভাবনার দৃষ্টিতে তাকই। সময় যুগ চাহিদাকে অনুধাবন করি। আগামির টার্গেট ঠিক করি, সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কওমিকে ঢেলে নতুন করে সাজাই।কওমিকে সুস্থ ও পুর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা দিয়ে সাজিয়ে একবিংশ শতাব্দির ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ গুলোর মোকাবিলা করি। এখন ঘুমিয়ে ও ঝিমিয়ে থাকার সময় নয়। সময় এসেছে কওমির রঙ দিয়ে চারিদিক সাজিয়ে তুলা, সর্বস্থানে সর্বমহলে কওমির নিশান উড্ডীন হউক। তাই আল্লাহ তালার কাছে আমার ফরিয়াদ। হে আল্লাহ আমাদেরকে তুমি সঠিক বুঝ দান করো। সঠিক চেতনা উদয় করে দিয়ে কওমিতে সোনালী যুগ এনে দাও। আমিন লেখকঃ ফারহান আরিফ শিক্ষার্থীঃইসলামের ইতিহাস বিভাগ এম.সি,কলেজ সিলেট।

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে জরুরী কিছু কথা!

কমাশিসা ডেস্ক: শুক্রবার ২৫সেপ্টেম্বার ২০২০. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আপনি যখন কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির ...