সোমবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ ভোর ৫:৪৮
Home / অনুসন্ধান / বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি ও ভাঙ্গনেরর ইতিহাসঃ একটি পর্যালোচনা (পর্ব-৩)

বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি ও ভাঙ্গনেরর ইতিহাসঃ একটি পর্যালোচনা (পর্ব-৩)

হাকীম সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ 01হাকীম সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ ::

১৯৫৪ সালে বাংলার আলেম সমাজের রাজনৈতিক মোড় ঘোরানোর সবচেয়ে সফল বছর। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ক’জন নেতা মনে করলেন, শুধু আলেমদের নিয়ে রাজনীতি করে এদেশে সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়। দরকার একটি গণবিপ্লব অথবা রাজনৈতিক মাইলফলকের জন্য প্রয়োজন সর্বস্থরের মানুষের অংশগ্রহণ। আর এই নীতি ও চিন্তার প্রবর্তক ছিলেন এদেশের আলেমদের রাজনৈতিক সিপাহসালার মাওলানা আতাহর আলী রাহ.। মুসলিম লীগ সরকার ভীত হয়ে কোন বড় শহরে আলেমদের সভা, সমাবেশের অনুমতি দিত না। ৪৯ সালে বি-বাড়িয়ার পীর সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন রাহ.’র মাসিহাতা দরবার শরীফে পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামপন্থী নেতাদের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সম্মেলনের মাধ্যমে “নেজামে ইসলাম পার্টি” প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলন ছিল সত্যকারের গণমূখী রাজনীতির প্রথম মাইলফলক। সকল মত ও পথের নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। পীর সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীনকে আহব্বায়ক করে ১০০ সদস্যের আহব্বায়ক ককমিটি গঠিত হয়। ঐ কমিটিতে ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম রাহ.সহ কওমীর শীর্ষ আলেমদের পাশাপাশি ফুলতলীর পীর, সোনাকান্দার পীর, বায়তুশ শরফের পীর, নারিন্দার পীর, ফরিদপুরের পীর সাহেবসহ বাংলাদেশের শীর্ষ প্রভাবশালী পরিবারের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা গুরুত্বপূরর্ণ পদে ছিলেন। ঢাকার ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, হবিগঞ্জের পিয়াইম সাহেব বাড়ির জননেতা এড. নাসির উদ্দীন চৌধুরী, চট্টগ্রামের আশরাফ চৌধুরী, কুমিল্লার জননেতা আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী, কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমদ, মময়মনসিংহের জননেতা সৈয়দ মোয়াজ্জম আলী, রাজশাহীর এম এ হান্নান, বরিশালের আব্দুল ওয়াহিদ খানের মত বাঘা বাঘা নেতারা নেজামে ইসলাম পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ট হন। সত্যিকারের গণমূখী ইসলামি রাজনীতির একটি ধারা তৈরি হয়।

১৯৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার হযরত নগরে দলটির জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনেই মাওলানা আতহার আলী রাহ.কে সভাপতি, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মণ্ডলীকে সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত করে “নেজামে ইসলাম পার্টি”র কার্যক্রম শুরু হয়। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম তথা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়। মুসলিম লীগের তুলনায় এই দলের নেতৃতে বড় বড় উলামায়ে কেরাম থাকায় অল্পদিনেই নেজামে ইসলাম পার্টি একটি শক্তিশালী ও বৃহৎ দলে পরিণত হয়। সবকটি মহকুমায় জেলার জাদরেল নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। অন্য দলের নেতারাও দলে দলে নেজাম ইসলাম পাটিতে যোগদান করতে থাকেন।

১৯৫৪ সালে নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। এই নির্বাচনে তাদের এককালের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অপরাপর বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্টও গঠন করা হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধী আওয়ীমলীগ, শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টি, মাওলানা আতাহর আলীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তভাবে নির্বাচন করে। নির্বাচনে তারা বিপুলভাবে বিজয় লাভ করে। ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টি আসন তারা লাভ করে। তার মধ্যে কেবল নেজামে ইসলামের নেতারা ৩৮টি সংসদীয় আসন লাভ করেন। ৩৮ জন এমপি ৩জন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও মাওলানা আতাহর আলী সবোর্চ্চ ভোট পেয়ে পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল “নৌকা”। আলেমরাও নৌকা নিয়েই নির্বাচন করেন। যা বর্তমানে আওয়ামীলীগের পরিচয় চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১দফা দাবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এর ভূমিকায় বলা হয়- ‘’কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না।’ যুক্তফ্রন্ট সরকারে নেজামে ইসলাম পার্টি মন্ত্রিত্ব লাভের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারনী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় পরিষদে সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন দলীয় সভাপতি মাওলানা আতহার আলী রাহ.। নেজামে ইসলাম পাটির যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট মৌলভী ফরিদ ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ছিলেন নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল ওহাব খান। এছাড়া আইন, ভূমি ও শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির সহ-সভাপতি আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী। নেজামে ইসলাম পার্টির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দীন চৌধুরী ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিলে তাকে দলের নির্বাহী সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু দুভার্গ্য, ক্ষমতার স্বাদ বেশি দিন এদেশের ইসলামপন্থিদের কপালে জুটে নি। পার্টির ভিতর অন্তদন্ধ দেখা দেয়। পদ-পদবী নিয়ে শুরু হয় দন্ধ-সংঘাত। তখন হুট করে শীর্ষ অনেক নেতা আওমীলীগে যোগ দিলে দলটি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ৭০’র নির্বাচনের পূর্বেই দলটি নির্জীব হয়ে যায়।

মাওলানা আতাহর আলী সহকর্মীদের রাজনীতির ‘রাজনীতি’ দেখে মানসিকভাবে একেবারে  ভেঙ্গে পড়েন। তখন তিনি সরে দাড়ান রাজনীতি থেকে। চারদিকে বিশ্বাসঘাতক আলমদের আস্ফালন আর স্বার্থপরতা ও বে-এখলাসি দেখে এদেশের আলেমদের রাজনীতি এতোটাই নিরাশ হয়েছিলেন যে , মৃত্যুর পূর্বক্ষণে তার একমাত্র ছেলে আজহার আলী আনোয়ার শাহকে ডেকে এনে শেষ অসিয়ত করেন, তালিম ও তাবলীগে আজীবন লেগে থাকবে এবং কোন দিন রাজনীতি না করার নসিহত করেন। এদেশের আলেমদের রাজনীতিতে লিল্লাহিয়ত আর এখলাস নেই, তুমি কখনো রাজনীতি করবে না। বর্তমানে নেজামে ইসলাম পার্টির অস্থিত্ব থাকলেও দলটি তৃ-ধারায় বিভক্ত। নামকাওয়াস্তে কোনো রকমে ঠিকে আছে।

চলবে…

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

সিলেটের পবিত্র মাটি আবারও কলংকিত হলো রায়হানের রক্তে!

পুলিশ ফাড়িতে যুবক হত্যা: সিলেটজোড়ে চলছে রহস্য! এলাকাবাসীর প্রতিবাদ!! সিলেট নগরীতে রায়হান নামক এক যুবকের ...