বুধবার, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সন্ধ্যা ৭:৫৪
Home / অনুসন্ধান / বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্য আর পাকিস্তানের উদ্বেগ

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্য আর পাকিস্তানের উদ্বেগ

Mustakসিরাজী এম. আর. মোস্তাক ::
১৯৭১ সালে এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। স্বাধীনতার পর এ কথাটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। মাত্র দুই লাখ বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ বছর (২০১৫ সালে) আরো ৪১ জন বীরাঙ্গনা উক্ত তালিকায় যোগ হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এ দুই লাখ তালিকাভুক্ত যোদ্ধা এককভাবে সংগ্রাম করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। অন্য কারো কোনো ভূমিকা বা অবদান নেই। খোদ বঙ্গবন্ধুর নামটিও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই। অর্থাৎ স্বাধীনতা ও বিজয়ে তারও কোনো অবদান নেই। এছাড়া ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি, তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহার নারী, লাখ লাখ শরণার্থী, পাকিস্তানে অবরূদ্ধ লাখ লাখ অসহায় বাঙ্গালি এবং দেশে অবস্থানরত যুদ্ধবিধ্বস্ত কোটি কোটি সংগ্রামী বাঙ্গালি কেউই মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের কারো কোনো অবদান বা আত্মত্যাগ নেই। প্রকৃত সংগ্রামী বা আত্মত্যাগী শুধুমাত্র দুই লাখ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও ৪১ জন বীরাঙ্গনা। এটি সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধার মাঝে বৈষম্য সৃষ্টির হীন চক্রান্ত বিশেষ। পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন বৈষম্যের নজির নেই। কোনো দেশেই শহীদ ও যোদ্ধাদেরকে আলাদাভাবে বিবেচনা বা তালিকা করা হয়না।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাসদস্যরা আত্মসমর্পন করেছিল খোদ ভারতীয় সেনাবহিনীর কাছে। অথচ সে ভারতীয় সেনা সদস্যরাও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বঞ্চিত। অর্থাৎ যে দেশে খোদ স্বাধীনতার স্থপতিকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রাখা হয়, সে দেশের ইতিহাস নিয়ে উদ্বেগ থাকতেই পারে। যে দেশে শহীদ এবং আত্মত্যাগীর সংখ্যা বত্রিশ লাখ অথচ তালিকাভুক্ত যোদ্ধা মাত্র দুই লাখ, এমন বৈষম্যের ইতিহাসের বিপরীতে উদ্বেগ প্রকাশ, অতি স্বাভাবিক বিষয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত বিচার প্রসঙ্গে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার গভীর উদ্বেগ জানিয়ে একটি অনিবার্য্য সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তা হলো, কোনো অপরাধীর বিচারের আগে অবশ্যই ভুক্তভোগী বা আত্মত্যাগীদের স্বীকৃতি দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারীকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তাদের হত্যার বিচার হয়েছে। এটি আদৌ আইন সম্মত নয়। তাই মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে তালিকাভুক্ত রেখে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত বিচার সম্পুর্ণ অন্যায় ও বৈসম্যপূর্ণ হয়েছে। এতে ‘৭১ এর লাখো শহীদদেরকে মুক্তিযোদ্ধার পরিবর্তে বরং যুদ্ধবিরোধী হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে।
১৯৭১ এর বুদ্ধিজীবি হত্যার দায়েও সম্প্রতি একজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এ বিচারটিও বৈষম্যপুর্ণ ছিল। কারণ একথা স্পষ্ট যে, ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ বহু বুদ্ধিজীবি শহীদ হয়েছেন। তাদের স্বীকৃত ঘাতক তথা পাকি সেনাদেরকে ক্ষমা করা হয়েছে। আর যে বুদ্ধিজীবিরা সম্পুর্ণ যুদ্ধকালে শত্রুদের বেতন-ভাতা ভোগ করেছেন, তাদের সহযোগী হিসেবে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশেই ছিলেন, সেসব বুদ্ধিজীবিদের হত্যার বিচার হয়েছে। এ এক আজব ইতিহাস!
এছাড়া আরো আজব হলো, ১৯৭১ এর ১৯ ডিসেম্বর বিজয়ের ঠিক তিনদিন পর প্রকাশ্য দিবালোকে চারজন বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদেরকে চোর হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। ‘৭১ সালে যারা কোর্ট-প্যান্ট-টাই পরেছে, তাদেরকে চোর বলা কতোটুকু মানায়, তা সত্যি উদ্বেগের বিষয় (২০ ডিসেম্বর ‘৭১ পত্রিকা দ্রষ্টব্য)। যার নেতৃত্বে এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, তার বিরূদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে স্বাধীন দেশের প্রথম গ্রেফতারি পরোয়ানাটি জারি হয়েছিল। অথচ সে স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীও পরবর্তীতে খেতাবধারি মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্যের এমন কলুষিত ইতিহাস শুধু উদ্বেগের নয়, তীব্র ঘৃণার বিষয়ও বটে।
তাই বিদেশীদের উদ্বেগের বিপরীতে আমাদের উচিত, বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্য দূর করা। ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকার সর্বপ্রথমে রাখা। একইভাবে সকল শহীদ, আত্মত্যাগী, কষ্টভোগী, শরণার্থী এবং যুদ্ধাক্রান্ত নিরীহ বাঙ্গালী সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করা। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এজন্য তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা সম্পুর্ণ বাতিল করা। বর্তমান ষোল কোটি নাগরিক সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান হিসেবে ঘোষণা করা।

এ্যাডভোকেট, ঢাকা।

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...