বৃহস্পতিবার, ১৩ই জুন, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৫:০৮
Home / অনুসন্ধান / মারওয়ান ইবনুল হাকাম রা. : জানা-অজানা

মারওয়ান ইবনুল হাকাম রা. : জানা-অজানা

imagesমাও. আতীক উল্লাহ আতীক

-আচ্ছা, উমার ইবনে আবদুল আযীয রহ. সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
-সর্বকালের সেরা ন্যায়পরায়ন শাসকদের অন্যতম!
-তাহলে তিনি যদি এমন ন্যায়পরায়ন হয়ে থাকেন, তার বাবা কেমন হবেন?
-বাবা ভাল না হলে কি ছেলে এমন হতে পারেন?
-তার দাদা?
-তার দাদাও অবশ্যই ভাল হবেন! তিনি কে?
-মারওয়ান ইবনুল হাকাম রা.।
-কিন্তু তার সম্পর্কে যে আমরা নানামুখী কথা পড়েছি?
-আপনি কী পড়েছেন না পড়েছেন তার দায় একজন সাহাবীর কাঁধে ফেলবেন কেন? দুষ্ট-ভ্রষ্ট লেখকের ঘাড়ে ফেলুন!

মারওয়ান ইবনুল হাকাম। একজন সাহাবী রা.। যদি বলি তিনি হলেন ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তি, খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে বলে মনে হয় না। উসমান রা., মুয়াবিয়া রা ও মারওয়ান রা: এই তিনজনের আলোচনা ছাড়া ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ অসম্পূর্ণই থেকে যায় বলা যায়।

অনেকদিন ধরেই হযরত মারওয়ান রা.-এর সাথে লেগে আছি। উসমান রা.-এর মতো মানুষ কি যাকে তাকে কলমচি নিয়োগ দিতে পারেন? মুয়াবিয়া রা.-এর মতো ন্যায়পরায়ন মানুষ যাকে একাধিক বার মদীনার গভর্নর নিয়োগ দেন, তিনি কি হেলাফেলার লোক হতে পারেন? এই প্রশ্নগুলোই কুরে কুরে খাচ্ছিল বিবেকটাতে! প্রশ্নগুলো ছিলো আবেগপ্রসূত! সাহাবীদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে উৎসারিত! কিন্তু আবেগ-শ্রদ্ধা তো নিজের কাছে, অন্যরা সেটা মানবে কেন? তারা তো ছুতানাতা পেলেই সমালোচনা করতে লেগে পড়ে!

প্রথমেই তার কিছু বৈশিষ্ট্য ক্রমিকাকারে তুলে ধরা যাক:
(এক) আবদে মানাফে গিয়ে নবীজি সা. ও মারওয়ানের বংশধারা মিলিত হয়েছে। তিনি কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত শাখা ‘উমাইয়া’-এর সন্তান। উসমান এবং মুয়াবিয়া রা.ও এই শাখার মানুষ।

(দুই) জন্ম-মৃত্যু ২-৬৫ হিজরী। ৬২৩-৬৮৫ ঈসায়ী। অর্থাৎ নবীজি মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করার দুই বছর পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার মানে দাঁড়াল, নবীজির ওফাতের সময় তার বয়েস ছিল আট। জন্ম হয়েছে মক্কায়। মৃত্যু দিমাশকে। মক্কা বিজয় হয়েছে অষ্টম হিজরীতে। এর প্রেক্ষিতে বলা যায়, ছয় বছর বয়েসে নবীজিকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। মদীনায় এসেছিলেন নবীজির ওফাতের পর। এমনিতে বাবার সাথে তায়েফে থাকতেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় মদীনায় কেটেছে। এযীদের শাসনকালে তাকে মদীনা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। কারন মদীনা তখন আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের রা.-এর খিলাফতের অধীন হয়ে পড়েছিল।

(তিন) তিনি নবীজি সা. থেকে একটা হাদীস বর্ণনা করেছেন। হোদায়বিয়ার সন্ধি সম্পর্কিত। ইমাম বুখারী রহ. তার সহীহে হাদীসটা এনেছেন। চার বিখ্যাত সুনানের কিতাবেও তার হাদীস আনা হয়েছে। ইমাম বুখারী রহ. যার হাদীস তার গ্রন্থে এনেছেন, তার সম্পর্কে আর কোনও সনদ লাগে? যারা তার সম্পর্কে এটাসেটা বলে-লিখে বেড়ায় তাদের নিজেদের গায়েই কি থুতু গিয়ে পড়ে না!

(চার) তিনি বড় বড় সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। উমার, উসমান, আলি, যায়েদ বিন সাবিত বুসরাহ বিনতে সাফওয়ান রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। শেষোক্ত মহিলা সাহাবীটি ছিলেন তার আদরের খালা।
মারওয়ানের কাছ থেকে বড় বড় তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন। এমনকি শী‘আরা যাকে তাদের ইমাম মানে, আলি বিন হুসাইন (যায়নুল আবেদীন) রহ.-ও তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। শী‘আদের কথা মতো মারওয়ান যদি এতই খারাপ হতেন, তাদের একজন প্রধান ইমাম কিভাবে হাদীস বর্ণনা করলেন?
সাহল বিন সা‘দ রা.একজন বিশিষ্ট সাহাবী। তিনিও মারওয়ান থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

(পাঁচ) কুরআন কারীম বিষয়ে মারওয়ান রা.-এর ভিন্নমাত্রার পান্ডিত্য ছিল। মদীনার থাকার দরুন ইলমুল ফিকহ ও ইলমুল হাদীসেও অগাধ দখল এসে গিয়েছিল। হালাল-হারাম বাছবিছার করে চলতেন। ফিকহের ক্ষেত্রে বড় বড় সাহাবী তার মতামতের মূল্য দিতেন। ইমাম মালেক

(ছয়) মুয়াবিয়া রা.তাকে একাধিকবার মদীনার গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন। সে সুবাদে মারওয়ান দীর্ঘদিন হজের সময় আমীরুল হজ হিশেবে নিয়োজিত ছিলেন। যে কেউ এই পদে বসতে পারে না। নবীজি সা. থেকে শুরু করে চার খলীফা এই পদ অলংকৃত করে গিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে বড় বড় সাহাবী হজ করেছেন। কেউ কোনও আপত্তি তোলেন নি।

(সাত) বড় দানশীল মানুষ ছিলেন। গভর্নর হয়েও সাধারন মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন। বায়তুল মাল থেকে যথাসাধ্য দেয়ার চেষ্টা করতেন। ব্যক্তিগত ভান্ডার থেকেও মানুষকে সাহায্য করতে পিছপা হতেন না। কারবালার ঘটনার পর, আলি বিন হুসাইন (যায়নুল আবেদীন) রহ. মদীনায় ফিরে এলেন। নিঃস্ব অবস্থায়। অসহায় হয়ে। মারওয়ান তখন আলি বিন হুসাইনকে ৬ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) করয দিয়েছেন। মৃত্যুর সময় বড় ছেলে আবদুল মালিক বিন মারওয়ানকে ওসীয়ত করে গেছেন:
-তুমি আলি বিন হুসাইনের কাছে ছয় হাজার দীনার করয কখনোই ফেরত চাইবে না!

(আট) হাসান ও হুসাইন রা. মদীনায় দীর্ঘদিন মাওয়ানের ইমামতীতে নামায পড়েছেন। কখনো আপত্তি তোলেন নি। বড় বড় সাহাবীও তাকে ইমাম হিশেবে মেনে নিতে কোনও প্রকারের আপত্তি তোলেন নি।

(নয়)  মারওয়ানের প্রতি আলি রা.-এরও বিশেষ নযর ছিল। জঙ্গেজামাল বা উষ্ট্রীযুদ্ধের দিন, আলি রা. বারবার মারওয়ান সম্পর্কে খোঁজ করছিলেন। কাছের লোকেরা অবাক হয়ে জানতে চাইলো:
-আপনি তার জন্যে এমন উতলা হলেন কেন? সে তো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে?
-তা নিক! তার প্রতি আমার এক ধরনের স্নেহ আছে। সে কুরাইশ যুবকদের অন্যতম সর্দার!

(দশ)  প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মারওয়ানের আদর্শ ছিলেন উমার রা.। তিনি পদে পদে উমার রা.-এর গৃহীত পদক্ষেপ অনুসরনের চেষ্টা করতেন। গভীর বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। গায়ের জোরে কিছু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন না। তার অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য ছিল মুশাওয়ারা। কোনও বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হয়ে পড়লে, মদীনায় বাস করা সাহাবীদের ও মুরুব্বীস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে জমায়েত করে, তাদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতেন।
মদীনায় তখন মাপ-পরিমাপের জন্যে বিভিন্ন রকের বাটখারার প্রচলন ছিল। তিনি সবার সম্মতিক্রমে একটা সুনির্দিষ্ট বাটখারা ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তুলেছিলেন। সেটার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘মারওয়ানী বাটখারা’।

(এগার) তিনি মদীনায় থাকায় বড় একটা সুবিধা এই হয়েছিল: তার দুই ছেলে আবদুল মালিক বিন মারওয়ান ও আবদুল আযীয বিন মারওয়ান এখানকার ইলমী ও আমলী পরিবেশে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন। আরও সুখের কথা হলো: নাতি উমার বিন আবদুল আযীযও এমন বিরল সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন জন্মসূত্রেই। ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম! উমার বিন আবদুল আযীয মদীনায় শৈশব কাটানো, আল্লাহরই গায়েবী বন্দোবস্ত!

(বারো) খেলাফতে বনি উমাইয়ার মেয়াদকাল ছিল ৪১-১৩২ হিজরী। ৬৬২-৭৫০ ঈসায়ী। মুয়াবিয়ার রা.-এর নাতি দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর, তার উপযুক্ত কোনও সন্তান ছিল না খলীফা হওয়ার মতো। বংশের মধ্যে একমাত্র উপযুক্ত ছিলেন মারওয়ান বিন হাকাম। তাকে খলীফা নির্বাচিত করা হলো। তার শাসনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। এক বছরেরও কম ,মাত্র নয়মাসের। সংক্ষিপ্ত হলে কী হবে, তিনি এর মধ্যেই উমাইয়া খিলাফাহকে শক্ত একটা ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। খেলাফতে রাশেদার সাথে থাকার বরকত, মুয়বিয়া রা.-এর সঙ্গ তাকে মেধা-তাকওয়াকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

(তেরো) মারওয়ান যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহন করেন, তখন অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের রা.-এর খিলাফত দোর্দন্ড প্রতাপে চলছে। মুসলিম জাহানের বেশির ভাগ অঞ্চল তার হাতে বায়আত নিয়েছে। দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর উমাইয়াদের প্রধান দুর্গ দিমাশকের বিরাট একটা অংশও ইবনে যোবায়ের রা.-এর অধীনে চলে গিয়েছিল। খোদ দিমাশকের গভর্নরও বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন। এহেন নড়বড়ে অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানো সাধারন ব্যাপার নয়। হয়তো পারতেনও না, কিন্তু মদীনার কিছু অভিজ্ঞ যোদ্ধা ইবনে যোবায়েরের হাতে দৌড়ানি খেয়ে দিমাশকে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। তারাই বুদ্ধি-পরামর্শ-সাহস যুগিয়ে মারওয়ানকে আগে বাড়তে সাহায্য করেছে!

(চৌদ্দ) মারওয়ান ইবনুল হাকাম ছিলেন সাহসী যোদ্ধা। শত বিপদেও ধৈর্য ও সাহস কোনওটাই হারাতেন না। উসমান রা.-এর ওপর যখন কুচক্রীরা হামলা করলো, মারওয়ান অসম সাহসিকতার সাথে তাদের মোকাবেলা করেছিলেন। পিছপা না হলে, খলীফাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে তরবারি পরিচালনা করেছিলেন।

(পনের) মারওয়ান ইবনুল হাকামকে বলা হয় উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা। তৃতীয় খলীফা মুয়াবিয়ার পর কার্যত সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। মারওয়ান শুরুতেই কঠোরহস্তে দিমাশককে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তারপর নযর দিলেন মিসরের দিকে। গুরুত্বপূর্ণ এই শহরকে করায়ত্ত করে, সেখানে ছোট ছেলে আবদুল আযীযকে বসিয়ে এলেন। এবার মনোযোগ দিলেন ইরাকের দিকে। আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের রা.-এর শক্ত ঘাঁটি! বিশ্বস্ত সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে প্রধান করে একটা বাহিনী পাঠালেন। বাহিনী ইরাকে পৌঁছার আগেই খবর পেলো: মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইন্তেকাল করেছেন। বড় ছেলে আবদুল মালিক বিন মারওয়ান পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়েস ছিল ৬৩ বছর।

ইবনে খালদুনের মতে: মারওয়ান সব সময় সত্যন্ধানী ছিলেন।
আবু বকর ইবনুল আরবীর মতে: মারওয়ান ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। উম্মাহর সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্যতম।

এতক্ষণ তো তার সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারনা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এবার মূল আলোচনায় আসা যাক:

প্রথম অভিযোগ:
নবীজি সা. হাকাম অর্থাৎ মারওয়ানের পিতাকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে তায়েফে নির্বাসিত করেছিলেন।

উত্তর:
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এ-অভিযোগকে বানোয়াাট গল্প বলে আখ্যায়িত করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর হাকাম ইসলাম গ্রহণ করার পর, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই তায়েফে বসবাস করতে গিয়েছিলেন। থাকার জন্যে তায়েফ খুবই মনোরম স্থান!
ইবনে তাইমিয়া ছাড়া আরও অনেকেও বলেছেন, নির্বাসনের ঘটনা পুরোটাই বানোয়াট! এই অপবাদপূর্ণ ‘বর্ণনাগুলোর’ একটাও সহীহ নয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ:
আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা!
উত্তর: এটা শী‘আদের চরম মিথ্যাচার। আগেই বলা হয়েছে, হযরত আলি রা. ও অলি বিন হুসাইনের সাথে মারওয়ানের সম্পর্ক কেমন ছিল!
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর মতে, মারওয়ান আলি বিন হুসাইনের শিক্ষকও ছিলেন।
সুতরাং এখানে শত্রুতার প্রশ্ন কোত্থেকে আসে?

তৃতীয় অভিযোগ:
খলীফার সীলমোহর ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার!

উত্তর: আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা একটা কথা বেশ ফলাও করে প্রচার করেছিল: মারওয়ান খলীফার সীল চুরি করে, মিসরের গভর্ননের কাছে চিঠি লিখেছিল। চিঠিতে বলা হয়েছিল: মুহাম্মাদ বিন আবু বাকর ও তার সাথীদেরকে যেন হত্যা করা হয়!
এটাও ইহুদির বাচ্চার উর্বর মস্তিস্কের আবিষ্কার। না হলে ইরাকে যে প্রতিনিধি দল চিঠি গিয়ে গিয়েছিল, তাদের গন্তব্য ছিল পূর্ব দিকে। আরেক দলের গন্তব্য ছিল পশ্চিম দিকে! ঠিক তিনদিন পর উভয় দল কিভাবে একসাথে মদীনায় জমা হতে পারলেঅ! মিসরের চিঠিতে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা ইরাকীরা কিভাবে জানতে পারলো? তাদের তো ইরাক পৌঁছে যাবার কথা?
ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু উসমান রা.-এর নামেই চিঠি লিখে নি, আলি, আয়েশা ও বড় বড় সাহাবীদের নাম ভাঙিয়েও ভূয়া চিঠি লিখে বিভিন্ন শহরে পাঠিয়েছিল। যারা এমন জালিয়াতি করতে পারে, তাদের পক্ষে কি মারওয়ানকে বিপদে ফেলার জন্যে আর দুটা ভূয়া চিঠি লেখা কি অসম্ভব?
আর মারওয়ানের ওপর তাদের আক্রোশ থাকার কারণ হলো, তিনি খলীফাকে আগলে রাখতেন। যোগ্য কলমচির মতোই আমানতদারিতার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন। এটাই ইহুদির দোসরদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল।

চতুর্থ অভিযোগ:
তালহা রা.কে হত্যা

উত্তর: এই মিথ্যা অভিযোগটা ছড়িয়েছে ওয়াকেদীর বর্ণনা থেকে। জঙ্গে জামালের দিন যুদ্ধশেষে মারওয়ান দেখলো তালহা রা.একদল লোকের মাঝে আছে। তখন মারওয়ান চিৎকার করে বলে উঠলো:
-আল্লাহর কসম! উসমানের রক্তের জন্যে এই লোক দায়ী!
এরপর তীর ছুঁড়ে তালহাকে হত্যা করেছে।
কতো বড় মিথ্যাচার! কয়েকটা বিষয় তুলে ধরলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে:
(ক): জঙ্গে জামালের দিন তালহা কার পক্ষে ছিল?
-আশেয়া রা.-এর পক্ষে।
মারওয়ান কার পক্ষে ছিল?
-আয়েশা রা.-এর পক্ষে!
তাহলে দু’জনেই একপক্ষে থেকে এতক্ষণ আলির বিরুদ্ধে লড়াই করলো, পরাজিত হয়ে যে যার জান বাঁচাতে ব্যস্ত, এহেন পরিস্থিতিতে মারওয়ান কোন বুদ্ধিতে হত্যা করতে যাবে তালহাকে?

(খ): ওয়াকেদীর বর্ণনা মতে, তালহাকে দেখেই মারওয়ান চিৎকার করে উঠেছিল! বলেছিল: উসমান হত্যার দোসর! কেন এর আগে দেখেনি? একদলে যুদ্ধ করলো, শলা-পরামর্শ করলো, তবুও দেখা হয়নি?

(গ): আর তালহা রা. যে উসমান হত্যার তীব্র বিরোধী ছিলেন সেটা কি মারওয়ানের জানা ছিল না? মারওয়ান তো সব সময় উসমানের কাছেই ছিলেন। তালহা রা. নিজের ছেলে মুহাম্মাদকে উসমান রা.-এর নিরাপত্তাবিধান করার জন্যে পাঠিয়েছেন, এটা বুঝি মারওয়ানের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে? উসমান রা. শহীদ হওয়ার পর, এই অন্যায় হত্যার বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে তালহা রা.-ই তো অগ্রণীদের মধ্যে ছিলেন!

আসলে মারওয়ান বিষয়ক বর্ণনাগুলো মিথ্যা। সবগুলোতেই শী‘আ না হয় মিথ্যা রাবী আছে।

পঞ্চম অভিযোগ:
খুতবা পরিবর্তন!
উত্তর: এই অভিযোগ সত্যি। ঈদের দিন আগে নামায পরে খুতবা! কিন্তু মারওয়ানের যুক্তি ছিল নামায পড়ে মানুষ খুতবা শোনার অপেক্ষা না করেই চলে যায়। খুতবায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকে, সবার শোনা দরকার! তাই খুতবাটা আগে হলেই ভাল! তার এই যুক্তি সঠিক নয়। ইসলামের কিছু বিষয় আছে ‘তাওকীফি’ অর্থাৎ আল্লাহকর্তৃক নির্ধারিত। এর কোনও পরিবর্তন নেই। পরে খুতবা দেয়ার বিষয়টাও এমন।
তবে মারওয়ানকে বিষয়টা খুলে বলার পরও তিনি খুতবা নামাযের আগে চালু রেখেছিলেন, এমন কোনও প্রমাণ নেই।

ষষ্ঠ অভিযোগ:
আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের রা.-এর বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা।
উত্তর: ইবনে হাযম মুহাল্লা কিতাবে লিখেছেন:
-মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম বিভেদ সৃষ্টি করে আলাদা রাষ্ট্য কায়েম করেন, মারওয়ান! তিনি ইবনে যোবায়েরের বিরুদ্ধে বের হয়েছেন! এছাড়া তার সবই ভাল!
অভিজ্ঞজনেরা ইবনে হাযমের এই অভিযোগকে খন্ডন করে বলেন:
-মারওয়ান কিছুতেই প্রথম বিভেদসৃষ্টিকারী নন! উল্টো ইবনে যোবায়েরের ওপরই কেউ কেউ আপত্তিটা তোলেন! তিনি ইয়াযিদের বিরুদ্ধে সসৈন্যে বের হয়েছিলেন। অথচ অবস্থা-পরিস্থিতি যাই হোক, বলতে গেলে একপ্রকার পুরো উম্মাহই ইয়াযিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলো। ৬০জন বড় বড় সাহাবীও ইয়াযিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন!
-তারা ইয়াযিদকে বায়আত দিলেও ইবনে যোবায়ের বায়আত দেন নি! তাই তার পক্ষে ইয়াযিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা অবৈধ বলা যাবে না!
-তাহলে একই যুক্তি তো মারওয়ানের ক্ষেত্রেও খাটে! তিনিও কি ইবনে যোবায়েরের হাতে বায়আত দিয়েছিলেন? না দেন নি!
তদুপরি মারওয়ান মদীনার বৈধ গভর্নর থাকাবস্থাতেই, ইবনে যোবয়ের রা. তাকে মদীনা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সে হিশেবে তিনি তার অধিকার ফিরে পেতে অভিযান চালাতেই পারেন। আর ততদিনে মারওয়ান নিজেই খলীফা হয়ে গিয়েছিলেন। দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করতে এই অভিযান পারিচালনা জরুরী ছিল!

আর আবদুল্লাহ ইবনে উমার ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর মতো সাহাবীগন ইবনে যোবায়ের রা.-এর খেলাফতকে সমর্থন জানাননি! পাশাপাশি এটা ভুলে গেলেও চলবে না, ইবনে যোবায়ের একজন সাহাবী ছিলেন! তার চিন্তাও একেবারে ফেলনা নয়! ইবনে যোবায়ের রা.কে নিয়ে না হয় আরেক দিন হবে!

মারওয়ান রা. সম্পর্কিত অনেক বর্ণনা আছে। বেশির ভাগই তার নিন্দায়। সেগুলোর সনদের অসারতা প্রমাণ করতে গেলে, বিশাল বই হয়ে যাবে।

সংগ্রহ : ১৩-০৮-২০১৬ তারিখে দেয়া লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

আল্লামা আহমদ শফীকে কি আসলেই তিলে তিলে হত্যা করা হয়ছে?

আল্লামা শফী সাহেবের মৃত্যু নিয়ে ওনার খাদেম  শফীর সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। ...