রবিবার, ২৬শে জুন, ২০২২ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৫:২৭
Home / কওমি অঙ্গন / কওমি মাদরাসা সংস্কার: ‎মৌলিক না আংশিক?‎ (২)

কওমি মাদরাসা সংস্কার: ‎মৌলিক না আংশিক?‎ (২)

1_23881হাফিয মাওলানা ফখরুযযামান : উপমহাদেশে দীনিশিক্ষা কার্যক্রম 

আল্লামা মানাযির আহসান গীলানি রাহ.’র ‘নেযামে তালিম ও তারবিয়াত’ নামক গ্রন্থ পড়লে যা বুঝা যায়Ñ তা হল এই যে, ‎ভারতবর্ষে মুসলিম সালতানাতকালে এখানকার দ্বীনি শিক্ষার বেশিরভাগ আমীর উমারা ও বড় বড় জমিদার ও বণিকদের ‎ব্যক্তিগত খরচে নিজ নিজ বাড়িতে বন্দোবস্ত করা হত। এর জন্যে নিয়মতান্ত্রিক কোনো প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসা ছিল না ‎‎যেমন, তেমনি এর জন্যে বৎসরও নির্ধারিত ছিল না; বরং ছাত্র-শিক্ষকের দ্বারস্ত হলে তিনি তার মেধা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি ‎নির্ধারণ করে পড়াতেন। এ পাঠ্যসূচি সময় সময় পরিবর্তন হত। কোনো বিষয়ের নতুন কোনো কিতাব লিখা হলে তা ‎পূর্ববর্তী কিতাবাদির তুলনায় বিন্ন্যাস ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী হলে তা পূর্ববর্তী কোনো কিতাবের ‎‎স্থলাভিষিক্ত হত। এতে কখনো কেউ কোনো ধরনের আপত্তি জানায়নি; বরং তা সাদরে গ্রহণ করত এবং এর প্রতি উৎসাহি ‎হত। ফলে দেখা যায় ওই সময়ে ভারত উপমহাদেশে ইসলামি জ্ঞানসমূহের বিভিন্ন শাখায় অজস্র কিতাবাদি রচিত হয়। যা ‎আজ পর্যন্ত কওমি মাদরাসাশিক্ষার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি মুসলিমবিশ্বেও তা সমভাবে সমাদৃত। এ সময়েই তো ‎গড়ে ওঠেছিলেন‏كنزالعمال ‏এর গ্রন্থকার। ফতওয়ায়ে‏ قاضي خان ‏এর রচয়িতাগণ। ‎حجة الله البالغة‎ এর লিখকসহ‎ভারতবর্ষের উল্লেখযোগ্য একঝাক উজ্জ্বল তারকা। দেখা যায় এ সময়ে রচিত কিতাবাদি যেমন ছিল আরবি ভাষায় তেমনি ‎ছিল ফার্সি ভাষায়ও। কারণ সে সময়ের জাতীয় ভাষা হিসাবে ফার্সি ছিল স্বীকৃত।তাই তারা ধর্মীয় ভাষা আরবির পাশাপাশি ‎সমভাবে আপন জাতীয় ভাষার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন।ফলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে ছিল তাদের অবাধ বিচরণ। তারাই ‎ছিল সমাজের নিয়ন্ত্রক। তারাই ছিল রাজদণ্ড পরিবর্তনকারী। তারাই ছিল সমাজের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সম্প্রদায়। সবার ‎কাছে বরণীয়,গ্রহণীয় ও অনুকরণীয়। কিন্তু আজ এ দিকটির প্রতি অমনোযোগী হওয়ায় আমরা লাঞ্চনার শিকার,বঞ্চনার ‎বস্তু। আজ দ্বীন ও দ্বীনি শিক্ষিতরা উপেক্ষিত, অবহেলিত, নিগৃহিত। এর কারণ একটু পরে আলোচনা করছি।‎

‎১৮৫৭ সালে শামেলিতে সাময়িক পরাজয়ের পর উলামায়ে কেরাম সম্মুখ যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরোধিতা পরিহার করে ঈমান, ‎আকিদা সংরক্ষণে ব্রতী হন। কওমি মাদরাসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আল্লামা কাসিম নানুতবি রাহ.’র ‎উক্তিটিই এখানে উল্লেখ করছি, “রাজত্ব তো গিয়েছে এখন মুসলমানদের ইমান ও আকিদা সংরক্ষণ করা হোক” আর এ ‎‎দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই আমাদের পূর্বসূরীরা ভারতে দ্বীনি মাদ্রাসার জাল বিছিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ রাজত্বের শিকড় কেটে ‎‎দেওয়ার জন্যে মুজাহিদ তৈরির কাজে লেগে যান। সে প্রচেষ্টারই ফলশ্রুতিতে প্রায় একশ বছর পর ভারত স্বাধীন হয়।‎ব্রিটিশরা শুধু ধর্মবিমুখ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা ধর্মের ছদ্মাবরণে তাদেরই আজ্ঞাবহ আরেকদল লোক ‎তৈরির বন্দোবস্ত হিসাবে আলিয়া মাদরাসা নামে অন্য এক শিক্ষাধারা চালু করে। এর দ্বারা শিক্ষিতরা মূলত তাদেরই ‎সহায়ক হিসাবে ভূমিকা রাখবে। তারা তাদের সেই মিশনে যে পূর্ণ সফল- তা কি অস্বীকার করা যাবে? আর এদেরকেই ‎তারা উলামায়ে হক্কানির বিকল্প হিসাবে দাঁড় করায়। সে লক্ষে তারা তাদেরই তত্ত্ববধানে প্রতিষ্ঠা করে কলিকাতা আলিয়া ‎মাদরাসা। যা আলিয়া মাদরাসাসমূহের মধ্যে প্রথম। ‎

‎১৮৬৬ সালে দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কিছুদিন পর মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর। এরও পরে নদওয়াতুল ‎উলামা লক্ষ্মৌ। এসব মাদরাসা থেকে শিক্ষাপ্রাপ্তরা তখনকার সময়ে বিশ্বব্যাপী দ্বীনের বহুমুখী খিদমাত আঞ্জাম দেন। তাঁরা ‎‎যেমন ছিলেন ইলম ও আমলের ময়দানে অগ্র সৈনিক। তেমনি লিখনির জগতে ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। সমভাবে তাঁরা ‎রাজনীতি, সমরনীতি ও বক্তৃতার ক্ষেত্রে বীর সেনানী। সেই বিরল প্রতিভাদের মাধ্যমেই লিখা হয়‏ معارف القرآن، بيان ‏القرآن، تفسير مظهري،إعلاء السنن، معارف الحديث، معارف السنن، فيـض الباري، أوجزالمسالك.‏‎ ইত্যাদি তাফসির-‎হাদিসসহ বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থাবলি। এদেরই কর্ম দেখে মিশরের অধিবাসী মুসলিম বিশ্বের গ্রহণীয় আলিম আল্লামা রশিদ ‎‎রেযা বলেছিলেন, “আমাদের ভারতীয় মুসলিম ভাইরা ইলমে হাদিসের খিদমাতে এগিয়ে না হলে হয়তো ইলমে হাদিস তার ‎মূল শিক্ষা হারিয়ে ফেলত”। ‎

তাই বলে কি ওইসব মনীষীরা যেসব পাঠ্যবই পড়ে উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন, তারা কি এগুলোকে ‎অপরিবর্তনীয় মনে করতেন। তারা কি এগুলোতে কোন ধরনের সংযোজন-বিয়োজনের বিপক্ষে ছিলেন। না কখনো নয়; ‎বরং দেখা যায় তারা নিজেরাই এসব পাঠ্যবই এর অনেকগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন নতুন গ্রন্থাদি সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত ‎করেছেন। যা দারুল উলুম দেওবন্দ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর, নদওয়াতুল উলামা লক্ষেèৗসহ ভারত ও পাকিস্তানের ‎প্রায় সব বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানে তা অব্যাহত রয়েছে। ফলে তারা আপন আপন দেশে সম্মানজনক অবস্থানসহ দ্বীনের বহুমুখী ‎খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এ থেকে ব্যতিক্রম কেন?‎

প্রাথমিককালে দরসে নেযামিতে কি কি বই ছিল তা খতিয়ে দেখলেই পরিবর্তনের ফিরিস্তি আমাদের চোখে ভেসে উঠবে। ‎আর প্রাথমিককালে দরসে নেযামিতে কি কি বই অন্তর্ভুক্ত ছিল তা “তারীখে দরসে নিযামি” নামক উর্দূ ভাষায় রচিত গ্রন্থের ‎‎২৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে। তা একটু দেখে নেয়ার স্বনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই। আর বর্তমানে কওমি মাদরাসাসমূহে ‎প্রচলিত নেসাবে যেসব কিতাবাদি রয়েছে,সেগুলোর সাথে মূল দারসে নেযামিকে মিলালেই পরিবর্তনের বিষয়টা সকলের ‎কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। তখন কিন্তু বর্তমান নেসাবকে দরসে নেযামি বলতে চাইবেন না। এরপরও বলি, এ পরিবর্তনের‎ধারা কচ্ছপগতি। তা আরো গতিময় হলে আমরা বর্তমানে আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে দূরে বহু দূরে অবস্থান করতাম ‎না। আর বেশি দূরে যেতে চাইনা। যে দেওবন্দের নামে আমরা পাগল পারা, যার নাম শুনলে আমাদের বুক গর্বে ফুলে ‎ওঠে, যেখানে যেতে আমরা উদগ্রীব, আমরা গর্ব ভরে স্ব স্ব পাঠে যার আলোচনা করি। সে দেওবন্দের নেসাবে এক যুগের ‎ভিতর কি কি পরিবর্তন এসেছে তা কি আমাদের জানা? সেই অজানাকে জেনে কি আমরা ভবিষ্যৎ চলার পাথেয় গ্রহণ করব ‎না? না এখনো সেই কত কালের পুরাতন, বর্তমান যুগচহিদার দাবি পূরণে অক্ষম কিতাবাদিকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকাকেই ‎চরম ও পরম সাফল্য ও সফলতা মনে করব?‎

‎দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য‎

‎যে জাতি আপন ঊষাকালে ‎اقرأ‎ (পড়ো) ও ‎علم بالقلم‎ দ্বারা সম্বোধিত। সে জাতির জন্যে ১৪০০ শতাব্দী পরে দেওবন্দের ‎মতো পাড়া গাঁয়ে একটি প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র লেখা-পড়ার লক্ষ্যে খোলার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই; বরং দেওবন্দ যে ‎পড়া-পড়ানো ছাড়া মুসলিম জাতিসত্তার এক বৃহৎ ও মহান পরিকল্পনা নিয়ে শুভ যাত্রা করেছিল তা আমরা শায়খুল হিন্দের ‎জবানিতেই শুনি। যিনি ছিলেন দেওবন্দের প্রথম সূর্যসন্তান, যার পৃষ্ঠপোষকতায়ই দেওবন্দ এক মহা মহীরূপে আত্মপ্রকাশ ‎করেছিল। যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেওবন্দকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যোগ্য করেছিল। যার আন্তরিক ‎প্রচেষ্টার ফলে দেওবন্দ মুসলিমবিশ্বের আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠের মর্যাদা লাভে সক্ষম হয়। তিনি বলেন; “হযরতুল উস্তাদ ‎‎(হযরত কাসিম নানুতবি) এ মাদরাসা (দেওবন্দ)-কে কি শুধু দারস-তাদরিস,তালিম-তা’আল্লুমের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা ‎করেছিলেন? মাদরাসা আমার সামনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আমি যতটুকু জানি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে পরাজয়ের পর এ ‎প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এর উদ্দেশ্য এমন একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যার তত্ত্বাবধানে এমন একদল লোক তৈরি করা, ‎যাদের দ্বারা ৫৭ এর অপূরণীয় ক্ষতি কিছুটা হলেও লাঘব করা যাবে। ‎

আমি ওই সব লোকদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না যারা দারস-তাদরিসকে একমাত্র লক্ষ্য হিসাবে স্থির করে নিয়েছে। ‎তবে আমি সেই পথই নির্বাচন করেছি যার জন্যে উস্তাদজি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অর্থাৎ বহুমুখী প্রতিভা সৃষ্টি। ‎

‎সেই প্রতিভার চাহিদা কি সব সময় এক থাকে? না সময়ের পরিবর্তনে চাহিদার পরিবর্তন হয়? আর পরিবর্তিত চাহিদা কি ‎পূর্বতন সিলেবাস দ্বারা সৃষ্টি করা সম্ভব? দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে “দারসে নেযামি” আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেভাবে ‎পূর্ণজন্ম লাভ করেছিল। তেমনি বর্তমান কওমি মাদরাসার সিলেবাসে যুগ চাহিদা ও বর্তমান প্রজন্মের মন-মানসিকতার প্রতি ‎লক্ষ্য রেখে, পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতির দিকে নজর দিয়ে, ইসলাম ও মুসলমানদের ভবিষ্যৎ পানে তাকিয়ে, ইসলামকে‎বিশ্বদরবারে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে, বিজ্ঞান ও কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্বকে নিজেদের আয়ত্বে আনার মানসে- বিস্তর ‎সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে কি না? তা ভেবে দেখার সকরুণ আকুতি রইল।

 

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে জরুরী কিছু কথা!

কমাশিসা ডেস্ক: শুক্রবার ২৫সেপ্টেম্বার ২০২০. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আপনি যখন কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির ...