বৃহস্পতিবার, ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ৭:৩০
Home / অর্থনীতি / বর্তমান অর্থব্যবস্থার সুন্দর সমাধান ইসলামে রয়েছে : মুফতি ইউসুফ সুলতান

বর্তমান অর্থব্যবস্থার সুন্দর সমাধান ইসলামে রয়েছে : মুফতি ইউসুফ সুলতান

yousuf-01মুফতি ইউসুফ সুলতান- বাংলাদেশের তরুণ আলেমদের মধ্যে বেশ অগ্রগণ্য একটি নাম। জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা থেকে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন তিনি। ২০০৮ সনে তাকমিল পরীক্ষায় বাংলাদেশ কওমি শিক্ষা বোর্ডে প্রথমস্থান অধিকার করেন ইউসুফ সুলতান। ২০০৯ সালে জামিয়াতুল আসাদ আল ইসলামিয়া মাদরাসায় সহকারি মুফতি হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার কর্ম জীবন শুরু হয়। একই সময় তিনি শাবাকা সফট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ২০১১ সালে দেশের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল আরটিভির ইসলামিক প্রশ্নোত্তরমূলক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে ইসলামি অঙ্গনে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১২ সালে দেশের অন্যতম ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মালিবাগ জামিয়া শারিইয়্যার ইফতা বিভাগে সহকারী মুফতি হিসেবে নিয়োগ প্রপ্ত হন তিনি। তথ্য-প্রযুক্তির ময়দানেও মুফতি ইউসুফ সুলতানের বেশ দখল রয়েছে। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক ফাইন্যান্সে (INCEIF) ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়নরত আছেন। একই সঙ্গে পারফেক্ট গ্রুপের শরীয়া এক্সিকিউটিভ কমিটিতে মেম্বার সেক্রেটারি এবং মালয়েশিয়ার ইসরা কনসালটেন্সিতে গবেষণা সহকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। সুদুর মালয়েশিয়াতে অবস্থান করে প্রিয়.কমকে এই ইন্টারভিউ প্রদান করেছেন তিনি। সারা বিশ্বের ইসলামি অর্থনীতি, ব্যাংকিং এবং ইসলামিক ইনভেস্টমেন্টবিষয়ে বিভিন্ন কথা হয় তার সাথে, পাশাপাশি আরো জানা হয় মালয়েশিয়ার ইসলাম ও মুসলিমদের নানাবিদ অবস্থা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রিয়.কমের প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান

প্রিয়.কম :  প্রথমেই জানতে চাই, আপনাকে বাংলাদেশ ছেড়ে মালয়েশিয়া যেতে হলো কেনো এবং সেখানে এখন কী কাজে জড়িত আছেন?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : আসলে ইসলামি অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পদ্ধতির আধুনিক বাস্তবায়ন নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে অনেক দিনের। যদিও ফিকহুল মুয়ামালাত বা লেনদেনসংক্রান্ত ইসলামি আইন নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু গত প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে যে আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে, সেগুলো কর্মপদ্ধতি, শরীয়াহর নীতিমালার আধুনিক প্রয়োগ ইত্যাদি জানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম অনেকদিন যাবত। এ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য মালয়েশিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক বেশি এবং আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সাপোর্টের দিক থেকেও তারা এগিয়ে। তাছাড়া আমাদের দেশ থেকে তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় মালয়েশিয়াকেই পছন্দ করেছি। বর্তমানে আমি এখানে দ্য গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অফ ইসলামিক ফাইন্যান্স (INCEIF)-এ ইসলামিক ফাইন্যান্সে এমএসসি করছি, যা শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি এখানে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করছি।

প্রিয়.কম :  আপনার লেখাপড়ার জীবন সম্পর্কে জানতে চাই ।

মুফতি ইউসুফ সুলতান : আমার শৈশব কেটেছে আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে। সেখানে প্রাইমারি ক্লাসগুলো ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ হয়েছে। এরপর দেশে এসে প্রথমে আম্বর শাহ হাফিজিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা এবং পরে জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা থেকে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছি। ২০০৮ সনে তাকমীলে বেফাক বোর্ডের অধীনে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছি। আলহামদুলিল্লাহ। এরপর ২০০৯-এ একই মাদরাসায় ইফতা বিভাগে পড়াশোনা করেছি। তারপরই কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম।

প্রিয়.কম :  মালয়েশিয়াতে এখন কী পরিমাণ বাংলাদেশি বসবাস করছে এবং তাদের ধর্মীয় পরিস্থিতি কেমন?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ২০০৯ এর একটি তথ্যমতে মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশি কর্মজীবীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ (বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে)। আামার তো কুয়ালালামপুরের বাইরে কোথাও যাওয়ার তেমন সুযোগ হয় নি। তবে যতটুকু জেনেছি, অনেকে এখানে এসে ধর্মীয় শৃঙ্খলমুক্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। নামাজ-রোজা বাদ দিয়ে দেন, মাদক ও নারীতে বুঁদ হয়ে থাকেন। আবার অনেকে শত ঝামেলার মধ্যেও দীন-ধর্ম ঠিক রাখার চেষ্টা করেন।

প্রিয়.কম : মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বাংলাদেশিদের বসবাসের সুযোগ আছে কি না ? একই সঙ্গে বলুন সেখানকার যে পরিস্থিতি তাতে বাংলাদেশিরা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে চায় কি না ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ নামে একটি ব্যবস্থা আছে এখানে। যার আওতায় বড় অংকের বিনিয়োগের শর্তে স্থায়ীভাবে থাকার আবেদন করা যায়। এর আওতায় প্রতি দশ বছর পর পর নবায়নযোগ্য ভিসা প্রদান করা হয়। তবে স্বাভাবিকভাবেই এটা সবার জন্য সম্ভব নয়। এর বাইরে এখানে ব্যবসা করলে তার অধীনে ভিসা পাওয়া যায়। এখানে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আছেন, তারা নিশ্চয় স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ দিন থাকার জন্যই এসেছেন। অনেকে এখানে বিয়ে করেছেন, সন্তান আছে।

প্রিয়.কম :  সেখানকার ইসলামি শিক্ষা-ব্যবস্থা কেমন? বাংলাদেশ থেকে আজকাল অনেকেই সেখানে পড়তে যেতে চায়, তাদের সম্ভাবনা কতুটুকু এবং সমস্যাগুলো কী। মাদ্রাসা শিক্ষিতরা সেখানে কতটুকু ওয়েলকাম হবেন?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা এখানে প্রায় সকল বিষয়েরই অন্তর্ভুক্ত। ফলে দেখা যায় একজন সায়েন্সে পড়া ছাত্রও বেসিক দীনি বিষয়াদিতে ভালো জ্ঞান রাখেন, এমনকি অনেকে হাফেজও। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামি বিষয়াদির বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি বিষয়েই কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের সাথে আধুনিক প্রচলনের সমন্বয় রয়েছে। যেমন ইসলামি আইন– এতে যেমন ফিকহ থাকবে, তেমনি থাকবে আধুনিক আইন, কমন ল, সিভিল ল ইত্যাদি। ফলে এসব জায়গা থেকে যারা গ্রাজুয়েট হচ্ছেন, তারা একই সাথে শরীয়ার মৌলিক নীতিমালা জানেন, আবার আধুনিক বাস্তবায়ন সম্পর্কেও বিস্তর ধারণা থাকছে। এই প্রজন্ম বর্তমান বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়া উপযুক্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে।

প্রিয়.কম :  সেখানকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবনধারা, তাদের ইসলাম পালন সম্পর্কে আপনি যতটুকু দেখেছেন, সে সম্পর্কে বলুন ।

মুফতি ইউসুফ সুলতান : বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকাংশেরই জীবনধারা ভালো মনে হয় নি। অনেকেই জমি-জমা বিক্রয় করে এসে প্রতারিত হন। অনেকে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে এসে দেখেন তাকে নামসর্বস্ব কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। টাকা-পয়সা খুইয়ে দিশেহারা হন অনেকে। আবার বিশাল ঋণের বোঝা থাকায় দেশেও ফিরে যেতে পারেন না। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করেন। এমন অনেকের সাথেই বিভিন্ন জায়গায় কথা হয়েছে। ইসলাম পালন সম্পর্কে যেমনটা বলেছি, ব্যাপারটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। যে ভালো থাকতে চায়, সে বেশ ভালো দীনদারির সাথে চলছে। আবার যে নষ্ট হতে চায়, তার জন্যও বিস্তর সুযোগ আছে।

প্রিয়.কম :  আপনারা যারা সেখানে থাকেন তাদের প্রতি মালয়েশিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : এখানে অধিকাংশ বাংলাদেশিই শ্রমিক; নির্মাণকাজ-রেস্তোরা বা অন্য জায়গায় কাজ করে তারা। তাই স্বাভাবিকভাবে এমন একটা চিন্তা কাজ করে যে, বাংলাদেশি মানে কেবল সাধারণ শ্রমিক। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। তবে এমনিতে মালয়েশিয়রা অন্যের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল।

প্রিয়.কম :  এবার আপনার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করি, ইসালামি অর্থনীতিকে কেনো আপনি আপনার আগ্রহ বিষয় হিসেবে পছন্দ করেছেন ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : রাসূল স. বলেছেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট, আর এতদুভয়ের মাঝে যা, তা অস্পষ্ট-সন্দেহজনক।’ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি আমরা মুখোমুখি হই বিভিন্ন রকম লেনদেনের। কাজেই তা হালাল হচ্ছে না হারাম– তা নির্ণয় করা জরুরি, মানুষকে জানানো জরুরি। তাছাড়া বর্তমান অর্থব্যবস্থায় যে সব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সুন্দর বিকল্প ইসলাম দিয়েছে। আমাদের দায়িত্ব সেগুলো পড়া, গবেষণা করা এবং মানুষের সামনে তুলে ধরা। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আমাদের উলামায়ে কিরামের বিচরণ খুব বেশি নয়। গত কয়েক বছর আগে আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রাণপুরুষ মুফতি তাকী উসমানি হাফিজাহুল্লাহ বাংলাদেশে এসেছিলেন। আলিমদের সেমিনারে তিনি অত্যন্ত দরদি ভাষায় আহ্বান জানান, ‘ভাইয়েরা, তোমরা এখানে আসো, তোমাদের এখানে অনেক প্রয়োজন।’ মূলত তাঁর কথাটা প্রচণ্ড দাগ কাটে হৃদয়ে। এরপর থেকে ইসলামি অর্থনীতি, ব্যাংকিং, ইনভেস্টমেন্ট ও ফাইন্যান্স নিয়ে অধ্যয়ন করছি…

প্রিয়.কম :  বর্তমান বিশ্বে ইসলামি অর্থনৈতিক কাজকর্মের চাহিদা কতটুকু এবং বাংলাদেশে সেক্ষেত্রে কোন অবস্থানে আছে?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ইসলামি বিনিয়োগের চাহিদা ক্রমশই বাড়ছে। বর্তমানে পুরো বিশ্বের ইসলামি বিনিয়োগ পদ্ধতির আওতাভুক্ত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার। অনেক অমুসলিম দেশও তাদের আইন সংশোধন করে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের অবস্থান আশানুরূপ নয়। আমাদের দেশে ইসলামি ব্যাংকিং শুরু হয় ১৯৮৩ তে, যে বছর মালয়েশিয়াও শুরু করে। কিন্তু মালয়েশিয়া ইসলামি ব্যাংকিং আইন, কেন্দ্রীয় শরীয়া বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবল গঠনে যতদূর এগিয়েছে, আমরা তার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের এখনো কোনো ইসলামি ব্যাংকিং আইন নেই, সে অর্থে কেন্দ্রীয় শরীয়া বোর্ড নেই, ইসলামি অর্থনীতি ও বিনিয়োগ নীতিমালা শেখানোর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই ইত্যাদি। এক কথায় বাংলাদেশের শুরু অনেক আগে হলেও অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।

প্রিয়.কম :  ইসলামি অর্থনীতির একজন গবেষক হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক-বীমা-ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিকে আজকাল দেখা যাচ্ছে, একটি বা দুটি ইসলামি শাখা খুলে রেখেছে, আমাদের প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য সব হিশেব-নিকেশ অনৈসলামিক পদ্ধতিতে চলছে, তার একটিমাত্র শাখা খুলে কি ইসলামি পদ্ধতিতে চালানো সম্ভব ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : দ্বৈত ব্যাংকিং সিস্টেম– যেখানে একই সাথে ইসলামি ও সুদী ব্যাংকিং চলে–তা এমনিতেই শরীয়া পরিপূর্ণভাবে পরিপালনের অন্তরায়। আর কেবল এক-দুইটি শাখা ইসলামি রাখা আরো ভয়াবহ। অনেকেই ইসলামি ও সুদী– উভয়টির আলাদা হিসাব মেইনটেইন করেন না। দেখা যায়, সেখানে একই সাথে বিনিয়োগ হয়, এমনকি একই জনবল উভয়টিতে পর্যায়ক্রমে কাজ করেন। ফলে শরীয়ার ব্যাপারটা শিথিল হয়ে যায়। তাছাড়া যে মালিকপক্ষ একই সাথে সুদী ব্যবস্থা চালু রাখা সমর্থন করেন, বোঝা যায় যে, তারা শরীয়া ব্যাংকিংয়ের ব্যাপারে সিরিয়াস নন। একই সাথে এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে গত কয়েক বছর যাবত নতুন ইসলামি উইন্ডো, এমনকি কিছু ইসলামি উইন্ডোর ব্যাংক পরিপূর্ণ ইসলামি হতে চাচ্ছে–তাদের অনুমতি দেয়া হচ্ছেনা। থমসন রয়টার্সের একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কাজেই আমাদের দুটো দিকই বিবেচনায় রেখে লেনদেন করতে হবে।

প্রিয়.কম :  অনেকেই বলেন, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে ইসলামি শতভাগ ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব না, এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ইসলামি অর্থনীতি একটি পরিপূর্ণ প্যাকেজ। এখানে সরকারের আয়ের উৎস, ব্যয়ের খাত, বাজেট, বাজার, অবকাঠামো, শেয়ার বাজার, মুদ্রা ব্যবস্থা, সাধারণ ব্যবসা, ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স, জাকাত-ওয়াকফ ইত্যাদি সবই আসবে। তবে শুধু ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে শরীয়া পরিপালনের ব্যাপারে বলতে গেলে তা পরিপূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়াও সম্ভব।

প্রিয়.কম :  মালয়েশিয়াতে ইসলামি অর্থনীতি কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশ কোনো অংশে পিছিয়ে আছে কি না ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : মালয়েশিয়াতে ইসলামি ব্যাংকিং, তাকাফুল (ইসলামি ইনস্যুরেন্স), শেয়ার বাজারে শরীয়া কমপ্লায়েন্ট স্টক ছাড়াও রয়েছে জাকাত ও ওয়াকফের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। কর্মজীবীদের বেতন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাকাত কেটে নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ওয়াকফের ক্ষেত্রে নানা ব্যবস্থা রয়েছে, বিশেষ করে ক্যাশ ওয়াকফ, যার ফলে ক্ষুদ্র আকারেও ওয়াকফ করা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অবস্থা পূর্বেই বলেছি। যাকাত-ওয়াকফের ক্ষেত্রেও আমরা বেশ পিছিয়ে। ইসলামের স্বর্ণযুগে শিক্ষা-চিকিৎসা, অবকাঠামো, পানি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো ওয়াকফের মাধ্যমে।

প্রিয়.কম :  যে কোনো দেশের মানুষ বর্তমান প্রচলিত অর্থনীতি বাদ দিয়ে ইসলামি অর্থনীতি কেনো গ্রহণ করবে, বলুন ? এবং বর্তমান বিশ্বে একটি দেশে ইসলামি অর্থনীতি চালু করতে সবচে’ বড় বাধা কোনটি?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : ইসলামি অর্থনীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি। এখানে যেমন ধনীর অবস্থান আছে, গরীবেরও তেমন হক আছে। মুদারাবা-মুশারাকার মতো লাভ ও ঝুঁকির অংশীদারিত্বের চুক্তিগুলোতে সবার অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা থাকে। ব্যবসায় লাভ হলে মূলধন বিনিয়োগকারী যেমন লাভবান হবে, শ্রমিকও তেমনি লাভবান হবে। ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবমুখী। এখানে প্রতিটি চুক্তি প্রকৃত সম্পদভিত্তিক; ঋণের লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই এখানে। বর্তমানে অধিকাংশ উন্নত দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ ঋণগ্রস্ত; ঋণদাতারা তাদের প্রাপ্য চাইলে বা প্রাপ্য আদায়ে বাধ্য করলে দেশগুলোর অর্থনীতিতে ধ্বস নামতে বাধ্য। ঋণের মাধ্যমে ফুলে ফেঁপে ওঠা অর্থনীতি না হওয়ায় এবং বাস্তব বাজারমুখী অর্থনীতি হওয়ায় যে কোনো অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে ইসলামি অর্থনীতি বেশি টেকসই। গত ২০০৮ এর বিশ্বমন্দায় ইসলামি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিলো, বিভিন্ন গবেষণায় তা উঠে এসেছে। তাছাড়া ইসলামি অর্থনীতি ইথিকাল বা নৈতিক। এখানে পরিবেশ ও সমাজের জন্য বিপজ্জনক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নেই। অনেক দেশেই এখন ইথিকাল ব্যাংকিং শুরু হয়েছে, যার বিনিয়োগের খাতসমূহের সাথে ইসলামি বিনিয়োগের খাতসমূহের যথেষ্ট মিল রয়েছে। এক কথায়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও টেকসই ও নৈতিক অর্থব্যবস্থার জন্যও ক্রমান্বয়ে মানুষকে ইসলামি অর্থব্যবস্থার দিকে আসতে হবে, তা যে নামেই হোক না কেন।

বর্তমান বিশ্বে একটি দেশে ইসলামি অর্থনীতি চালু করা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো আইনি জটিলতা বা আইনি সমর্থন না থাকা। সম্প্রতি মদিনায় ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের হিসাব ও নিরীক্ষার স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নকারী বাহরাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এওফি (AAOIFI) কর্তৃক গত চল্লিশ বছরের ইসলামি ব্যাংকিং অবস্থা মূল্যায়নের জন্য সেমিনার আয়োজিত হয়। সেখানে এওফির শরীয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান মুফতি তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ এ কারণটিকেই গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন।

প্রিয়.কম :  বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে আপনি যেই প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, সেই কওমি মাদ্রাসা এবং সমস্যা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাচ্ছি… ।

মুফতি ইউসুফ সুলতান : কওমি মাদ্রাসা আদর্শ মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান। ইসলামি শরীয়ার যাবতীয় বিষয়াদিতে বিশদ শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান কওমি মাদ্রাসা। এখানে যে অধ্যবসায় ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া হয়, তা অতুলনীয়। কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে আমার মনে হয়, খুব একটা সংস্কারের প্রয়োজন নেই। কেবল বর্তমান কারিকুলামে ইংরেজি ও বেসিক অংক ঢোকানো সময়ের প্রয়োজন। এগুলো পরবর্তীতে বেশ কাজে লাগে, বিশেষ করে দীন প্রচারের জন্য। তাছাড়া আমাদের কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামের ন্যায় প্রায় একই কারিকুলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে। এবং এর অনেকগুলোই সরকার কর্তৃকও স্বীকৃত। আমাদের দেশে নানা সমস্যার কারণে সরকারি স্বীকৃতি সম্ভব না হলেও বেসরকারিভাবে আমাদের বোর্ড ও বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। যার ফলে আমাদের গ্রাজুয়েটরা চাইলে সেসব প্রতিষ্ঠানে ভিন্নমুখী শিক্ষা অর্জন করতে পারবেন।

প্রিয়.কম :  মালয়েশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেনো ব্যতিক্রম এবং এ ক্ষেত্রে তাদের থেকে আমাদের কিছু গ্রহণীয় আছে কি না ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : এখানে শিক্ষা ব্যবস্থাটা অনেক বাস্তবমুখী ও গবেষণামূলক। এখানকার গ্রাজুয়েটরা বইয়ের পাতার জ্ঞানের প্রায়োগিক দীক্ষা অর্জন করেন; দেশ-বিদেশে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাছাড়া নীতি-নৈতিকতা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালবাসা এ শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক বেশি, যা আমাদের দেশে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাসে বা ট্রেনে কোনো বৃদ্ধ, অন্ত:সত্তা নারী বা শিশু উঠলে সিট ছেড়ে দেয়া, রাস্তায় অন্ধ ও বৃদ্ধকে ধরে পার করে দেয়া–এসব এখানে সাধারণ চিত্র। মারামারি, অস্ত্র ইত্যাদি নেই বললেই চলে। তাছাড়া ধর্মীয় শিক্ষার কথা আগে বলেছি।

প্রিয়.কম :  আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি, সেখানেই থেকে যাবেন ? দেশের জন্যে কিংবা বিশ্বের জন্যে কী করার পরিকল্পনা রয়েছে আপনার ?

মুফতি ইউসুফ সুলতান : এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে ভাবি নি এখনো। আপাতত লক্ষ হচ্ছে বাকি শিক্ষাটা শেষ করা। এরপর আল্লাহ যেখানে থেকে বেশি খেদমত করার সুযোগ দেবেন, সেখানেই থাকার চেষ্টা করবো, ইনশা’আল্লাহ।

প্রিয়.কম :  প্রিয় ইসলামকে এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মুফতি ইউসুফ সুলতান : সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য আপনাকে এবং প্রিয় পরিবারকে ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।

সৌজন্যে : প্রিয়.কম

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমীর নিউ ভার্সন এবং রাষ্ট্র থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন!

সৈয়দ শামছুল হুদা: বাংলাদেশের একটি আলোচিত অন্যতম রাজনৈতিক দলের নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সরকারে থাকা ...