সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ১০:৪২
Home / পরামর্শ / নির্ভুল বানান শেখার কিছু পরামর্শ ও প্রস্তাব

নির্ভুল বানান শেখার কিছু পরামর্শ ও প্রস্তাব

মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন কাসেমী ::

14492569_544284559113809_5883763542711869058_n(আমার কোনো লেখাই পড়ার অনুরোধ করি না। এ লেখাটি মনোযোগসহ পড়ার সবিশেষ অনুরোধ করছি। বিশেষত লিখিয়ে এবং বানান ভুলে পারদর্শীদের।)

শুদ্ধ বানান শেখার পথ ও পন্থা সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান। কী করলে শুদ্ধ বানান লেখা যাবে? বিষয়টি নিয়ে আমিও বেশ চিন্তাভাবনা করেছি। দেখলাম, সব রোগীকে একই ওষুধ দেওয়া যাবে না। কার কোন জায়গায় সমস্যা, সমস্যা বোঝে সমাধান দিতে হবে। তবে সামগ্রিকভাবে নিচের বিষয়গুলো আয়ত্তে আনতে পারলে বানানে ভুল হ্রাস পাবে। বানান শুদ্ধ হওয়া শুরু করলে সাহিত্যমানের দিকে নজর দেওয়া উচিত। বাক্যগঠন, বাক্যরীতি, উপস্থাপনা, যতিচিহ্নের প্রয়োগ, বিষয়বস্তুর চমৎকারিত্ব, অভিনব কৌশল, পাঠকের চাহিদা- ইত্যাদি বিষয় লেখার মান ও সুনাম বৃদ্ধিতে নিয়ামক ও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এ লেখাটি কয়েকটি মাসিক পত্রিকা ও স্মারকে প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকজনের অনুরোধ রাখতে গিয়ে আজ আবার প্রকাশিত হল। সুপরামর্শ কাম্য। লেখাটি কনভার্ট করে দিয়েছি; কিছু অক্ষর ভেঙে গেছে। অনুমানে ঠিক করে নিতে হবে। এ মুহূর্তে ঠিক করে দেওয়ার মতো সময় পাচ্ছি না।

পড়া ও পরা, চর ও চড়, করা ও কড়া, ঘোড়া ও ঘোরা- এই শব্দগুলোর উচ্চারণে পার্থক্য না থাকলেও বানানে পার্থক্য হওয়ার কারণে অর্থে যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে তা বোধ করি সকলেই বুঝেছেন। এরূপ শব্দ একটি দু’টি নয়, অগণিত, অজস্র। আমরা এসব শব্দ লিখতে গিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ি। এবং ভুল লিখে ফেলি। এই ভুল প্রতিনিয়তই আমরা করছি। আমাদের এমনই দুর্ভাগ্য যে, পত্র-পত্রিকায়, বই-পুস্তকে, রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা, দেয়ালিকা, দেয়াললিখন, টেলিভিশন, সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড, রাস্তাঘাট বা দোকানপশারির নামফলকে সর্বত্র বানান ভুলের উৎসব দেখতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটু সামনে ‘বিজয় সরণী’ আছে। ঢাকাতে আরো অনেক সরণী দেখা যায়। কোথাও দেখবেন ‘স্মরণী’, আবার কোথাও ‘স্বরণী’ আরো বিচিত্র ধরনের বানানও দেখা যায়। অথচ এক্ষেত্রে অবিকল্প ‘সরণী’/সরণি’ হবে। কেবল এই ‘সরণ’ না, আরও দু’টি শব্দ আছে সমোচ্চারিত, তাও স্মরণ রাখা দরকার। ‘শরণ’ মানে আশ্রয়। যেমন : শরণার্থী। অর্থ : আশ্রয় প্রার্থনাকারী। তাছাড়া আপনি ডাক্তারের ‘শরণাপন্ন’ হলে এই ‘শরণ’ই নিতে হবে। ‘স্মরণ’ অর্থ : মনে রাখা, ভুলে যাওয়ার বিপরীত। তাই বলা হয় ‘স্মরণিকা’ ও ‘স্মারক’। কিন্তু ‘স্বরণ’র কোনো অর্থ নেই। তাই ‘স্বরণিকা’ ও ‘স্বারক’ লেখা চরম ভুল।

একজন সাধারণ দোকানদার থেকে ছাত্র-শিক্ষক হয়ে সচিব পর্যন্ত সবাইকেই কিছু না কিছু বাংলা লিখতেই হয়। আমরা যাই লিখি যেন শুদ্ধ ও নির্ভুল লিখি- এই চেতনা সবার মধ্যেই থাকা চাই। নির্ভুল বানান ও বিশুদ্ধ ভাষারীতি কীভাবে আয়ত্ত করা যায়, এই বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ ও প্রস্তাব পেশ করা হল। দিক-নির্দেশনাগুলো যত্ন করে মেনে চললে আপনার বানান শুদ্ধ হতে শুরু করবে– এই আশা ব্যক্ত করি।

০১. যুক্তাক্ষর-পরিচিতি :

স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের আকৃতির সাথে আমরা পরিচিত; কখনো বাক্যের মধ্যে বর্ণের এই আকৃতি হুবহু ঠিক থাকে। যেমন- বল, কল, নল ইত্যাদি। এ বিষয়টি স্পষ্ট; ব্যাখ্যা করে বুঝানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কখনো একবর্ণ অন্য বর্ণের সাথে মিলিত হয়ে শব্দ গঠিত হয়; তখন প্রায় বর্ণের আসল রূপ ঠিক থাকে না। একবর্ণ যখন অন্য বর্ণের সাথে মিলিত হয় সে বর্ণকে যুক্তবর্ণ বা যুক্তাক্ষর বলা হয়। আর জেনে রাখা দরকার, বাংলা শব্দ শুদ্ধভাবে লিখতে হলে সর্বাগ্রে যুক্তাক্ষর চিনতে হবে।

ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে স্বরবর্ণ যুক্ত হলে আমাদের চিনতে অসুবিধে হয় না। কারণ, সেগুলো আমরা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। ‘গান’ শব্দে যে গ (ব্যঞ্জনবর্ণ) এর সাথে আ স্বরবর্ণ মিলে ‘গা’ যুক্তবণ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনেই পড়ে না। স্বরবর্ণ যখন ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হয় তখন স্বরবর্ণগুলো স্বীয় রূপ পাল্টায়। যেমন-

আ হয়ে যায় আ-কার া  (কাকা)

ই ,, ,, হ্রস্ব ই-কার ি (চিঠি)

ঈ ,, ,, দীর্ঘ ঈ-কার ী (বীণা)

উ ,, ,, হ্রস্ব উ-কার ু (মরু/মরু)

ঊ ,, ,, দীর্ঘ ূ (রূপা/রূপা)

ঋ ,, ,, ঋ-কার ৃ (তৃণ/হৃদয়)

এ ,, ,, এ- কার ে (কে)

ঐ ,, ,, ঐ-কার ৈ ( বৈ )

ও ,, ,, ও-কার ে া ( কোমল)

ঔ ,, ,, ঔ-কার ে ৗ ( ভৌতিক )

স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, স্বরবর্ণের এ চিহ্নগুলো কখনো ব্যঞ্জনবর্ণের ডানপাশে ( া, ী ); কখনো বাঁ পাশে ( ,ি ,ে ৈ ); কখনো উভয় পাশে ( ে া, ে ৗ ); আবার কখনো নিচে ( ু , ূ , ৃ ) স্থান নেয়। তবে এ ধরনের যুক্তবর্ণ চিনতে ও বুঝতে আমাদের কোনো অসুবিধেই হয় না। কারণ, প্রায় প্রতিটি শব্দেই ব্যঞ্জনবর্ণ + স্বরবর্ণের ( যেমন- ক + আ = কা ) সংযোগ থাকে বলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সত্যি বলতে কি, এ রকমের যুক্তবর্ণ বাদ দিয়ে বাংলার প্রায় কোনো শব্দই কল্পনা করা যায় না। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিত হয়ে নতুন যে যুক্তবর্ণের সৃষ্টি হয় তাতেই একটু ঝক্কি-ঝামেলা। কেননা, তার আকৃতি-অবয়ব নানান ধাঁচের, উচ্চারণও হরেক রকমের। বাংলাতে যুক্তব্যঞ্জনের সংখ্যা আড়াইশোর অধিক। উদাহরণস্বরূপ আমরা কেবল একটি বর্ণের সঙ্গে মিলিত হয়ে গঠিত যুক্তব্যঞ্জন পেশ করছি। যুক্তব্যঞ্জনের বিস্তারিত পরিচিতি আমার সঙ্কলিত ‘বানানচর্চা’ বইয়ে দেখা যেতে পারে।

হ {হ্ণ হ্ন হ্ম হ্য হ্র হ্ল হ্ব}
০১. হ্+ণ=হ্ণ। নাম : হ-য়ে মূর্ধন্য-ণ। যেমন- অপরাহ্ণ [অপরান্হো]।
০২. হ্+ন=হ্ন। নাম : হ-য়ে দন্ত্য-ন। যেমন- আহ্নিক [আন্হিক]।
০৩. হ্+ম=হ্ম নাম : হ-য়ে ম-ফলা। হ্ম লেখার সময় হ আগে আসলেও উচ্চারিত হবে পরে। যেমন- ব্রাহ্মণ, উচ্চারণ : ব্রাম্হোন। তদ্রূপ : ব্রাহ্মণবাড়ীয়া [ব্রাম্হোনবারিয়া]; ব্রহ্ম [ব্রোম্হো]; ব্রহ্মপুত্র [বোম্হোপুত্রো]।
০৪. হ্+য=হ্য। নাম : হ-য়ে য-ফলা। ‘হ্য’ শব্দের শুরুতে আসলে সাধারণত -একারের উচ্চারণ হয়। যেমন- হ্যালো [হেলো]। তবে শব্দের মাঝখানে বা শেষে হ্য এর উচ্চারণ: জ্য হয়ে থাকে। যেমন : বাহ্যিক [বাজ্যিক]; সহ্যশক্তি [শোজ্যশোক্তি]; উহ্য [উজ্ঝো]; ঐতিহ্য [ওইতিজ্ঝো]।
০৫. হ্+র= হ্র। নাম : হ-য়ে র-ফলা। যেমন- হ্রদ [রদ্]; হ্রাস [রাস্]।
০৬. হ্+ল=হ্ল। নাম : হ-য়ে ল-ফলা। যেমন- আহ্লাদ [আহলাদ]।
০৭. হ্+ব=হ্ব। নাম : হ-য়ে ব-লা। হ্ব এর দ্বিত্ব উচ্চারণ হবে। যেমন- আহ্বান [আওভান]।

০২. যুক্তবর্ণের স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছরূপ :
আমার ডাকনাম ‘হুমায়ুন’। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণের পরেও আমার মনে প্রশ্ন ছিল আমার নামের প্রথম অক্ষর ‘হু’ না-কি ‘হু’ কোন্টি সঠিক? ভেবেছিলাম একটি সঠিক অপরটি ভুল। কিন্তু এর কোনো সুন্দর উত্তর কারো কাছেই পাই নি।
আমি শিক্ষক হওয়ার পর ক্লাসে কয়েকটি অস্বচ্ছ বর্ণের পরিচিত রূপ বাদ দিয়ে স্বচ্ছ করে লেখে ছাত্রদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কোনগুলো সঠিক? তারা স্বচ্ছ বর্ণগুলোকে অবলীলায় ভুল প্রতিপন্ন করল। অথচ উভয় রূপই সঠিক। এমনকি স্বচ্ছ বা অস্বচ্ছ কোনো একটি রূপকে উত্তমও বলা যাবে না। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত রূপটি তুলে ধরাই বাঞ্ছনীয়। হ্যাঁ, শিক্ষার্থী, শিক্ষিতজন ও গবেষকদের উভয় রূপ সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বহু যুক্তাক্ষর সত্যিই অস্বচ্ছ ও অস্পষ্ট। তাই অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণসমূহকে যথাসম্ভব স্বচ্ছ ও স্পষ্ট বা বিশ্লিষ্ট করে লেখার একটা প্রবণতা ও প্রচেষ্টা অনেক দিন যাবৎ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে সব বর্ণকে স্পষ্ট করে লেখা যাবে না। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, যুক্তবর্ণের দু’টি প্রকার রয়েছে : কিছু বর্ণ এমন যা স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছ– উভয় রূপ ধারণ করতে পারে। আবার কিছু বর্ণ এমন, যার প্রকৃত অস্বচ্ছ রূপই সর্বাবস্থায় বহাল থাকবে; স্বচ্ছ বা স্পষ্ট করে লেখা যাবে না। আমরা নিচে দুনো প্রকারের একটি তালিকা পেশ করছি :

যেসব যুক্তবর্ণ স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছ উভয় রূপে লেখা যায় :

অস্বচ্ছ রূপ স্বচ্ছ রূপ
গু/শু/হু গু শু হু
রু/খ্রু/গ্রু/ত্রু/দ্রু/ধ্রু/প্রু/ব্রু/ভ্রু/শ্রু রু/খ্রু/গ্রু/ত্রু/দ্রু/ধ্রু/প্রু/ব্রু/ভ্রু/শ্রু
শ্রু/দ্রু/ভ্রু শ্রূ/দ্রূ/ভ্রূ
হৃ হৃ
ক্ত/ক্র ক্ত/ক্র
ঙ্ক/ঙ্গ ঙ্ক/ঙ্গ
-/ –
ন্থ/স্থ / স্ক ন্থ/স্থ স্ক
¯œ/স্ব/স্ম স্ন /স¦/স¥/
তাছাড়া গ্ধ/দ্ধ/ন্ধ/ব্ধ/; ষ্ক/ষ্ক্র/ষ্ট/ষ্ট্র/ষ্ঠ/ষ্প/ষ্ফ/ষ্ম; স্ক/স্ক্র/স্ত/স্ত্র/স্থ/স্প/স্পৃ/ স্প্র/স্ফ এই অক্ষরগুলোর স্বচ্ছরূপে ধ, ষ, স অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে চেনা যায়। ফলে যুক্তবর্ণগুলো কোন্ কোন্ অক্ষর মিলে তৈরি হয়েছে, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
(বি.দ্র. প্রযুক্তিগত কারণে কিছু বর্ণকে এখানে স্বচ্ছ করে লেখা গেল না।)

যেসব যুক্তবর্ণ শুধু অস্বচ্ছ রূপে লেখা যায়; স্বচ্ছ রূপে নয় :
ক্ষ (ক্+ষ) ত্থ (ত্+থ)। হ্ম (হ্+ম) ত্র (ত্+র)। জ্ঞ (জ্+ঞ) ভ্র (ভ্+র)। ঞ্চ (ঞ্+চ) ষ্ণ (ষ্+ণ)। ঞ্ছ (ঞ্+ছ) হ্ণ (হ্+ণ)। ঞ্জ (ঞ্+জ) হ্ন (হ্+ন)। ঞ্ঝ (ঞ্+জ)  ক্ষ্ণ (ক্+ষ্+ণ)। ট্ট (ট্+ট) ক্ষ্ম (ক্+ষ্+ম)।

০৩. বাংলা বানান লেখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উচ্চারণ নির্ভর না হওয়া। (কিন্তু আরবিতে এর উল্টো; সেখানে অনেক ক্ষেত্রে মাখরাজ বা উচ্চারণ দিয়ে বানান লিখে ফেলা যায়)। কেননা, একই ধ্বনির বানান হরেক রকম হতে পারে। যেমন :
শিকার-স্বীকার; দর্শন-ধর্ষণ; সরণ-স্মরণ। বিশ্ব, হ্রস্ব, দৃশ্য, ভাষ্য, শস্য। তদ্রুপ, উচ্চারণ সুষ্ঠ কিন্তু বানান সুষ্ঠু। উচ্চারণ জোতি কিন্তু বানান জ্যোতি ইত্যাদি।

০৪. শব্দকে হৃদয়ে অঙ্কিত করা। ছবির মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য করা। প্রত্যেকটি বানানের পেছনে অবশ্যই ব্যাকরণগত যুক্তি আছে। কিন্তু আপনি যদি মুখস্থ রাখতে পারেন যে, এ বানান এভাবেই লিখতে হয়, তাহলে এত ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে না। যেমন : ‘মুহূর্ত’ বানানটি ছাত্ররা অবশ্যই শিক্ষাজীবনে অসংখ্যবার পড়েছে, দেখেছে। তারপরও লিখতে গিয়ে ‘মুহুর্ত’ লিখে। এর জন্য আমি মনে করি, যে সব শব্দের উচ্চারণ কাছাকাছি, সেসব শব্দ একই বাক্যে পাশাপাশি ব্যবহার করে অনুশীলন করা। যেমন :
আপনার পকেট থেকে কিছু টাকা ‘চুরি’ হয়ে গেছে। আর এদিকে আমার বোনের হাতে ‘চুড়ি’ রয়েছে। তাই ‘চুরি’ ও ‘চুড়ি’র মাঝে বানান বিভ্রাটের সম্ভাবনা বিদ্যমান। সুতরাং এমন শব্দগুলোকে একই বাক্যে ব্যবহার করে অনুশীলন করুন। এবং লিখুন :
গতরাতে আমার বোনের ‘চুড়ি’ ‘চুরি’ হয়ে গেছে।
আমি ‘ঘোড়া’য় চড়ে ঢাকা ‘ঘুরেছি’।
আমরা সবাই ‘ঘুরি’ কিন্তু ‘ঘুড়ি’ আকাশে উড়ে।
নদীর ‘চরে’ পুলিশের এক ‘চর’ আমাকে ‘চড়’ মেরেছে।
‘তোরা’ শহিদ মিনারে ফুলের ‘তোড়া’ দিয়ে আয়।
একজন ‘নারী’ ‘নাড়ির’ টানে বাড়ি ফিরছে।
আমি দশ মিনিটে সুতিয়া নদী ‘পাড়ি’ দিতে ‘পারি’।

এ ধরনের আরো বাক্য তৈরি করে অনুশীলন করুন, ইনশাল্লাহ আপনার বানান শুদ্ধ হতে শুরু করবে।

০৫. অভিধানের সাহায্য নেওয়া :
কোনো শব্দের বানানে সন্দেহ দেখা দিলেই আলসেমি কিংবা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে সঙ্গে সঙ্গে অভিধান দেখুন এবং বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। তবে কিছু শব্দ এমনও আছে যে, বারবার দেখার পরও তা মনে থাকে না। এক্ষেত্রে এজাতীয় শব্দগুলো পেন্সিল বা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করে রাখুন। ফলে প্রতিবার এ শব্দটি চোখে পড়বে এবং ভুল হওয়ার রোগটা সুস্থ হতে থাকবে।

০৬. শব্দের আসল রূপ খুঁজে বের করা :
এটি একটি চমৎকার নিয়ম। বানানে ভুল হবার আশঙ্কা হলে শব্দটা কীভাবে তৈরি হয়েছে, মাথা খেলিয়ে তার আসল রূপ খুঁজে বের করুন। ধরুন, ‘ভূগোল’ শব্দের বিশেষণ প্রায় সবাই লেখে ‘ভৌগলিক’। অথচ এটা ভুল। মূল শব্দের ‘গো’ বিশেষণে ‘গ’ হবে কেন? সুতরাং শুদ্ধভাবে লিখুন- ‘ভৌগোলিক’।

০৭. শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ শিখুন, অন্যথায় এর প্রভাব বানানে গিয়ে পড়বে। যেমন : অনেকেই বলেন, অত্যান্ত, আশ্চার্য, মুখস্ত, ঘনিষ্ট এবং লেখেনও তাই। অথচ শব্দগুলো হবে- অত্যন্ত, আশ্চর্য, মুখস্থ, ঘনিষ্ঠ। তা যথাসম্ভব শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ শিখুন; সম্ভব হলে পূর্ণ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলুন। আঞ্চলিক বলার প্রয়োজন হলেও শব্দের বিশুদ্ধ রূপটি জানা থাকা দরকার।

০৮. কঠিন বানানের তালিকা :
যে বানান বারবার লিখতে গিয়েও ভুল করছেন, এমন কঠিন বানানের একটি তালিকা করে সেগুলো জব্দ করুন। মাঝে মাঝে লিখে এবং বাক্যে প্রয়োগ করে প্র্যাকটিস করুন।

০৯. খুঁটে খুঁটে পড়ার অভ্যাস গড়ুন :
আমরা প্রতিদিনই কিছু না কিছু পড়ি। দৈনিক পত্রিকা থেকে নিয়ে বিলবোর্ড পর্যন্ত। সবকিছু খুঁটে খুঁটে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পঠিত শব্দগুলোর বানানের প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখুন। নিশ্চিত শুদ্ধ হলে ভালো কথা। একটু সন্দেহ হলেই অভিধান কিংবা বিজ্ঞজনের সাহায্যে তা ঠিক করে ফেলুন।

১০. নতুন নতুন শব্দ শেখা :
মানুষ যেমন প্রতিনিয়ত অর্থসঞ্চয়ের ধান্ধায় থাকে; তদ্রূপ শিক্ষার্থীদের উচিত, কোথাও কোনো নতুন শব্দ নজরে পড়লেই তা শুদ্ধভাবে লিখে শিখে নিবে। প্রয়োজনে শব্দের অর্থ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রও আয়ত্ত করবে। কারণ, কোনো শব্দ ভুল শেখা হয়ে গেলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যেতে পারে।

১১. বানানের নিয়মকানুন আয়ত্ত করে মেনে চলা :
একেক শব্দের একে বানান। কিন্তু অধিকাংশ শব্দের বানান-ই কোনো না কোনো নিয়মকানুনের আওতায় পড়ে। তাই সে নিয়মগুলো মেনে চললে নিঃসন্দেহে আপনি বানানে দক্ষ হয়ে উঠবেন। যেমন : ট বর্গের আগে সর্বদা ষ হয়। যথা- মিষ্টি, বৃষ্টি, সৃষ্টি; তবে বিদেশি শব্দে স হবে। সুতরাং লিখুন – স্টোর, স্টেট, টেস্ট, পেস্ট, মাস্টার, পোস্টার, স্টেশন, খ্রিস্টান। কিন্তু ষ দিয়ে লিখবেন না। যদিও আপনার চারপাশে ষ দিয়েই লেখছে মানুষ। এটা ভুল।

১২. বানানের নিয়মকানুন ও ভাষারীতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। সব নিয়ম যে একেবারে কঠিন, তা নয়। স্বীকার করি বাংলা ব্যাকরণ একটু জটিল বিষয়। একটু না ভালোই জটিল। ব্যাকরণ বেশি না জানলেও চলবে; আমি কেবল বানানের নীতিমালা ও ভাষারীতির প্রাথমিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করার কথা বলছি। এ সংক্রান্ত রীতি-নীতি দেখার জন্যে নিম্নের বইগুলোর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে :
০১. ড. হায়াৎ মামুদ : বাংলা লেখার নিয়মকানুন।
০২. ড. হায়াৎ মামুদ : উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা-শিক্ষা।
০৩. ড. হায়াৎ মামুদ ও অন্যান্য : পাঠ্য বইয়ের বানান।
০৪. জ্যোতিভূষণ চাকী : বাংলা ভাষার ব্যাকরণ।
০৫. সুভাষ ভট্টাচার্য : লেখক ও সম্পাদনের অভিধান।
০৬. ড. মাহবুবুল হক : বাংলা বানানের নিয়ম।
০৭. ডক্টর গোলাম সাকলায়েন : একের ভিতরে পাঁচ।
০৮. অশোক মুখোপাধ্যায় : সমার্থশব্দকোষ।
০৯. মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ : এসো কলম মেরামত করি।
১০. মাওলানা যাইনুল আবিদীন : সাহিত্যের ক্লাস।
১১. রতন সিদ্দিকী : প্রমিত বাংলা উচ্চারণ অভিধান।

১৩. অবশেষে বলব, নিয়মতান্ত্রিকভাবে চর্চা ও অনুশীলন না করলে কোনো বস্তুই অর্জন করা মুশকিল। ঠিকভাবে পড়া, আবৃত্তি করা রীতিমতো প্রশিক্ষণের মুখাপেক্ষী। আর ভালো লেখা– সে তো জীবনব্যাপী সাধনার ধন; নইলে লেখক হওয়া এত কঠিন কেন?
তাই আপনি নিয়মিত অধ্যয়ন করুন। উপর্যুক্ত নিয়ম মেনে চলুন। এবং বস্তাপচা লেখা পড়া থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। যে বই বা পত্রিকা বানানে ভুল করে তা পড়া থেকে বিরত থাকুন। হ্যাঁ, আপনি বানানে পারদর্শী হয়ে গেলে তখন যে কোনো বই-ই আপনি পড়তে পারেন। তখন কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ, তা তো আপনি নিজেই ধরতে পারবেন। তাই এখন প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলন। খুব বেশি প্রয়োজন। সবার জন্য, বিশেষত যারা লেখক হতে চায়। কারণ, লেখক হওয়ার প্রথম সোপান ও সিঁড়ি হচ্ছে নির্ভুল বানান।

[বানানচর্চা অবলম্বনে লিখিত]

লেখক : আলেম গবেষক ও ভাষাবিদ

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

প্যান্ডেলের বাইরে সাউন্ড ব্যবহার করা নাজায়েয!

মুহিউদ্দীন কাসেমী: কিছুদিন আগে কী এক কাজে যেন ঢাকায় গেলাম। এশার সময় ট্রেনে ফিরলাম। স্টেশনে ...