বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ৯:৫৭
Home / আকাবির-আসলাফ / একজন আলী মিয়া

একজন আলী মিয়া

সৈয়দ আব্দুল্লাহ:

13941019_512667428944271_1345717241_n২৪ বছর বয়সী এক ভারতীয় তরুন একটি বই লিখলেন আরবীতে। তার ইচ্ছা বইটি আরববিশ্ব থেকে প্রকাশিত হোক। পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলেন মিশরের এক খ্যাতনামা প্রকাশনীতে। বেশ কিছুদিন পর তিনি হজ্বের সফরে আরবে গেলেন। দেখলেন সেখানের লোকেরা একটি বইয়ের কথা বলছে। তারা বলছে ভারতীয়রাও আজকাল দুর্দান্ত আরবী লিখছে। তরুন লেখক জানতে চাইলেন কে সেই ভারতীয়, বইটির নামই বা কি?

জবাব এলো ‘বইয়ের নাম ‘মা যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমিন।’ লেখক চমকে গেলেন। এতো তার নিজের লেখা সেই বইটি যেটি মিশরে পাঠিয়েছিলেন। বহুবছর পরে এই লেখক হয়ে উঠেছিলেন আল্লামা নদভী। তিনি ছিলেন ভারতীয় মুসলিমদের আশা আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এমনকি পরামর্শ নিতে তার ভাংগা কুটিরে ছুটে আসতেন বড় বড় মন্ত্রী উপদেষ্টা আর পার্লামেন্টারিয়ানরাও। বিশেষ প্রয়োজনে ইন্দিরা গান্ধী তার সাথে দেখা করতে চাইলেন। আল্লামা নদভী অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী জরুরি মনে করে হেলিকপ্টার হাকান লখনৌর আকাশে। সংবাদ পেয়ে আল্লামা তার প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে বাড়ি চলে যান। তাতেও রক্ষা নেই। সেখানে উপস্থিত হল ইন্দিরা গান্ধীর হেলিকপ্টার। রাজনৈতিক প্রতিপত্তিহীন একজন মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রী ছুটে এভাবে, এটা সত্যিই বিরল। এসেছিলেন রাজীব গান্ধিও। জীবনের শেষ বেলা হালকা প্যারালাইসিস আক্রান্ত হলে তার শয্যাপাশে হাজির হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। বলেন, আপনাকে বিদেশে পাঠাবো উন্নত চিকিৎসার জন্য। আল্লামা নদভী বললেন, যদ্দিন হায়াত আছে লখনৌতেই থাকতে চাই। দাফন রায়বেরেলিতে হলেই খুশি হই।
হ্যা, ঠিক ধরেছেন, আমরা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর কথা বলছি। রায়বেরেলীতে জম্মগ্রহন করা এই মনিষী ছিলেন বালাকোটের স্বাধীনতা সংগ্রামী সাইয়েদ আহমদ শহীদের উত্তরসূরি।
২৪ বছর বয়সে রচিত বইটি তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। বইটি অনুদিত হয়েছে ৭৫ টি ভাষায়।
তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় মিশরে। ১৯৫২ সালে তিনি মিশরে যান। ড. ইউসুফ আল কারযাভী তখন আল আজহারের ছাত্র। তারা শায়খ নদভীকে দেখে মুগ্ধ হন, মুগ্ধ হন তার পাণ্ডিত্য দেখে, আলোচনা শুনে।
মিশরে তিনি সাক্ষাৎ করেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা জাহেদ ইবনুল হাসান আল কাউসারি, ফুয়াদ আব্দুল বাকি, ড. আহমাদ আমিন সহ অন্যান্য বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের সাথে।
তিনি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদওয়াতুল উলামা লখনৌ এর রেক্টর। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়েরট্রাস্টি, ভিজিটিং প্রফেসর কিংবা স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রায় অর্ধশত বছর যাবত তার কলম অবিশ্রান্ত ভাবে লিখেছে মুসলিম ইতিহাস, দর্শন ও পাশ্চাত্যচিন্তাবিষয়ে। সীরাত থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে দর্শন, দর্শন থেকে সাহিত্য সর্বত্রই তার অবাধ গতি। ৫ খন্ডে লিখেছেন তারীখে দাওয়াত ও আযিমত। রাসুলের (সা) জীবনি লিখেছেন নবীয়ে রহমত নামে। লিখেছেন হজরত আলীর (রা) জীবনি, আল মুরতাজা। যব ঈমান কি বাহার আই নামে লিখেছেন আহমাদ শহীদের জীবনি। ভাতিজার জন্য গল্পচ্ছলে লেখা কাসাসুন্নাবিয়্যিন বইটি পায় দামেশক একাডেমী পুরস্কার। অনেক প্রতিষ্ঠানে হয় পাঠ্যসূচিভুক্ত।তিনি ছিলেন মদীনা ইউনিভার্সিটির স্বপ্নদ্রষ্টা। ছিলেন রাবেতা আলমে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তার again towards islam (ইলাল ইসলাম মিন জাদিদ) বইটি ইসলামী চিন্তাচেতনার অন্তর্নিহিত প্রতিপত্তি বিষয়ে রচিত। আরো যা লিখেছেন
আরাকানে আরবাআ
পা যা সুরাগে জিন্দেগি
আত তারিকু ইলাল মদিনা
মাওলানা ইলিয়াস আউর উনকি দ্বীনি দাওয়াত
আসরে হাজের ম্যায় দ্বীন কি তাফহিম ও তাশরিহ
রাওয়ায়ে ইকবাল
দরিয়ায়ে কাবুল সে দরিয়ায়ে ইয়ারমুক তক
শারকে আওসাত কি ডায়েরি
নয়ী দুনিয়া আমেরিকা সে কুছ সাফ বাতে
৭ খন্ডে লিখেছেন নিজের আত্মজীবনি কারওয়ানে জিন্দেগী। কিন্তু তাতে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্বগুলো লিখেননি। পরে তার ছাত্র ড. আব্দুল্লাহ আব্বাস নদভী মীরে কারওয়া নামে সেগুলো সংকলন করেছেন।
তার জীবদ্দশায় তার জীবনি নিয়ে ২৫ টি পিএইচডি হয়। এরপর আরো অনেক হয়েছে। তিনি পেয়েছেন মুসলিম বিশ্বের নোবেলতুল্য বাদশাহ ফয়সল পুরস্কার। উদ্যোক্তারা পত্র দিলো আপনাকে সৌদিআরব আসতে হবে। তিনি বললেন, নানাকাজে বহুবার পবিত্রভুমিতে গিয়েছি কিন্তু পুরস্কারের অর্থ আনতে যাবো না। আমার ছাত্র আব্দুল্লাহ আব্বাস নদভীকে পাঠাচ্ছি । সে বানী পড়ে শোনাবে। তারপর তিনি আব্দুল্লাহ আব্বাস নদভীকে নির্দেশ দিলেন পুরস্কারের তিন কোটি টাকা অর্ধেক ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে বাকী অর্ধেক আফগান শরনার্থী শিবিরে দান করে দিতে। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। কিন্তু পুরস্কারের অর্থ আনতে কোথাও যাননি। পুরস্কারের অর্থ নিজে কখনো গ্রহন করেননি। সব দান করে গেছেন। সারাজীবন তার সম্পদ ছিলো দুজোড়া পোষাক আর দড়ির খাটিয়া। গ্রামের বাড়ী ছাড়া আর কোনো ঠিকানাও ছিলো না তার।
১৯৯৮.
দুবাই সরকার বললো, আমাদের তরুন প্রজন্ম আপনাকে দেখতে আগ্রহী। আপনি আসুন। আল্লামা জানালেন তার অসুস্থতার কথা। বললেন, লখনৌ বিমানবন্দর আভ্যন্তরীণ। ইমিগ্রিশনের জন্য দিল্লি যেতে হবে। আমি অসুস্থ। দিল্লি যেতে পারবো না। দুবাই সরকার রাজকীয় বিমান পাঠালো লখনৌতে। তারপর সরকার টু সরকার কথা বলে। ভারত সরকার লখনৌ বিমানবন্দর কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত করে। ইমিগ্রিশনের সিলছাপ্পড়সহ কর্মকর্তারা দিল্লী থেকে লখনৌ আসেন। আল্লামা নদভী দুবাই যান।
পরদিন হিন্দুস্তান টাইমস হেডিং করে, একজন ভারতীয় মনীষীর জন্য আমাদের স্বাভাবিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা রদবদল। শিডিউল পরিবর্তন এবং আকাশ নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস।
এই মনীষা ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্তেকাল ১৯৯৯। বাংলাদেশে এসেছেন দুবার। ১৯৮৪, ১৯৯৪

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...