সোমবার, ২৭শে মে, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ ভোর ৫:৫৩
Home / অনুসন্ধান / সৌদি নেতৃত্বে সামরিক জোট : রহস্য জালে অনেক প্রশ্ন!

সৌদি নেতৃত্বে সামরিক জোট : রহস্য জালে অনেক প্রশ্ন!

riyadh_SM_271094020তাজ উদ্দীন হানাফী ::

২০১৫ সালের ১৫ডিসেম্বর সৌদি রাজধানী রিয়াদে গঠিত হয় নতুন এক জোটের নাট্যকাব্য। নেতৃত্বে সৌদিআরব এবং এই জোটের ঘোষণাকারী হলেন প্রিন্স সালমান। নবগঠিত এই জোটে প্রায় ৩৪টি দেশ রয়েছে, যাদের সবাই সুন্নি। শিয়া কোন রাষ্ট্রকে সেই জোটে দাওয়াত দেয়া হয়নি। বিশেষ করে ইরান, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান এই জোটের বাইরে।
হঠাৎ কেন প্রয়োজন পড়ল এই জোট করার? কি উদ্দেশ্য এই জোটের? যদিও প্রিন্স সালমানের ঘোষণা- সন্ত্রাস দমনে সামরিক জোট করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে! সন্ত্রাস দমনে সৌদির ভূমিকায় আজকের জনমনে প্রশ্ন উঠারই কথা। কেননা জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন জোটে আজকের বিলাসী সৌদি রয়েছে, আবার নতুন জোটের অনেক দেশগুলোও সেই জোটের সদস্য। তাহলে কি প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক নয় যে, গঠিত জোটের পিছনে রয়েছে কোন নতুব ষড়যন্ত্র, রয়েছে গোপন কোন অশনিসংকেত।
সন্ত্রাস দমনে বিশ্বের সব জোট যখন ব্যর্থতার শেষ সীমান্তে, সেখানে গুটিকয়েক সুন্নি দেশ কি পরিমাণ অবধানই বা রাখতে পারবে তাদের নতুন সিদ্ধান্তে, আজকের সন্ত্রাসের পিছনে যে পরিমাণ অর্থের অনুদান, আধুনিক অস্ত্রের মহড়া, এসবের জোগানদাতা হিসেবে এই সৌদিআরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই?
যারা জোট গঠনের উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, সেই সৌদিআরবের বিরুদ্ধেই তো সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রাবাদে সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাহলে তারা কী করে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য জোট গঠন করে? কতটা নীতিভূক্ত তাদের এ উদ্যোগ? এসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে সামনের আলোচনায়,

indexকীভাবে তৈরি হলো এ জোট?

পূর্ব কোন যোগাযোগ ছাড়াই তাড়াহুড়োর মাধ্যমে জন্ম নেয় এই জোট! সন্দেহের জাল বাঁধে তখনই। আন্তর্জাতিক মানের এই জোটের ব্যাপারে মিডিয়া কর্মীরাও অনেকেই জানেন না বিষয়টি। এ যেন অবাস্তব এক গল্প-কাহিনীর মত মনে হয়।
জোটের আওতাভুক্ত অনেক দেশই বলে আসছে, আমরা সেই জোটের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানিনা। হুট করে এই সিদ্বান্ত নেয়া হয়, অনেক দেশের সাথে এমন গুরুত্ববহ কাজের বেলায় শুধু  একটি ফোনকেই যথেষ্ট মনে করেছে প্রিন্সরা। অনেকেই তো দাবি তুলেছেন যে, জনশক্তি তাদের দেশ থেকে সরিয়ে দিবে, যদি তাদের এই জোটের সাথে সম্পর্কিত না হয়। এমনটি হয়তো ঘটেছে আমাদের ভূখণ্ডের সাথে, যা অনেক গবেষকদের নিবন্ধ পড়লেই নিমিষেই বোধগম্য হওয়া যায়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোটের ৩৪টি দেশের মধ্যে রয়েছে। যেগুলো হল-
১। সৌদি আরব, ২। বাহরাইন, ৩। বাংলাদেশ, ৪। বেনিন, চাদ, ৫। কোমোরোস, ৬। কোট দ্য আইভরি, ৭। জিবুতি, ৮। মিশর, ৯। গ্যাবন, ১০। গিনি, ১১। জর্ডান, ১২। কুয়েত, ১৩। লেবানন, ১৪। লিবিয়া, ১৫। মালয়েশিয়া, ১৬। মালদ্বীপ, ১৭। মালি, ১৮। মরক্কো, ১৯। মৌরিতানিয়া, ২০। নাইজার, ২১। নাইজেরিয়া, ২২। পাকিস্তান, ২৩। ফিলিস্তিন, ২৪। কাতার, ২৫। সেনেগাল, ২৬। সিয়েরালিওন, ২৭। সোমালিয়া, ২৮। সুদান, ২৯। টোগো, ৩০। তিউনেসিয়া, ৩১। তুরস্ক, ৩২। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ৩৩। ইয়েমেন।

indexবাংলাদেশ কীভাবে এই জোটে?
সৌদি নেতৃত্বে এই জোটের কাজ কি হবে, সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, সে সম্পর্কে কম-বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “প্রাথমিক আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। রিয়াদের কাছে এই উদ্যোগের বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যের মানে হচ্ছে- এ উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ বিস্তারিত জানে না।
শাহরিয়ার আলম যা বলেছিলেন, “প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে, তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যাপারেও গুরুত্ব দেয়া হবে।”

কিন্তু সৌদিআরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের জন্য রাজধানী রিয়াদে যৌথ কমান্ড সেন্টার স্থাপন করা হবে। সামরিক অভিযানের জন্য যৌথ কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠা আর গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এক কথা নয় সেটা পরিষ্কার। অতএব, ঘোরপ্যাচ একটা থেকেই গেল।
শাহরিয়ার আলম বলেন, “সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, তারা রিয়াদে একটি সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র করতে চান। সন্ত্রাস ও উগ্র সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের জিরো টলারেন্স এবং যে অবস্থান রয়েছে, সেজন্য তারা বাংলাদেশকে এই উদ্যোগে রাখতে চায়। ফলে আমরা এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছি।”
কিন্তু সৌদি আরবের ঘোষণায় নতুন এই জোটকে সন্ত্রাস-বিরোধী সামরিক জোট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ৩০ বছর বয়সী যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেছেন, এই জোট ইরাক, সিরিয়া, মিশর এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তিনি বলেন, ইসলামিক দেশগুলো এই রোগের সঙ্গে লড়ছে যা এসব দেশের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণ্ন করছে। “এখন প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে এর সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু এই জোটের মাধ্যমে দেশগুলো একত্রে লড়াই করবে।”

তবে এর বেশি কিছু জানান নি যুবরাজ সালমান। মজার বিষয় হল, এই জোটের অধীনে সৈন্য পাঠাতে হবে কিনা বা সামরিক বিষয়ে কী ধরনের সহযোগিতার প্রশ্ন আসবে, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ বিস্তারিত জানতে পারে নি। অথচ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে জোটের সদস্য করা হয়েছে।
এমন হাইব্রিড কাজের বেলায় এ কেমন উদাসিনী মনোভাব? স্বাধীন সারভৌমত্ব শুধু দেশের ক্ষেত্রে- আন্তর্জাতিক জোটের বেলায় কি এর কোন নীতি নেই?
এটা ঐতিহ্যের সঙ্গে যে সাংঘর্ষিক- এ প্রশ্নে না গিয়েও ইতোমধ্যে যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হল, এমন কোন সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান দেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয় কি না। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে-
“জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের বিষয়ে হস্তৰেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতি সমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এসব নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র- (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এর জন্য চেষ্টা করিবেন।
(খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্তুার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা  নির্ধারণ ও গঠনের  অধিকার সমর্থন করিবেন এবং
(গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বে সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায় সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।
এছাড়া সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের ১৪৫ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন। ঐ অনুচ্ছেদে বলা আছে যেখানে ‘বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করতে হবে’ সেখানে সামরিক জোটে যোগ দেয়া বিষয়টি অবশ্যই সংসদে বিস্তারিত আলোচনা অপরিহার্য।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে ২৫ অনুচ্ছেদে বিষফোঁড়ার মতো একটি অতিরিক্ত দ্বিতীয় ধারা সন্নিবেশিত ছিল। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান সামরিক আইন দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপন দ্বারা ‘(২) রাষ্ট্র ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবে।’- এই দফাটি সংযোজিত করে। এই সরকারের বড় কৃতিত্ব পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই উদ্ভট ধারাটি বিলুপ্ত করে সংবিধানকে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সম্প্রতি আরব জোটে যোগদান করার মধ্য দিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে যেন ২৫ অনুচ্ছেদের বিলুপ্ত দ্বিতীয় ধারাটি আবারও ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রত্যেকটি জাতির ন্যায়সঙ্গত দাবি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি সংরক্ষিত, যা সংবিধানের  ২৫ অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত হয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চরিত্রের মিলই নেই। এ ছাড়া বর্তমানে সৌদি জোটের ইয়েমেনে শিয়া সম্প্রদায়ের হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা তাদের আগ্রাসী নীতিরই বহিপ্রকাশ।
সরকার যা করে বসল তা সাংবিধানিক, নৈতিক কোনভাবেই কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সরকারের এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী কি না তা সময়ের হাতে ছেড়ে দিলেও এই সিদ্ধান্তটি যে বাংলাদেশের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কাহারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভ্যন্তরীণ কিছু নৈতিকতাই তুলে ধরার প্রায়াস মাত্র।

imagesজোটের আসল লক্ষ্য কী?

সৌদি আরবের এই জোট লড়াইয়ের মাঠা শক্তিধর কোন ভূমিকা রাখতে পারবেনা বলে মন্তব্য করেন,
রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার পেরেন্দঝিয়েভ।
তিনি বলেন “মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যাতে সৌদি আরবের নেতৃত্ব ধরে রাখা যায় তা নিশ্চিত করার জন্য এ জোট গঠন করা হলো। এছাড়া, রাশিয়ার সাহায্য ছাড়াই সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে যাতে অন্য জোটগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায় সেটিও তাদের আরেকটি লক্ষ্য।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেছেন, জোটের সদস্য দেশগুলো ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর এবং আফগানিস্তানের “শুধু আইএস নয় যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠন”  এর বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে সামরিক অভিযান চালাবে স্থানীয় আইন অনুসারে।
এ বিষয়ে পেরেন্দঝিয়েভ বলেন, “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সৌদিআরব এ জোট গঠন করছে না; বরং অর্থের প্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব জোরদার করার জন্যই এই জোট গঠন করছে। এ জোটের প্রধান সমন্বয়কারী হবে সৌদিআরব।”
তিনি বলেন, “এই সৌদিআরবই সিরিয়া ও ইরাকে তৎপর উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।” তবে অনেক বিশ্লেষকই এই জোট গঠনের নেপথ্যে সৌদিআরবের আসল উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আরব সমালোচকেরা সৌদিআরবের প্রতি সরাসরি আঙুল তুলে বলেছেন, যে দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে; যে দেশকে কেউ কেউ আইএস উত্থানের মূল হোতা মনে করেন, এখন সেই সৌদিআরব সন্ত্রাসবিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আরব বুদ্ধিজীবী আইয়াদ আল বাগদাদি এই জোটকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ বলে উল্লেখ করেন।
লন্ডনভিত্তিক এনজিও চ্যাথাম হাউসের ইরাকবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হায়দার আল খোই টুইট করেছেন, ‘সৌদিআরব আগে থেকেই জাতিসংঘের একটি মানবাধিকার পরিষদ প্যানেলের প্রধান হয়ে বসে আছে; এখন দেশটি সন্ত্রাসবিরোধী জোটের নেতা। এমন কৌতুকের পাঞ্চলাইনের দরকার হয় না।’
সৌদি গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য পরিচিত সংগঠন গালফ রিসার্চ সেন্টারের বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা আলানি বলেছেন, সৌদিআরব বুঝতে পেরেছে যে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আইএস উত্থানের জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে। এ কারণে সৌদি মনে করছে, এর পাল্টা প্রচারণা হিসেবে শুধু মুখের কথা ধোপে টিকবে না; তাকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে।
আলানি বলছেন, সামরিকভাবেই আইএসের বিরুদ্ধে এগোতে হবে। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসবাদের ধরন পাল্টাচ্ছে। সন্ত্রাসের লক্ষ্য এখন শুধু ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা আত্মঘাতী হামলা নয়; তারা এখন রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে তাকে মোকাবিলা করতে আন্তর্দেশীয় সমন্বয় দরকার।
সাবেক একজন কূটনীতিক বলেছেন, অনেকের ধারণা, আইএস এবং সৌদি অভিন্ন শক্তি। এই জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে সৌদি বোঝাতে চায় যে, আসলে তারা আইএসের পক্ষে কাজ করছে না।
জোট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান, ইরাক ও সিরিয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের
সাথে শিয়াপ্রধান ইরান ও ইরাকের সম্পর্ক আগ থেকেই ভালো নয়। আর সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে উৎখাতে সৌদিআরব পশ্চিমাদের সাথে আগে থেকেই একজোট হয়ে আছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সৌদিআরবের ভয়, পরমাণু কার্যক্রম ইস্যুতে ইরানের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো তুলে নিলে দেশটি আবার মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে বসতে পারে। এই জোট গঠনের পেছনে সেই ভাবনাও কাজ করে থাকতে পারে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্টিফেনস এই জোট গঠনকে সামরিক অভিযানভিত্তিক কৌশল নয়, বরং এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক বার্তা’ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, এটি সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের একটি সূচনামাত্র।
অবশ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, জোট গঠনের মধ্য দিয়ে একটা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। পরবর্তী সময়ে এর কার্যক্রম বিস্তৃত হবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল যুবায়ের বলেছেন, “জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে। প্রয়োজনে সামরিক অভিযানে সেনা পাঠাবে।”
যে আরবের আস্তিনের ভেতরেই লালিত হচ্ছে আজকের স্বৈরশাসকেরা, সেই আরবের সন্ত্রাসী কাণ্ড প্রতিরোধী হওয়া- এটা শুধু আশ্চর্যের বিষয় না, রীতিমত বিম্ময়করও।

যেসব  স্বৈরশাসকের ভরসাস্থল সৌদিআরব
১। ২০১০ সালের শেষ দিকে এবং ২০১১ সালের প্রথম দিকে যে আরব বসন্ত দেখা দিয়েছিল, তার প্রথম শিকার তিউনিশিয়ার স্বৈরশাসক জয়নাল বেন আলী। গণজোয়ারের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে তিনি পালিয়ে সৌদিআরবে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

২। মিশরের স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের আঞ্চলিক প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল সৌদিআরব। আরব অঞ্চলের সব অনির্বাচিত রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ’র নেতা সৌদিআরব।
৩। বাহরাইনে যে গণআন্দোলন চলছে, সেই গণআন্দোলন দমন করে রাজা হামাদ বিন ঈসা আল খলিফাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে এই সৌদিআরব।
৪। মিশরে ক্ষমতার পালা বদল হলেও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতায় থাকতে দেয় নি সৌদিআরব।
৫। আরব অঞ্চলে যে গণজাগরণ দেখা দিয়েছিল, তা কৌশলে দমন করে ইসরাইল ও মার্কিন সহায়তায় সিরিয়ায় নিয়ে ঠেকিয়েছে এই সৌদিআরব।
৬। ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামকে বছরের পর বছর সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল এই সৌদিআরব।
৭। সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের ওপর আট বছরের যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল ইসরাইল-আমেরিকা-ব্রিটিশ চক্র। সেই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে অর্থ ও অন্য সব ধরনের সমর্থন দিয়ে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিল এই সৌদিআরব।
৮। ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহকে টিকিয়ে রাখতে কী না করেছে এই সৌদিআরব!
৯। এদিকে জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ আন্দোলন গণবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখন সেই গণবিপ্লব নস্যাৎ করার জন্য ১০/১২টি মুসলিম দেশকে সঙ্গে নিয়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে দারিদ্রপীড়িত ইয়েমেনের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে যোগ দিতে বাধ্য করেছিল সৌদিআরব ও তার পরম মিত্র আমেরিকা।
সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় দেশের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপে হাজারো শরণার্থী, কত যে আয়লানেরা সাগরের লবণাক্ত স্রোতে জীবনের ইতি টানছে; নৈপত্যে দেখা যায় সামরিক জোটের প্রবর্তক আজকের চতুর এই সৌদিআরবই জড়িত।

লেখক : প্রাবন্ধিক

About Abul Kalam Azad

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...