সোমবার, ১৫ই জুলাই, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ৬:১৮
Home / ইতিহাস ঐতিহ্য / সমুদ্র ঈগল ১৮ (গ)

সমুদ্র ঈগল ১৮ (গ)

কুতায়বা আহসান :

– মা’আয মুনযির বিন যুবাইরকে লক্ষ করে আরো বলল: চাচা! সত্যিই হাসান ক্রুসুর দাদুর অবস্থা আশংকাজনক। আমি আর বাসিত তাঁর ওখান থেকেই আসছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম আজ রাত তাঁর ঝুপরিতেই কাটিয়ে দেব। কারণ কখন কী হয় বলা যায় না। কিন্তু তিনি আমাদেরকে বললেন: জেলে পল্লীর অনেকেই আমার দেখা শুনা করছে। তুমি তোমার পিতার কাছে চলে যাও, অন্যথায় তারা চিন্তিত হবেন। আমার মনে হচ্ছে তাঁর জীবনের বোধহয় আর বেশিদিন বাকি নেই।
– মুনযির বিন যুবাইর মা’আযের প্রস্তাব শুনে খানিক্ষণ ভেবে নিয়ে বাসিতকে লক্ষ করে বললেন: ভাই বাসিত! তুমি একটা কাজ কর। আমার ভেরা বকরির পালটা আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দাও। সে সাথে এই তিনটি ঘোড়াও নিয়ে যাও। ঘোড়াগুলো আপাতত আমার ওখানেই থাকবে। পশুগুলো আমার বাড়িতে পৌঁছে তুমি দ্রুত বাড়িতে চলে যাবে। সরদার কা’বকে লক্ষ করে বলবে জাবির বিন মুগীসের অবস্থা আশংকাজনক। আমি সাহিল এলাকায় তাকে দেখতে গিয়েছি। মা’আয আমার সাথে আছে। মা’আযের ব্যাপারে যেন তিনি কোনো চিন্তা না করেন। আমি নিজ দায়িত্বে তাঁকে হাবেলিতে পৌঁছে দেব।
– মুনযির বিন যুবাইরের কথা শেষ হতেই বাসিত পশুপালকে হাঁকানো শুরু করে দিল। এ পর্যায়ে মা’আয মুনযির বিন যুবাইরকে লক্ষ করে বলে উঠলো: চাচা এমনটাকি হয় না যে, আমরা এখন খানকায় চলে গেলাম এরপর ওখান থেকে হাসান ক্রুসুকে সাথে নিয়েই তাঁর দাদুর কাছে গেলাম।
– মুনযির বিন যুবাইর সাথে সাথে নেতিবাচকভাবে মাথা ঝাকিয়ে বললেন: না বেটি! পুরো কওম, আমাদের বস্তি আর তোমার ও হাসান ক্রুসুর ভবিষ্যতের স্বার্থে আমি তোমার এ প্রস্তাবের সাথে একমত হতে পারছি না। চলো আমরা সরাসরি জাবির বিন মুগীসের ওখানে যাই। আমাদের পেছনে পেছনেই হাসান ক্রুসু চলে আসবেন। আমার দুর্ভাগ্য আমি তাঁর শারিরিক সংকটাপন্ন অবস্থার সংবাদ জানি না। তাকে দেখাই এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। জানি না হাসানের দাদু তাঁর সাথে যেতে রাজি হবেন কি না। হাসান কিন্তু বেশিক্ষণ তাঁর দাদুর ওখানে থাকতে পারবে না। তাঁকে মধ্য রাতের দিকেই সাগরে নেমে যেতে হবে।
– হাসান ক্রুসুর চলে যাবার কথা উঠতেই মা’আয উদাস হয়ে পড়ল। সে যেন অন্য কোনো জগতে হারিয়ে গেল।
– বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মা’আয মুনযিরকে জিজ্ঞেস করলো— আচ্ছা চাচা! তিনি কোত্থেকে আসলেন, কেনই বা এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন, কোন দিক থেকে আসলেন আর কোন দিকে চলে যাচ্ছেন, তিনি কি কোনো অভিযানে নামতে যাচ্ছেন, এসব ব্যাপারে আপনি নিশ্চয় কিছু জানেন। আপনি তো তাঁদের অনেক খবরই রাখেন।
– মুনযির বিন যুবাইর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। বললেন: মা! সে আজ রাতে তাদের নৌবহরের একাংশ নিয়ে পশ্চিম দিকে চলে যাবে। তাঁর আমীর খাইরুদ্দীন বারবারুসা বর্তমানে কুস্তুনতুনিয়ায় অবস্থান করছেন। হাসান ক্রুসুও তাঁর সাথেই ছিল। বারবারুসা তাঁর গোয়েন্দা মারফৎ জানতে পারেন নয়া দুনিয়া থেকে সোনা রুপা বোঝাই কটা জাহাজ স্পেনে এসে পৌঁছাচ্ছে। সেই জাহাজগুলোকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেবার জন্য তিনি হাসান ক্রসুর কমান্ডে একটা নৌবহর পাঠিয়েছেন। তাঁর সাথে রয়েছেন কাকাদ। ইউরোপীয়রা যাকে শয়তান শিকারী নামে অভিহিত করে থাকে। হাতে কিছুটা সময় থাকায় তাঁরা আমাদের ওদিকে একটা চক্কর দিয়ে যাচ্ছেন।
– মুনযির বিন যুবাইর কথা বলে থামতেই মা’আয পূর্বাপেক্ষা অধিকতর উদাস ও বিষন্ন হয়ে পড়ল। সে শংকিত কন্ঠে বলে উঠল: নয়া দুনিয়া থেকে যে জাহাজগুলো মূল্যবান সম্পদ নিয়ে আসছে নিশ্চয় তারা অরক্ষিত থাকবে না। অবশ্যই মালবাহী এ জাহাজগুলো যুদ্ধ জাহাজের প্রহরায় থাকবে। ফলে অভিযানটা হবে বড়ই খতরনাক।
– জবাবে মুনযির বিন যুবাইর মুচকি হেসে বললেন: মা মা’আয! এ নিয়ে এতো চিন্তিত হবার কোনোই কারণ নেই। একটু পূর্বে তুমি হাসান ক্রুসুর তলোয়ারের জৌলুষ দেখেছো। প্রতিপক্ষকে কি ভাবে বড়শিতে লাগা মাছের ন্যায় হয়রান পেরেশান করে মৃত্যুর তীরে পৌঁছাতে সে কৌশলেরও কিছুটাও দেখেছো। শুনো বেটি! বারবারুসার প্রতিটি সাথী মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে অভ্যস্ত। এরা যখন শত্রুর দিকে অগ্রসর হয় তখন অাকাশ লুহাওয়ার ঝাপটায় আঁধিয়ারার মতো ধোঁয়াটে হয়ে যায়। শত্রুকুলের মৃত্যু তখন উলঙ্গ উল্লাসে মেতে উঠে। এরা চতুর্মুখি মৃত্যুর প্রহরায় থাকা গভীর অন্ধকার কুপ থেকেও তাদের কাঙ্খিত শিকার ছিনিয়ে নিয়ে আসতে এতটুকু ইতস্ততা করে না। এরা রাতের গালে হীমের বিষাক্ত থাপ্পর মেরে যাওয়া রুক্ষ বাতাসের ঝাপটায় উজাড় বিরাণ প্রান্তরেও জীবনের চারাগাছ লাগিয়ে যায়। এরা নিজেদের রক্ত দিয়ে কওমের ভবিষ্যত ইতিহাস লেখে যায়।
বেটি মা’আয! এরা যেমন ইসলাম আর মুসলিম জাতির জন্য এক বড় নেয়ামত, গুলে লালার স্নিগ্ধ হাসি, শবনমের পবিত্রতা, রেশমের কোমল পেলবতা, জহরতের নয়নমোহন ঔজ্জ্বল্য, অস্তিত্বের জন্য অক্সিজেন স্বরূপ, তেমনি শত্রুর জন্যে এরা শরীর জ্বলসে দেয়া অনলবর্ষী আদিত্য। লুহাওয়ার সর্বধ্বংসী তাণ্ডব। গুমোট রাতে পাঁক খাওয়া ভয়াল ঘূর্ণি।
– বেটি! আমি জানি হাসান ক্রুসুকে তুমি দীলের কতটুকু গভীর থেকে ভালোবাসো। তথাপি আমি তোমাকে বলছি তার জন্যে কোনো দুশ্চিন্তায় ভূগো না। এরা নশ্বর এই জীবনটাকে তেমন ভালোবাসেন না। আর আমি তোমাকে একটা মূল্যবান তথ্য বলি শুনো! যাঁরা নশ্বর জীবনকে ভালোবাসেন না মৃত্যুও তাদেরকে ভালোবাসে না। মৃত্যু তাঁদের থেকে যোজন যোজন দূরে পালিয়ে বেড়ায়। পক্ষান্তরে যারা এ নশ্বর জীবনটাকে ভালোবাসে মৃত্যুও তাদেরকে ভালোবাসে। মৃত্যু তাদের খুঁজে সর্বত্র চষে বেড়ায়।
– মুনযির বিন যুবাইর এ পর্যন্ত বলে হাল্কা বিরতী নিয়ে বললেন: বেটি মা’আয! আমাদের এখানে দাড়িয়ে থাকা সমীচীন নয়। চল আমরা সাহিলের দিকে এগিয়ে যাই।
– কথাটা বলেই মুনযির তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বসলেন। মা’আযও তার ঘোড়ায় চড়ে বসল এরপর তারা সমান্তরালে ঘোড়া দুটো হাকিয়ে সৈকতের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
– গন্তব্যে পৌঁছে তাঁরা ঘোড়া দুটোকে এক জায়গায় বেঁধে রেখে জাবির বিন মুগীসের ঝুপরির দিকে এগিয়ে চললেন। ওখানে জেলেদের ভীর দেখে মা’আয মনে মনে আঁতকে উঠলো। দ্রুত পা চালিয়ে সে মুনযির বিন যুবাইর কে নিয়ে ঝুপরিতে ঢুকে পড়ল। তাদেরকে ওখানে প্রবেশ করতে দেখেই উপস্থিত জেলেদের ক’জন একদিকে সরে গিয়ে তাঁদের বসার জায়গা করে দিলেন। জাবির বিন মুগীসের অবস্থা দেখে মা’আয অত্যন্ত পেরেশানীর সাথে মুনযির বিন যুবাইরকে লক্ষ করে বলল: চাচা! বিকেলে আমরা তাঁকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম এখন দেখতে পাচ্ছি অবস্থা আগের চেয়েও অনেকখানি নাজুক। তার কথা শেষ হবার আগেই পৌড় বয়সী এক জেলে একটু এগিয়ে বসল মাগরিবের সময় থেকেই তাঁর অবস্থা আশংকাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। তিনি যে আর বাঁচবেন সে আশা খুবই ক্ষীণ। জেলের কথাটা শুনে মা’আযের ভেতরটা ব্যথায় চিনচিন করে উঠল। এরপর তারা উভয় ইবনে মুগীসের শিয়রে চলে গেলেন। ওদেরকে দেখে ইবনে মুগীসের চেহারায় একটা কষ্টমাখা মুচকি হাসি খেলে গেল। জাবির বিন মুগীস যখন মুনযির বিন যুবাইরকে চিনতে পারলেন তখন অত্যন্ত কষ্টের সাথে জিজ্ঞেস করলেন: আমার হাসান কি এখনো এসে পৌঁছায়নি?
– ইবনে মুনযির জাবিরের পা দুটো টিপে দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন, হ্যাঁ, হাসান এসে গেছে। আপনার অসুস্থতার সংবাদও সে জেনে গেছে। অল্পক্ষণের মধ্যে সে এখানে চলে আসছে। জাবির বিন মুগীস হতাশ কন্ঠে বললেন: আর কখন আসবে? যখন অন্ধকারের আগুনে জীবনের ছাই একাকার হয়ে যাবে? যখন জীবনের বেড়া ভেঙে বেয়ারা আত্মাটা নিরুদ্দেশে হারিয়ে যাবে? যখন কামনার ঝর্ণা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে?
– জাবির বিন মুগীসের এ কথার জবাবে কেউ কিছু বলার সাহস করতে পারলো না। অল্পক্ষণ ঝুপরিতে নীরবতা ছেয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত কেটে যাবার পর মা’আয অত্যন্ত নরোম কন্ঠে জাবির বিন মুগীসকে লক্ষ করে বলল:
– দাদু! আপনি আপনার নাতিকে এখানে আসতে কেন বারণ করেছিলেন।
– জাবির তার দিকে মহব্বতভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন: বোনরে! তাকে এজন্য এখানে আসতে বারণ করেছিলাম যেন সে তাঁর মা ও বোনকে খুঁজে বের করতে অবারিত সময় পায়। কথাটা বলেই জাবির বিন মুগীস নীরব হয়ে গেলেন। তাঁর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ভেতরে ফুঁসে ওঠা একটা উচ্ছ্বাস দমনের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে ধরছেন। তাঁর চোখের কোণ গড়িয়ে ক’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি কান্নার গমকে উছলে ওঠা কন্ঠে বলে ওঠলেন:
– আহ! ওর মা আর বোন ছিল আমার জন্য দ্রাক্ষার অমৃতরসের মতোই প্রিয়। ওরা ছিল আমার চোখ দুটোর জ্যোতি। আমার অস্তগামী আত্মার প্রশান্তি। জানি না ওরা আজ কোন মরু মাঠে পথহারা পথিকের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোন বন বাদার চষে ফিরছে। জানি না ওরা বিপদের কোন কাদায় আটকা পড়ে আছে। কোথায় কাদের দ্বারে দ্বারে ধাক্কা খেয়ে ফিরছে। কোন লৌহকারার অন্তরালে ধুকে ধুকে মৃত্যুকে স্বাগতম জানাচ্ছে। কোন জালিমের ঘরে চাকরানি খাটছে। প্রতি রাতে কেমন সুহাসিনী ভোরের প্রত্যাশায় জীবন অতিবাহিত করছে। আহ কুদরতের কোনো রহস্যভেদী যদি আমার কাছে অন্তত এ টুকু রহস্য উন্মোচন করতো— ওরা আজ কোথায় আছে। কেমন আছে।
– জাবির বিন মুগীস আর বলতে পারলেন না। তাঁর কন্ঠ ধরে এল। তিনি অনেক কষ্টে মুনযির বিন যুবাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন:
– ভাই মুনযির খুব সম্ভব আমার আত্মার উড়ে যাবার প্রস্তুতি শেষ। সে হয়ত তার চলে যাবার জন্য হাসান ক্রুসুর অপেক্ষা করবে না। প্রিয় ভাই! হাসান আসার আগেই যদি আমার আত্মাটা দেহ পিঞ্জিরা ভেঙে উড়ে যায় তাহলে তাকে বলবে তোমার দাদু তোমাকে ক্ষমা করে গেছেন। আহ! মৃত্যুর পূর্বে যদি আমি একটিবার ওর প্রিয় মুখটা দেখতে পেতাম। সে আমার রক্তের আখেরি ওয়ারিস। বেঁচে থাকা আমার বংশের একমাত্র সদস্য। আমি দীলের আলো জ্বেলে আঁধার রাতে কেবল এই দু’আই করি— জমিন ও আসমানের খালিক আমার মাবুদ! আমার নাতি হাসান ক্রুসুকে তুমি দীর্ঘ জীবন দান কর। তাঁকে প্রশান্তি ও সমৃদ্ধি দান কর। তাঁর অন্তরে কওম ও মিল্লাতের প্রতি দরদের আগুন জ্বালিয়ে দাও।
– জাবির বিন মুগীসের অবস্থা মুহূর্তে মুহূর্তে সংকটাপন্ন হয়ে উঠছিল। ক্রমেই তার আওয়াজ ক্ষীন হয়ে আসছিল। মা’আয এ অবস্থা দেখে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলো। মুনযির বিন যুবাইরও নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর চোখ দিয়েও শ্রাবণের বারিধারা বইছিল। জাবির বিন মুগীসের শিয়রের পাশেই মেঝেতে গেড়ে রাখা একটা শামাদানে ছোট্ট একটা চেরাগ জ্বলছিল। বাতাসের ঝাপটায় চেরাগের আলোটা ক্ষণে মিইয়ে যাচ্ছিল আবার ক্ষণে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিল।
– ঠিক সে সময় হাসান ক্রুসু তাঁর দাদুর ঝুপরির দরজায় এসে উপনীত হলেন। মা’আয আর মুনযির দরজাকে পিছনে রেখে জাবির বিন মুগীসের দিকে দৃষ্টি করে রেখেছিলেন, ফলে তাঁরা হাসান ক্রুসুর উপস্থিতি টের পাননি। হঠাৎ তারা শুনতে পান হাসান ক্রুসু কন্ঠে জগতের নিচয় বিনয় ঢেলে বলছেন— দাদু! আমি কি ভেতরে আসতে পারি?
– শব্দটা শুনে মা’আয আর মুনযির যেন একযোগে তড়িতাহত হয়ে পড়লেন। তারা উভয় নিজ নিজ জায়গায় উঠে দাড়ালেন। দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা হাসান ক্রুসুকে লক্ষ করে মা’আয কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই জাবির বিন মুগীসের কম্পিত কন্ঠে উচ্চারিত হলো! বোন মা’আয! আমি হাসান ক্রুসুর কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম সত্যিই কি সে এসে গেছে? সে যদি এসেই থাকে তাহলে তাকে বলো তাড়াতাড়ি যেন আমার শিয়রে চলে আসে। আমার রুহ পরপারে পাড়ি জমানোর জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। রুহ চলে যাবার পর এসে কী লাভ?
– জাবির বিন মুগীসের ক্ষীণ কন্ঠের এ কথাগুলো একদিকে যেমন হাসান ক্রুসুর আত্মাটা গলিয়ে দিচ্ছিল, অপরদিকে মা’আযের অবস্থাটাকে করুণতর করে তুলছিল। ঝুপরিতে উপস্থিত অন্যান্য জেলেদের অন্তরেও বেদনায় প্রবল একটা ঢেউ জাগিয়ে দিয়েছিল।
– হাসান কথাটা শুনে পাগলের ন্যায় দৌড়ে ঝুপরিতে ঢুকে মাটিতেই তাঁর দাদুর শিয়রের পাশে বসে পড়লেন। এরপর দাদুর মাথাটা নিজ কোলে তুলে নিয়ে কম্পিত কন্ঠে বলতে লাগলেন: দাদু ওঠো! চেয়ে দেখ! তোমার অপরাধী নাতি হাসান তোমার শিয়রের পাশে বসে রয়েছে। দাদুগো ওঠো! তোমার ব্যর্থ অথর্ব এ নাতিটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে আহত করে ফেল। দাদু ওঠো! লৌহশলাকা গরম করে আমি অথর্বের শরীরটা দাগিয়ে দাও। কিন্তু তারপরও আমাকে একা ফেলে চলে যাবার কথাটা বলো না।
– হাসান ক্রুসুর অন্তর ছেঁচা কথাগুলো ঘরের সবার দীলে সদমার তুফান জাগিয়ে তুলছিল। মা’আযের হেচকি বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়ে পড়েছিল। সবার চোখ দিয়েই অবিরল ধারায় অশ্রু গড়াচ্ছিল।
– হাসান কাঁদছিলেন আর ধরা গলায় বলছিলেন: তোমার বংশের কলঙ্ক আমি এখনো তোমার দেয়া দায়িত্ব আদায় করতে সক্ষম হইনি। আমি নেহায়েত মুজরিম। আমি স্বতঃই আমার জুরুম স্বীকার করছি। আমি তোমার দেয়া যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। ওঠো দাদু। লৌহশলাকা গরম করে আমার শরীরটা জ্বলসে দাও। আমার শরীরের গোস্তগুলো টেনে টেনে ছিঁড়ে নাও। হাড়গুলো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দাও। তথাপি এ দুনিয়ায় আমাকে একা রেখে চলে যাবার কথা মুখে এনো না। আমি দুনিয়ার সব কষ্ট সহ্য করতে পারি, যে কোনো বিপদসংকুল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারি, কিন্তু দুনিয়ায় তোমার অনুপস্থিতি কল্পনাও করতে পারি না।
এরপর হঠাৎ পাশে জ্বলতে থাকা মশালটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে হাসান তাঁর দাদুকে লক্ষ করে বলতে লাগলেন: দাদু! এই মশালটা হাতে নাও। এর আগুনে আমার শরীরটা জ্বালিয়ে ছাই করে দাও। আমি এমনতর শাস্তি পাবারই উপযোগী। আমি হতভাগা নিজেতো মা বোনের হেফাযত করতে পারি নি উপরন্তু আজ পর্যন্ত তাঁদের কোনো খুঁজও বের করতে পারিনি। তাই আমাকে তুমি যে কোনো শাস্তি দাও কবুল, তথাপি আমাকে অসহায়ত্বের সাগরে ভাসিয়ে যেয়ো না।
মা’আয এতক্ষণ ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল। হাসানের এ কথাগুলো শুনে সে স্থান-কাল-পাত্র সবকিছু ভুলে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। নরম আত্মার মেয়েটা নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে মাটিতে পড়ে কাটা কবুতরের ন্যায় তড়পাচ্ছিল। হঠাৎ কী যেন মনে হতে সে উঠে বসল এবং চট করে হাসানের হাত থেকে মশালটা ছিনিয়ে পুনরায় মেঝেতে রেখে দিল। অতঃপর দু’রানের ফাঁকে মাথা লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এদিকে হাসান ক্রুসুর লোনা অশ্রুতে তাঁর দাদুর সফেদ শশ্রু ধুয়ে যাচ্ছিল।

আরও পড়ুন : সমুদ্র ঈগল ১৮ (খ)

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...