শুক্রবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ ভোর ৫:৫৭
Home / প্রতিদিন / জামায়াত প্রসঙ্গে একটি পর্যালোচনা
কবি সৈয়দ মবনু

জামায়াত প্রসঙ্গে একটি পর্যালোচনা

সৈয়দ মবনু ::

কবি সৈয়দ মবনু
কবি সৈয়দ মবনু

(দ্রাবীড় বাংলার রাজনীতি’ বই থেকে)

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবূল আলা মওদুদী। এই দলের প্রতিষ্ঠাকালে তাঁর বয়স ছিলো ৩৮ বছর। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের মার্চে মুসলিমলীগ লাহোরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ পাশ করার আগেই মাওলানা মওদূদী একটি পাটি প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করতেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ‘তানকিহাত’ এ প্রকাশিত মাওলানা মওদূদীর একটি রচনায় ‘ ইসলামী বিপ্লব, ইসলামী সংগঠন, দেশের সকল অংশে ইসলামী বিপ্লবের জন্য ট্রেনিং সেন্টার খোলা’ ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। আর এই উদ্দেশ্যেই তিনি প্রথমে ‘ ইদারা-ই-দারুল ইসলাম’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জামায়াতে ইসলামী নামে আত্মপ্রকাশ করে। মাওলানা মওদুদী মূলত একজন লেখক, গবেষক এবং চিন্তক ছিলেন। দল গঠনের আগে মাওলানা মওদুদীর পরিচিতিটা সুধী মহলে এসেছিলো ‘ মাসিক তরজমানুল কোরআন’ পত্রিকার সম্পাদক, এবং ‘আল- জিহাদ ফিল ইসলাম’ গ্রন্থের রচনা ইত্যাদির মাধ্যমে। অবশ্য তিরিশের দশকে দল গঠনের চিন্তাকে মাওলানা মওদূদী বাঁকা চোখে দেখতেন। তাঁর নিজের বক্তব্য-‘মুসলমানরাতো এমনিতেই সুসংগঠিত একটি জামায়াত। নতুন নতুন নামে মুসলমানদের মধ্যে আলাদা সংস্থা গড়ে তোলা, নতুন নতুন পরিচিতির মাধ্যমে মুসলমানদের পার্থক্য সৃষ্টি করা কিংবা নতুন নামে নতুন চিন্তাধারা গড়ে তোলা এবং মুসলমানদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিরোধপূর্ণ শ্রেণীতে বিভক্ত করে ফেলা আসলে মুসলমানদের শক্তিশালী করা নয়; বরং এতে তাদেরকে আরো দূর্বল করে ফেলা হয়। এগুলো কোন সাংগঠনিক কাজও নয়। এতে বিভক্তি এবং বিভিন্ন বিরোধী দলই সৃষ্টি করা হয় মাত্র। কিছু কিছু দল অন্ধের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগঠিত দল গঠনের এই পদ্ধতি শিখেছে পাশ্চাত্যের কাছ থেকে। (সাইয়েদ আবুল আল মওদূদী, Movement for India’s Independecne and Muslims. vol-1)

কিন্তু তাঁর নিজের মূল পরিচিতিটা এলো সংগঠক হিসেবে। এরও আগে মাওলানা সাইয়েদ আবূল আলা মওদুদী জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাথে কিছুটা সম্পর্কিত ছিলেন বলে বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দে’র বুলেটিন ‘আল-জমিয়ত’-এর সম্পাদক হিসেবে তিনি কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন কারণে তৎকালীন ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দে’র সভাপতি মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানীর সাথে মাওলানা মওদুদীর মতানৈক্য হয়। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে এই মতানৈক্য জনসমক্ষে আসে ‘জামায়াতে ইসলামি’রূপে। মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী ও মাওলানা আহমদ রেজা খান বেরলভীর ভক্ত-শিষ্য এবং গোটা দেওবন্দী উলামারা বলে থাকেন মাওলানা মওদুদীর সাথে তাদের সংঘাত আকিদাগত। মাওলানা মওদুদী নাকি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে হযরত রাসুল (সা.)’র সম্মানিত সাহাবিদের সমালোচনা করেছেন। এই সব সমালোচনার প্রত্যুত্তরে জামায়াতে ইসলামি ছাড়া অন্যান্য আলেমরা ইতোমধ্যে গোটা বিশ্বে বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামির পক্ষ থেকেও এ সব অভিযোগের উত্তর দিয়ে প্রচুর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো-‘মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানীর সাথে মাওলানা সাইয়েদ আবূল আলা মওদুদীর মতানৈক্য কোনো আকিদাগত নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। মাওলানা মওদুদী অখণ্ড ভারতের বিপক্ষে চলে গেলে মাওলানা মাদানীর তাঁর সাথে মতানৈক্য শুরু হয়।’দেওবন্দী এবং বেরলভী উলামাদের মধ্যে যারা অখণ্ড ভারতের বিপক্ষে ছিলেন তারা জামায়াতে ইসলামির এই বক্তব্য খণ্ডন করে বলেন-‘জামায়াতে ইসলামি প্রতিষ্ঠার পরও প্রথম দিকে মাওলানা মওদুদী দীর্ঘদিন মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানীর মতোই পাকিস্তান আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন। তবু যদি তর্কের কারণে মানতে হয় যে, মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানীর সাথে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর অখণ্ড ভারত নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত ছিলো। তা না হয় মেনে নেওয়া গেলো কিন্তু আমাদের সাথে সংঘাতটা কিসের? আমরা তো পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। বাস্তব সত্য হলো, মাওলানা মওদুদীর সাথে আমাদের সংঘাত রাজনৈতিক নয়, আকিদাগত।’আকিদা বিষয়ক পর্যালোচনায় আমি যাবো না, তা বিবেচনা করবেন আকাইদ বিশেষজ্ঞরা। তবে রাজনৈতিক বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করতে পারি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি যে মাওলানা সাইয়েদ আবূল আলা মওদুদীর খুব একটা উৎসাহ ছিলো না, তা তাঁর তৎকালীন বিভিন্ন বক্তব্যেই প্রস্ফূটিত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন যে, ‘আমার ভবিষ্যদ্বাণী দেবার কোনো যোগ্যতা নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেমন বলা যায় যে, লেবু গাছে আম হতে পারে না। তেমনি যাদের নেতৃত্বে মুসলিম রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোলন চলছে তাদের হাতে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম হতে পারে না। তাদের দ্বারা শুধু একটি মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কায়েম হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন-‘এ রাষ্ট্রটি কায়েম হওয়ার পর যাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালিত হবে, তারা এটাকে কিছুতেই ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দেবে না। কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামি আন্দোলনকে দমন করার জন্য জেলে দেওয়াকেই যথেষ্ট মনে করতে পারে। কিন্তু এ জাতীয় রাষ্ট্রে ইসলামি আন্দোলনের অপরাধে ফাঁসী দিতেও পরওয়া করবে না’ (Process of Islamic Revolution, by Molana Abul-ala Mududi, 1940).

মাওলানা মওদুদীর এই বক্তব্যের সাথে মাওলানা মাদানীর এই বক্তব্যের আশ্চর্য্যজনক মিল আমরা দেখতে পাই। মাওলানা মাদানী বলেন যে-‘আগর হিন্দুস্তান মে মুসলমান খাতরামে হু তো ইয়াদ রাকহে ইয়ে জিস তরাহ পাকিস্তান হু রাহা হে খোদ ইসলাম খাতরামে চলা যায়েগা’ অর্থাৎ যদি হিন্দুস্তানে মুসলমানের নিরাপত্তা না থাকে তাবে স্মরণ রাখবেন যে পদ্ধতিতে পাকিস্তান হচ্ছে সেখানে ইসলাম নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে যাবে। (মাওলানা মাদানীর বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে এ বক্তব্য লিপিবদ্ধ রয়েছে)। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও শরীয়া বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোঃ মাইনুল আহসান খান লিখেছেন-‘মুসলিমলীগ যে ইসলামের স্বার্থবিরোধী কাজ করছে, তা বুঝতে শিক্ষিত মহলের তেমন অসুবিধা হলো না। কিন্তু অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। তারপরও আলেম-উলামারা ভারতবর্ষে দ্বি-জাতিতত্ত্বভিত্তিক রাষ্ট্র সৃষ্টির বিরোধিতা করেন। এই বিরোধিতার একটি ফসল হচ্ছে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামি। গোড়াতে চিন্তা করা হয়েছিলো যে, এটি হবে সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলমানদের একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন। এটি স্পষ্টতই মুসলিমলীগ থেকে আলাদা হবে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির আলোড়নে এরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই দলের প্রভাবশালী নেতা মাওলানা মওদুদী নিজেই পশ্চিম-পাকিস্তানে হিজরত করেন। মুসলিমলীগ নেতারা পাকিস্তান সৃষ্টি করেই ইসলামকে ঘিরে এমন সব রাজনৈতিক ইস্যু মুসলমানদের হাতে ধরিয়ে দেন যে, এরা ঐসব ইস্যুকেন্দ্রীক বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসলিমলীগ যখন গণধিকৃত হচ্ছিল দ্রুতগতিতে, তখন জামায়াতে ইসলামি পুরোপুরি গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলো।…..জামায়াতে ইসলামি আদর্শগতভাবে মুসলিমলীগের সাথে ভিন্ন হলেও বাস্তবে তারা সর্বদাই মুসলিমলীগের মিত্র। (সাংবিধানিক আইন রাজনীতিতে ধর্ম ও স্বাধীনতা।’ পৃ. ১৮, জুলাই ১৯৯৮)।

পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামি মুসলিমলীগের সঙ্গ নিয়ে বাস্তবে বারবার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে । সামরিক শাসক আয়ূব খানের বিরুদ্ধে যখন গোটা পাকিস্তানে গণআন্দোলন গর্জে উঠে তখন ইচ্ছে করলে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি ভিন্ন প্লাটফরম সৃষ্টি করতে পারতো। এটাই প্রত্যাশা ছিলো অনেক সুধীজনের। ভারতবর্ষে অনেকে মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাথে জামায়াতে ইসলামীকে চিন্তা করেছিলেন। সময়ের ব্যবধান তেমন একটা ছিলো না এই দুই দল এবং দুই দলের জনকের মধ্যে। ইখওয়ানের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নার জন্ম ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আর মাওলানা মওদূদীর জন্ম ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধান। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের জন্ম আর ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জামায়াতে ইসলামীর জন্ম। ব্যবধান হলো বারো বছরের। ভৌগলিক ব্যবধান মিশর এবং ভারত। তবে এই দুই সংগঠনই একটি ইসলামী রাষ্ট্রের স্পিরিট বা প্রাণশক্তি নিয়ে মাঠে এসেছিলো। বাস্তবে কেউই ভূ-খণ্ডগতভাবে বিশ্বের কোথাও একদিনের জন্য একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তবে রাজনৈতিক ইসলামে তাদের উভয়ে স্পিরিট বিশ্বব্যাপী প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী চিন্তক ‘ কনফ্লিকট ক্রাইসিস এন্ড ওয়্যার ইন পাকিস্তান’ এবং Movement for India’s Independecne and Muslims. vol-1 ইত্যাদি গ্রন্থসমূহের লেখক, বৃটেনে ইসলামি জাগরণের অন্যতম নেতা ‘বৃটিশ মুসলিম পর্লামেন্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা ড. কলিম সিদ্দিকীর মতে-‘ যদি বলা যায় মুসলিম উম্মাহ জাহিলিয়াতের কালো গহবরে এখনো পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়ে যায়নি তাহলে সেটা সর্বাংশে না হলেও কিছুটা অবশ্যই ইখওয়ান এবং জামায়াতের কারণে। এতদসত্তেও এটা অবশ্যই বলা দরকার যে ইখওয়ান এবং জামায়াত সরাসরি জাহিলিয়াতকে চ্যালেঞ্জ করেনি বা করার সাহস পায়নি; অথচ এটা তাদের অবশ্যই কর্তব্য ছিলো। যে রাজনৈতিক অথর্বতায় ইসলাম খাবি খাচ্ছিলো তা থেকে উদ্ধারের যে ইসলামী তেজশক্তির প্রয়োজন ছিলো তা ওরা সরবরাহ করেনি। পাকিস্তানে জামায়াত চেষ্টা করেছে উপনিবেশী ব্যবস্থাধীন গণতন্ত্রের ঠান্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে চুল্লিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানীর যোগান দিতে। স্বদেশী সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা ইখওয়ান অন্যদের চেয়ে ভালো বুঝতে পেরেছিলো। এই কারণেই মিশরে ইখওয়ান অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে। যার তুলনায় পাকিস্তানে জামায়াত অনেকটা সহনীয় চাপের সম্মুখীন হয়েছে। কারণ পাকিস্তানে জামায়াত পরিবর্তনের উপায় হিসেবে গণতন্ত্রের একচেটিয়া ব্যবহারের উপরেই দৃঢ়সংকল্প ছিলো। তাদেরকে অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দলের মতোই একটি দল হিসেবে গণ্য করা হয়েছিলো। এ থেকেই সিদ্ধান্তে আসা সম্ভবত অনুচিত হবে যে ইখওয়ান এবং জামায়াত উভয় নেতৃত্বই ইসলামের গতিশীল শক্তির পরিমাণ, প্রকার এবং মানকে খুব বেশি খাটো করে দেখেছিলো। বিদেশী উপনিবেশী শক্তি এবং তাদের দোসর স্বদেশী দালালদের শক্তিকে পরাভূত করার জন্যে ইসলমের এই গতিশীল শক্তি সত্তারই প্রয়োজন ছিলো বেশি। এই নিরেট সত্যটুকু ইখওয়ান এবং জামায়াত বুঝতে পারেনি (মূল বইÑ Political Thought and Behaviour of Muslims Under Colonialism, by D. Kalim Siddiqui.)|

আর এই সত্যটুকু বুঝতে পারেনি বলেই জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় প্রথম দিলো ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আয়ূব খানের বিরুদ্ধে পৃথক না দাঁড়িয়ে ফাতেমা জিন্নার মতো একজন অনৈসলামিক মহিলাকে সমর্থন করে ময়দানে তৎপর হয়ে। জামায়াতে ইসলামি পাকিস্তানের ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তালাবার সাবেক নাজিমে আলা (সেক্রেটারি জেনারেল) ডা. ইসরার আহমদের লাহোরস্থ বাসায় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আমি তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম-‘মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী সাহেব প্রথম দিকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি গণতন্ত্রের পথ অনুসরণ করে নির্বাচনে গেলেন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাকে সাহায্য করলেন। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? উত্তরে তিনি বলেন-এসবের বিরুদ্ধে তখন আমি কথা বলেছি। পাকিস্তানের দ্বীনি সংগঠনগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন মাওলানা মওদুদী। আমার মতে এটা তাঁর অনেক বড় বিভ্রান্তি। আমি মনে করি পাকিস্তানে ইসলামি হুকুমত কায়েম না হওয়ার জন্য সবচাইতে বড় দায়ী মাওলানা মওদুদীর এই ভুল সিদ্ধান্ত। আমি যখন ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ছাত্র জীবন শেষ করে জামায়াতে ইসলামিতে যোগ দিলাম এবং দলের রোকন হয়ে গেলাম তখন বুঝতে পারলাম জামায়াতে ইসলামি ভুল পথে চলছে। দলের নীতিগত পরিবর্তন আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। আমি এমন একটা ধারণা নিয়ে জামায়াতে গিয়েছিলাম যে, তাদের মধ্যে তাকওয়া, লিল্লাহিয়ত, আদর্শ থাকবে-আমি তাদের সাথে থাকলে নিজেও এসবের উপর আমল করতে পারবো। কিন্তু দেখলাম এসবের কিছুই তাদের মধ্যে নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহনের পূর্বে জামায়াতে ইসলামি ছিলো একটি আদর্শবান ইসলামি ইনকিলাবী সংগঠন। নির্বাচনের পর তা হয়ে গেলো ইসলাম পছন্দ একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। আমি তৎকালীন সময় জামায়াতে ইসলামির বিভিন্ন বৈঠকে এসব কথা উপস্থাপন করেছি। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপনের ইচ্ছে ছিলো কিন্তু মাওলানা মওদুদী সে সুযোগ দিলেন না। তিনি চারজন রোকন পাঠালেন আমার বক্তব্য শোনার জন্য। আমি লিখিতভাবে উদাহরণসহ বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, জামায়াতে ইসলামির নীতি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনটা এক প্রকারের বিভ্রান্তি। এই বিভ্রান্তির পথে আমরা এখনো তেমন অগ্রসর হইনি বলে ফিরে আসার সুযোগ আছে। আমার অনুরোধ ফিরে আসুন। আমার এই বক্তব্য পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। মাওলানা মওদুদীর আত্মবিশ্বাস ছিলো নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। কিন্তু এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল ছিলো। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে আমি যখন দেখলাম জামায়াত দ্বারা উদ্দেশ্য সফল হবে না তখন আমি নিজেই জামায়াত ত্যাগ করলাম। প্রায় ৪২ বছর হয়ে গেছে আমি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন। (‘লাহোর থেকে কান্দাহার’-গ্রন্থে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার রয়েছে)। মাওলানা মওদূদী নির্বাচনে গিয়েই শেষ নয়, তিনি গণতন্ত্রের পক্ষেও নতুন নতুন ইসলামী ব্যাখ্যা তৈরী করতে লাগলেন। তিনি বলতে শুরু করলেন-‘ মুসলমানদের জন্য উপযোগ যদি কিছু থাকে তাহলে তা হলো গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এই আন্দোলন মুসলমানদেরকে এক সমাজভুক্ত বলেই মনে করে যেখানে পরিবর্তন আর স্থিতিশীলতা নবী পাক (স.) এর জামানার গণতান্ত্রিক চর্চার সমানুপাতেই পরিলক্ষিত হয়।’ (সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী, Movement for India’s Independecne and Muslims. vol-1)।

মোটকথা ফাতেমা জিন্নাকে সমর্থন করে জামায়াতে ইসলামির নির্বাচনে যাওয়াটা ছিলো মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামির স্থপতি হিসেবে আমরা দেখতে পাই বহুগ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা আব্দুর রহীম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাওলানা আব্দুল খালিককে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই মাওলানা মওদুদীর সাথে মাওলানা আব্দুর রহীমের মতানৈক্য শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ রাতের গভীরে জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের লেলিয়ে দেওয়া পাক সৈনিকেরা বাংলায় গণহত্যা শুরু করলে জামায়াতে ইসলামি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পাক বাহিনীর সাহায্যার্থে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী গঠনটা ছিলো তাদের আরেকটি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় মাওলানা আব্দুর রহীমের সাথে যে মাওলানা মওদুদীর মতানৈক্য হয়েছে, তা পর্দার আড়ালে থেকে যায়। এই মতানৈক্যের কারণেই ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বে গঠিত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর নেতৃত্বে মাওলানা আব্দুর রহীমের পরিবর্তে অধ্যাপক গোলম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রমুখ। ৭১-এর পর আমরা আর মাওলানা আব্দুর রহীমকে জামায়াতে ইসলামির রাজনীতিতে সক্রিয় দেখিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে জামায়াতে ইসলামির রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো। মেজর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর পূর্বের সকল রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিলে জামায়াতে ইসলামি আবার ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠে। পাকিস্তান যুগে জামায়াতে ইসলামি যেমন ছিলো মুসলিমলীগের মিত্র, তেমনি আজকের বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামি বিএনপির মিত্র। শক্ত সাংগঠনিক অবস্থা থাকার পরও তারা আজও নিজস্ব কোনো বলয় সৃষ্টি করতে পারেনি। শুধু বাংলাদেশে নয়, পাকিস্তানেও তাদের একই অবস্থা। জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বের অদূরদর্শীতাই এজন্য প্রধান দায়ী। অনেক ধরণের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও বাংলাদেশে তারা বিতর্কিত নেতৃত্বের কারণে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলো। দলের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীকর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন গ্রন্থে মহানবি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদেরকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা থাকায় মুসলমানদের একটি বিরাট অংশের কাছে তিনি বিতর্কিত হয়ে আছেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নার পক্ষে মাওলানা মওদুদীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইলামীর অংশগ্রহণ, ১৯৭১-এ অধ্যাপক গোলাম আযম এবং মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে পাকিস্তানীদের পক্ষে আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার বাহিনী গঠনের অভিযোগ ইত্যাদি জামায়াতের অনেক নেতাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কিত করে রেখেছে। জামায়াতে ইসলামি এই বিতর্কিত নেতৃত্বের হাতে যতদিন ছিলো ততদিন জনগণের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামিতে আদর্শিক দ্বান্দ্বিকতা স্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামি একদিকে ইসলামি বিপ্লবের কথা বলে আবার গণতন্ত্রের কথাও বলে, অথচ একের সাথে অন্যের সংঘাতটা সাপে-নেউলে। বিপ্লবের পদ্ধতি নিয়ে জামায়াতের কর্ণধারগণ মারাত্মক দ্বান্দ্বিকতায় আছেন। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফারাসী বিপ্লব, ইউরোপের শিল্প বিপ্লব, চীন কিংবা রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লব, ইরানে খোমেনীর বিপ্লব, আফগানিস্তানের তালেবান-বিপ্লব ইত্যাদি পৃথিবীর ইতিহাসে সফল কোনো বিপ্লব কি গণতান্ত্রিক প্রদ্ধতিতে সম্ভব হয়েছে? বিপ্লব মানেই তো পুরাতনকে ভেঙে নতুন করে সাজানো। ভাঙা মানেই তো লড়াই। জামায়াত এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের কর্মীরা এক সময় শ্লোগান দিতেন-‘এ সমাজ ভাঙতে হবে, নতুন সমাজ গড়তে হবে, ভাঙতে গেলে বাধঁবে লড়াই, সেই লড়াইয়ে জিততে হবে, সেই লড়াইয়ে জিতবে কারা? আল-কোরানের সৈনিকেরা।’ গণতন্ত্র দিয়ে আর কিছু হলেও বিপ্লব হবেনা, তা স্পষ্ট কথা। জামায়াতে ইসলামির লোকেরা বলেন তারা ক্ষমতায় গেলে সৎলোকের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। সৎলোকের শাসনটা মূলত কী? তা তারা স্পষ্ট করে বলছেন না মূলত পশ্চিমাদের ইসলামাতঙ্কের কারণে। জামায়াতে ইসলামি বর্তমানে যেভাবে পশ্চিমা রাজনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাতে অনেকই আশংকিত যে, শেষ পর্যন্ত তারাও যদি মুসলিমলীগের মতো কোনো মুসলিম জাতীয়তাবাদী সংগঠনে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে-সব আলোচনা-সমালোচনার পরও বলতে হবে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের একটা উত্থান ঘটিয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষার্থে জামায়াতে ইসলামিকে এসব দিকে দৃষ্টি দিয়ে আরও বিবেচনা করে আগামীতে তাদের নীতি-পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে।

(সৈয়দ মবনু, দ্রাবির বাংলার রাজনীতি, প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ)

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...