মঙ্গলবার, ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১২:১১
Home / অনুসন্ধান / পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতি

3হুসাইন ইমন ::
পৃথিবীর সব জাতিগোষ্ঠী বা ভূখন্ডের মাঝেই বিভিন্ন ধরণের উৎসব, সংস্কৃতি বা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। তাদের উদযাপনের রীতি-প্রকৃতি বা পদ্ধতির মাঝে রয়েছে ভিন্নতা, তবুও সবার মাঝে একটি মৌলিক ঐক্য বিদ্যমান তা হলো- এসমস্ত উৎসবের মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, আত্মপরিচয়কে খুঁজে পায়, জীবনের বিষাদময় একঘেয়েমিকে বিদায় দিয়ে সতেজ সজীব নবীন এক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করার আনন্দানুভূতি পায়। বাঙালি জাতির সংস্কৃতি অন্যান্য জাতির চেয়ে আরো বৈচিত্রময়। বিভিন্ন সব বিচিত্র আচার-অনুষ্ঠান, উৎসবের মাধ্যমে বাঙালিরা তাদের স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়ে আসছে সেই আবহমান কাল থেকে। বর্তমান সময়ের উৎসবগুলোর মাঝে অন্যতম একটি উৎসব হলো- ‘পহেলা বৈশাখ’। পহেলা বৈশাখ নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে আমাদেরকে আজকের বাংলাদেশের দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
এক। বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্ত একটি শ্রেণী, যারা পহেলা বৈশাখকে বাঙালির জাতীয় উৎসব বলেন। আবার তারা পহেলা বৈশাখকে মনে করেন বাঙালির আত্ম-আবিস্কারের দিন, হাজার বছরের আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য, বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক উৎসব, বাংলা নববর্ষে প্রীতির রাখি উৎসব, সুন্দরের বন্ধন ভাঙার আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বকীয় সার্বজনীন উৎসবের প্রাণবন্যা ইত্যাদি।
1দুই । সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী ও গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী পহেলা বৈশাখকে জমিদার বা সুদি মহাজনের খাজনা আদায়ের দিন বা সারা বছরের সুদ পরিশোধের দিন হিসেবেই বোঝেন, এটিকে একটি উৎসব হিসেবে মানলেও জাতীয় উৎসব হিসেবে মানেন না, এই দিনে যে উৎসব-মেলা হয় তারা এটাকে একটি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি মনে করে এ থেকে বিরত থাকেন।
এখন আমরা এই দুটি শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ‘পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতির’ তুলনামূলক আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করবো। এখন আমরা পহেলা বৈশাখের উৎপত্তির দিকে দৃষ্টিপাত করবো-
বাংলা নববর্ষ পালনে ইরান ও আরবের বিভিন্ন দেশের নববর্ষ উদযাপন ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের যোগসূত্র লক্ষণীয়। ১২০১ খ্রিস্টাব্দ, ৫৯৮ হিজরি মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের ফলে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। তখন চান্দ্র ও সৌরবর্ষের গণনারীতিতে পার্থক্যে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। কারণ সূর্য নিজ কক্ষপথে ঘুরতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। যা হলো সৌরবর্ষ। আবার চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধিতে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা। যে কারণে এক চান্দ্রবছর হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট।মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ‘উশর’ ও ‘খারাজ’ তথা মুসলমানদের ফসলি কর ও অমুসলিমদের ভূমি কর আদায়ের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের গণনারীতির ব্যবধানে তৈরি হয় জটিলতা। কেননা ওই দুই বর্ষপরিক্রমায় তৈরি হয় ১১ দিন ব্যবধান এবং ৩৩ বছরে পার্থক্য হয় এক বছর! বাস্তবে দেখা গেল, হিজরি সালের হিসাবে যখন কর আদায়ের সময়, তখন কৃষকের মাঠে ফসলও থাকত না।
4
‘মুসলিম ফসলি সন’ প্রবর্তনের আগে অগ্রহায়ণ থেকে বছর গণনা হতো। ‘অগ্র’ অর্থ শুরু, ‘হায়ণ’ অর্থ বছর। অন্য মতে, ‘অগ্র’ অর্থ শ্রেষ্ঠ, ‘হায়ণ’ অর্থ ধান। কেননা এ সময় প্রধান ফসল আমন বা শ্রেষ্ঠ ‘হৈমন্তিক’ ধান কৃষকের ঘরে ওঠত। তবে বর্ষা শেষে খাজনা আদায়কারী কর্মচারীদের অসুবিধা বিবেচনায় তা শুষ্ক মৌসুমে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে সম্রাট আকবরের সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবন করেন। তিনি হিজরির ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিন ধরে যে নতুন সন উদ্ভাবন করেন, তা-ই ‘বাংলা সন’ হিসেবে প্রচলিত। সম্রাট আকবর ফরমান জারির মাধ্যমে এই নতুন সন গণনা করেন এবং সূচনা বছর হিসেবে ধরা হয় তাঁর মসনদে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯৬৩ হিজরিকে। দেখা যায়, আকবরের ‘ফসলি সন’ যখন চালু হয়, তখন সুবে বাংলায় মহররমে ছিল বৈশাখ মাস। সে জন্যই নতুন সনের প্রথম মাস হয়ে গেল বৈশাখ মাস। অন্যদিকে চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের গণনারীতির ব্যবধানে কালের বিবর্তনে দেখা যাচ্ছে এখন হিজরি ১৪৩৭ এবং ১৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ পহেলা বৈশাখ ১৪২৩ সাল। এ থেকে জানা যায়, আমাদের বাংলা নববর্ষে ঐতিহাসিক হিজরত ও হিজরি সনের স্মৃতি মিশে আছে। বঙ্গাব্দের সূচনা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ঠিক রাখার জন্য বাংলা একাডেমির পক্ষে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বছরের শুরুর পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং শেষ মাসগুলো ৩০ দিন নির্ধারণ করেন এবং আশির দশকে বাংলা একাডেমি ৮ ফাল্গুন ২১ ফেব্রুয়ারি ও ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ঠিক রাখার জন্য খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অধিবর্ষ নির্ধারণ করে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন প্রচলন করেন। আকবরের সময় চন্দ্রাব্দ হিজরি থেকে ফসলি সনকে সৌরাব্দে রূপান্তরিত করা হয়েছিল রাজ্যের সুবিধার জন্য। এর বাইরে বাংলা সনের বিশেষ কোন সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছিলো না।
2বাংলা নববর্ষকে আজকাল বলা হচ্ছে হাজার বছরের আবহমান বাংলার উৎসব। ঐতিহাসিকরা মোটামুটি একমত যে আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপনের কোন ধারণা বা রেওয়াজ ছিলো না। আজকাল বাংলা নববর্ষ নিয়ে যা বলা হচ্ছে তা নিরেট কেচ্ছা-কাহিনি ছাড়া কিছুই নয়। আমরা দেখতে পাই বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের কাব্যে ঋতু, প্রকৃতি, সমাজচিত্রের কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু কোথাও নববর্ষের কথা উল্লেখ নেই। এছাড়াও ভারতবর্ষের প্রচীন ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বেরুনীর ভারততত্ত্বেও’ নববর্ষের কোন উল্লেখ নেই। আর তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেয়া হয় যে বঙ্গাব্দের শুরু থেকেই উৎসব ছিল তাহলেও হাজার বছর দূরের কথা পাঁচশত বছরের বেশি হয় না। এসব ধারণা আমরা কিছুটা পেয়েছি মোগল আমলে ইরানী সভ্যতার ‘নওরোজের’ প্রভাবে এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমাদের ‘হ্যাপী নিউ ইয়ার’ পালনের কায়দা-কানুন অনুকরণ করে। ঔপনিবেশিক বাংলায় পহেলা বৈশাখ ছিল সুদখোর, জমিদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের খেরোখাতা মেলানোর দিন। কার কাছে কী দেনা-পাওনা তার হিসাব মিলিয়ে নতুন খাতা খোলার দিন। একে তখন বলা হতো হালখাতা। চিরিস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে যে জুলুমবাজ জমিদার শ্রেণী ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিলো তারাই পহেলা বৈশাখের দিনে আনন্দ-ফুর্তি করতো, মেলা বসাতো। জমিদার বাড়িতে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব হতো। জমিদাররা বাকী খাজনা আদায়ের কৌশল হিসেবেই দিনটি পালন করতো ও প্রজাদের মিষ্টি মুখ করাতো। কিন্তু এ জমিদার বাড়ীতে ধনী প্রজা ও গরিব প্রজাদের বসা বা মিষ্টিমুখ করানোর মাঝেও অনেক তারতম্য ছিল। সেই আনন্দের কিছুটা উচ্ছিষ্ট হয়তো গরীব রায়তদের মধ্যেও ছিটকে পড়তো কিন্তু সেটা বাঙালির বা আম জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি না, নববর্ষও না। অবশ্য এইসব সুদখোর জমিদারদের সংস্কৃতিও একটা সংস্কৃতি। কিন্তু একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি তো আর সবার সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। ফরহাদ মজহার এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত লিখেছেন এই লিংকে
চৈত্রের শেষ দিনে হিন্দুরা চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতো, যা তাদের তের পার্বণের একটি। পহেলা বৈশাখ থেকে দু’একদিন বা সপ্তাহব্যাপী চড়কপূজা করতো এবং পূজা উপলক্ষে মেলা বসতো। এছাড়াও ঘটপূজা, গণেশ পূজা, সিদ্ধেশ্বরী পূজা, মঙ্গলশোভাযাত্রার মাধ্যমে মঙ্গল প্রার্থনা প্রভৃতি উৎসব হিন্দুরা পালন করতো।
অপরপক্ষে আমরা দেখতে পাই বাংলা বর্ষের সূচনা মুসলমানদের হাতে, মোগলরা এই সময় উশর, খারাজ, ভূমি কর গ্রহণ করতো। জমিদাররা ঐদিন বার্ষিক রাজস্ব নবাবের কোষাগারে জমা দিত। গ্রামের লোকেরা নববর্ষে কখনো পান্তা ভাত খেতো না, বছরের অন্যদিনগুলোতে কষ্টে কাটালেও এই দিনে একটু ভাল খাবার চেষ্টা করতো, ঘর-বাড়ী ভালভাবে পরিষ্কার করতো, একে অন্যের খোঁজ-খবর নিত। এভাবেই চলে আসছিলো আমাদের সমাজ।
এদেশে আবহমান বাংলার হাজার বছরের চিরায়ত সংস্কৃতির কথা যারা বলেন তারা একান্তভাবে রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৩৮ সালে বৃটিশদের খুশি করার জন্য তাদের বিজয় চেয়ে নববর্ষে উদযাপন ও পূজার মাধ্যমে প্রার্থনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে গ্রামীণ আবহ বাদ দিয়ে বর্ষশুরুর উৎসব চালু করেন। এছাড়াও তিনি শান্তি নিকেতনের প্রয়োজনে হিন্দু ধর্মের উৎসবগুলোকে- পৌষৎসব, মাঘোৎসব, চৈত্রসংক্রান্তি, হোলি প্রভৃতি উৎসবকে নতুনভাবে প্রবর্তন করেন। কিন্তু এই উৎসব তখন শুধুমাত্র শান্তি নিকেতনের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণকারীরা এই সংস্কৃতি লালন করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিতে থাকে।
এদিকে হিন্দু-মুসলমানদের মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং শেষে কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী নীতি গ্রহনের ফলে জন্ম হয় মুসলিম লীগের। জন্মের পর থেকেই মুসলিম লীগ এই অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে কাজ করে যায়। জমিদারি প্রথা বিলোপ, মহাজনি শোষণ অবসান, কৃষি খাতের দুরবস্থা দূরীকরন, নিপীড়িত মুসলমানদের পাশে দাড়িয়ে এ অঞ্চলের প্রাণের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠে। পরবর্তীতে দ্বিজাতি ত্বত্তের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে মুসলিম লীগ এই বাংলার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে, লাহোর প্রস্তাবের শর্তভঙ্গ করে তারা আমাদের উপর চেপে বসে। ভাষার প্রশ্নে তারা আমাদের উপর উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চায়, এদেশের লোকদের ভারতের প্রতি অনুরাগী বলে সন্দেহ করতে শুরু করে। ফলে মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী মতো জাঁদরেল নেতারা মুসলিম লীগ থেকে চলে আসে। ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ভারত-পাকিস্থান পৃথক হয়েছিল পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে। আর ভারত পরিচালিত হয় ‘নেহেরু ডকট্রিন’ দিয়ে, যার মূল দর্শন হলো মহাভারত অনুযায়ী আশেপাশের সব রাষ্ট্র একদিন ভারতে একীভূত হয়ে যাবে। বিশ্বায়নের এই যুগে এখন আর কেউ সৈন্য-সামন্ত দিয়ে কোন ভূখন্ড দখল করে নেয় না, বরং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয় ঘুচিয়ে দিয়ে তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যে তারা এই দেশে তাদের আদর্শের অনুগামী একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলে, যারা তার স্বার্থ রক্ষা করে। এই শ্রেনী বাঙালি সংস্কৃতির নামে আমাদের এখানে শান্তি নিকেতনীয় সংস্কৃতি আমদানি শুরু করে। অবশেষে ১৯৬০ সালে পাকিস্থানের শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে রবীন্দ্রানুরাগীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে আরো ঘটা করে নববর্ষ পালন করা শুরু করে। রমনার বটমূলে বসে ছায়ানটের কয়েকজন মিলে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মাধ্যমে নববর্ষ পালন শুরু করে। তবে তা ১৯৬৭ আগে জনপ্রিয়তা পায়নি। তারপর রবীন্দ্রপ্রেমীদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিকট নববর্ষ অবশ্য পালনীয় হয়ে উঠে। তখন নববর্ষ যতটা না সাংস্কৃতিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ছিল।
এরপর পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে বলা হচ্ছে আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য। অথচ ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খাওয়া কখনোই বাঙালি সংস্কৃতি ছিলো না। শুধুমাত্র পুজিবাদী চিন্তা থেকে ১৯৮৩ সালে এটা ঢুকানো হয়েছে। যার প্রমাণ সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদসহ যারা এটার প্রচলন ঘটিয়েছে তাদের একটি সাক্ষাৎকার এই লিংকে
নববর্ষের উৎসবে এখন যুক্ত হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। মঙ্গল শোভাযাত্রার ধারণা এসেছে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির অংশ মঙ্গল প্রদীপ, মঙ্গল কাব্য, মঙ্গল ঘট ও মঙ্গলগীতের ভাব ও মাহাত্ব্য থেকে। মঙ্গল শোভাযাত্রা মানে হলো মঙ্গল কামনা করে অশুভ বিতাড়নের জন্য যে যাত্রা। এই শোভাযাত্রায় সবসময় বিভিন্ন দেবদেবীর বাহন থাকে। যেমন: লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস, গণেশের বাহন ইঁদুর, দুর্গার বাহন সিংহ, মনসার বাহন সাপ, কার্ত্তিকের বাহন ময়ূর, মহাদেবের বাহন ষাঁড়, যমরাজের বাহন কুকুর, ইন্দ্রের বাহন হাতি, ব্রহ্মার বাহন পাতিহাঁস, বিশ্বকর্মার বাহন ঢেঁকি, শীতলার বাহন গাধা ইত্যাদি। নেহেরু ডকট্রিনের বরকন্দাজরা ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নামের এ হিন্দুয়ানী প্রথা চালু করে।
এখন আবার বলা হচ্ছে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। হিন্দু পূজার এই প্রথা-পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসব। এ দেশের বাঙালিবাদীদের দূরতম লক্ষ্য হচ্ছে এসব অনুষ্ঠান প্রচলনের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানকে সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দু বানিয়ে দেওয়া। কিন্তু হিন্দু শব্দটি চাউর করা যাবে না বলে বলা হয় বাঙালি। আর সেটা করতে পারলে বাঙালি মুসলমানের শিকড় ছিড়ে যাবে আর তাহলেই তাদের কে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে গোলাম বানিয়ে রাখা যাবে। তারা বলছে যে- বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও সাংস্কৃতিকভাবে কোন বিরোধ নেই। আমাদের মাঝে যে সাংস্কৃতিভাবে বিস্তর ফারাক রয়েছে তা তারা মানতে চায় না। রমনার বট্মূলে প্রভাতে রবীন্দ্রনাথের আবাহনী সংগীত ও ব্রাহ্মধর্মের কায়দায় সূর্যপূজার ভঙ্গিতে সূর্য উঠার সাথে সাথে ‘অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা’ গেয়ে এই বৈশাখী অনুষ্ঠান চালু হয়। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে হিন্দু ধর্ম ও ব্রাহ্মধর্মের সংস্কৃতিগুলো এ দেশে চালু করেন যাতে এখানকার প্রবাহমান মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা দুর্বল হয়ে যায়। তারা নিজেরা সেক্যুলার বলে দাবি করলেও এসমস্ত হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক থেকে মঙ্গল বা কল্যাণ কামনা করে থাকে।
অপরপক্ষে যারা ইসলামি আদর্শে জীবন পরিচালনা করতে চায় তারা নববর্ষকে কলকাতার বাবু সংস্কৃতি বা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলে পরিহার করে চলেন এবং ইসলামি ধর্মমতে এই উৎসবকে শিরক বা হারাম মনে করে বিরোধিতা করেন। এতে করে একটা সন্দেহ সবার মনে ঢুকে যায় ‘এরা যে ইসলামী সমাজের কথা বলে ,সেখানে তাহলে পহেলা বৈশাখ বলে কিছু থাকবে না’! খন্ডিত ও সংকীর্ণ চিন্তার মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতিকে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক করে দেখানোটা ঠিক নয়। ইসলাম মানেই সব স্থানিক সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেয়া নয়। পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে যেসব কাজ করা হয় সেগুলোর একটা অংশ আছে বড় ধরনের গুনাহ এবং ঈমান – আক্বিদার পরিপন্থি। আরেকটা অংশ আছে যেগুলোকে শরীয়াতের দৃষ্টিতে ‘মুবাহ’ বলা যেতে পারে। পান্তা ভাত খাওয়া ,সামর্থবানদের ইলিশ খাওয়া ,বৈশাখি মেলায় যাওয়া , বেলুন ও ঘুড়ি ওড়ানো, নাগরদোলায় চড়া, পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, দোকানে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান করা ইত্যাদি এই অংশে পড়ে। বর্তমানে সারাদেশের সাধারণ মানুষ নববর্ষ উদযাপন বলতে এগুলোকেই বোঝে। আর এগুলো কখনোই গুনাহ বা ঈমান-আক্বীদার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
বড় শহরগুলোতে বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মুখোশধারী এবং এলিটদের একটা অংশ অতিরিক্ত যেসব কাজ করে – সকাল বেলা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামক বিশেষ শোভাযাত্রা, ঢাকার রমনা বটমূলে এবং চট্টগ্রামে ডিসিহিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা প্রভৃতি ইসলামে অনুমোদিত নয়। কেউ কেউ নববর্ষ উদযাপনকে ‘হিন্দু’ সংস্কৃতি বলে পুরোপুরি বর্জন করার কথা বলছেন। ‘কোন ব্যক্তি যে জাতির অনুসরণ করবে সে তাদের অন্তর্ভূক্ত’ এই হাদীসকে ব্যবহার করছেন। কীভাবে এটা ‘হিন্দু’ সংস্কৃতি হলো? বেদ, গীতা, ভগবত, রামায়নে কি পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কথা বলা হয়েছে? অন্য ধর্মের লোকেরা করলেই কি সব ‘পরিত্যাজ্য’ হয়ে যায়? শিখরা তো দাড়ি রাখে এবং পাগড়ী পড়ে, তাই বলে কি সেসব মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? সুতরাং ‘পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন’কে সরাসরি ইসলাম বিরোধী বলার কোন যৌক্তিকতা নেই। বিষয়টাকে এভাবে দেখা যেতে পারে- গ্লাসে করে কেউ মদ খায়, তাই বলে গ্লাসটাই হারাম হয়ে যায় না। মদবিহীন গ্লাসে আমরা পানিও খেতে পারি। ইসলামের মৌলিক সীমার ভেতরে যেকোন উৎসব গ্রহণযোগ্য।
এবার আসি হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও এ ভূখন্ডে আরো ৪৫ টি ক্ষুদ্রনৃতাত্বিক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদেরও রয়েছে নববর্ষ উদযাপনের বর্ণাঢ্য আয়োজন। আমরা যারা এই দিনটাকে বাঙালির জাতীয় মহোৎসব বলি তারা সচেতনভাবে এই জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাদ দিয়ে কথা বলি। এটা আমাদের ভূখন্ডের জন্য খুব সুখকর নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ সকল জাতিগোষ্ঠী নববর্ষ উপলক্ষে ‘বৈসাবি’ উৎসব পালন করে থাকে। ‘বৈসুক’, ‘সাংগ্রাই’ ও ‘বিঝু’ এই তিনটি শব্দের প্রথম অক্ষর নিয়ে বৈসাবি।
বর্তমানে আমাদের মাঝে যে নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ চালু আছে তা একটি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদপুষ্ট, ভারতীয় আগ্রাসনবাদী হিন্দুত্ব রীতি-নীতি দ্বারা পরিচালিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ব্যতীত অন্য কিছু নয়। যার কোন জাতীয় রূপ নেই। মনে রাখা দরকার যে সামাজিক ভিত্তিতে আমাদের সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ কোন জাতীয় উৎসব নেই, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশবাসী যেকোন মানুষ যোগদান করতে পারে। একমাত্র পহেলা বৈশাখই সবদিক বিচারে জাতীয় উৎসবের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।
এখন আসি আমাদের এই দিনকে কিভাবে জাতীয় উৎসবে পরিনত করতে পারি সে প্রসঙ্গে। আজকের পহেলা বৈশাখকে জাতীয় উৎসবে পরিণত করতে হলে এর ভেতরে যত ধর্মীয় উপাদান অনুপ্রবেশ করেছে বা করানো হয়েছে সেগুলোকে বাদ দিতে হবে। যেমন_ ঘটপূজা, চড়কপূজা, সিদ্ধেস্বরী পূজার যে সমস্ত উপাদান, মঙ্গল শোভাযাত্রার মাঝে বিচিত্র ধরণের শিরকি প্রতীক যেমন: পেঁচা, রাজহাঁস, ইঁদুর, সিংহ, সাপ, ময়ূর, ষাঁড়, কুকুর, হাতি, পাতিহাঁস, ঢেঁকি, গাঁধা ইত্যাদি এবং বিভিন্ন ধরণের জন্তু জানোয়ারের মুখোশ; যার মধ্যে কল্যাণ খোঁজা হয় এগুলো পরিহার করে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ভিত্তিক আচার অনুষ্ঠান যেমন- মেলা, সবার অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও নির্মল বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরস্পরের খোঁজ খবর নেয়া, সরকারীভাবে জেলায় জেলায় বৈশাখের আয়োজন করতে হবে। তবেই পহেলা বৈশাখকে জাতীয় উৎসব হিসেবে সকল জনগণ মেনে নেবে।

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...