শুক্রবার, ১৪ই জুন, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ৯:০৫
Home / খোলা জানালা / জুলুম, কারাগার ও শাহাদাত আমাদের প্রেরণা

জুলুম, কারাগার ও শাহাদাত আমাদের প্রেরণা

Fujail_Komashishaফুজায়েল আহমেদ নাজমুল ::
জালেম আর জুলুম দু’টি আলাদা বিষয়। ইসলামী সমাজ বিপ্লবের নেতা কর্মীরাই বরাবরই মজলুম। জালেমদের জুলুমের শিকার হতে হয় প্রতিনিয়ত। শারিরীকভাবে কখনো আবার মানসিকভাবে কখনো। জালেমের জিন্দানখানায় যেতে হয়। বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে থাকতে হয়। রিমান্ডের নামে অনেক জুলুম সহ্য করতে হয়। ফাসির কাষ্ঠে ঝুলে শেষপর্যন্ত শাহাদাতের পেয়ালা পান করতে হয়। এজন্য ইসলামী সমাজ বিপ্লবের নেতা কর্মীদেরকে যাত্রা পথের শুরুতেই নিজের সংকল্পকে জুলুম নির্যাতন বরদাস্ত করার জন্য আরো শক্তিশালী করে নিতে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সাহায্য কামনা করতে হয়। আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত যে পুরস্কার রয়েছে তা থেকে উত্সাহ উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে হয়। মনকে এটাই সান্তনা দিতে হয় যে, পৃথিবীর সকল দুঃখ কষ্ট জাহান্নামের আগুনের তুলনায় এ পুরষ্কার শান্তির সমতুল্য। তাই মিথ্যা ও বাতিল শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করা যাবে না। জুলুম নির্যাতন সহ্য করা এবং সত্যের ওপর অটল থাকার ব্যাপারে রাসুলে করীম (স:) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনের মধ্যে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে। আল্লাহর সাহায্য সবরের সাথে সম্পৃক্ত এবং দুঃখের সাথে সুখ সম্পৃক্ত।

সত্যের সৈনিকদের উপর জুলুম নির্যাতন আন্দোলনের পথে এক অপরিবর্তিত চিরাচরিত বিধান। এজন্য আজ এগুলো আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, বরং আদিকাল থেকেই এর ধারাবাহিকতা চলে আসছে। হজরত আদম (আ:) থেকে শুরু করে বিশ্বনবী (স:) এর যুগ পর্যন্ত। এমনিভাবে হজরত মুহাম্মদ (স:) যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সর্বযুগেরই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আগামীতেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। কারণ সত্য মিথ্যার লড়াইয়ে জুলুম নির্যাতন থাকবেই। তাই ভয়ে পালিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়লা তার দ্বীন পাঠিয়েছেন যাতে অন্যান্য সমস্ত ধর্ম ও জীবন ব্যবস্থা এবং তাদের মতবাদের উপর বিজয়ী করা যায়। আল্লাহর দ্বীন কারো অধীন থাকতে পারে না। যেমন আল্লাহর বাণী হচ্ছে :- ” তিনি তার রাসুলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে করে সমস্ত জীবন ব্যবস্তার উপর তাকে বিজয়ী করে নিতে পারেন। ” ( সুরা সফ : ০৯ )

সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেও বলা হয়েছে আল কুরআনে –  ” তাদের সাথে লড়াই করো যেন ফেতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। ” (সুরা আনফাল : ৩৯ )

ইসলামকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সকল জুলুম নির্যাতনকে সহ্য করে চলতে হবে। আরাম আয়েশের চিন্তাকে বিজয়ের পুর্বমুহুর্ত পর্যন্ত দুরে সরাতে হবে। ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। ত্যাগ ছাড়া আন্দোলন হয়না, সংগ্রাম হয়না। মঞ্জিলে মকসুদে পৌছার কল্পনাই করা যায় না। মঞ্জিল কিন্তু বহুদূর । এ মঞ্জিলে পৌছতে হলে সত্যের সৈনিকদের চক্ষু আর বক্ষ সামনের দিকে প্রসারিত করে নারায়ে তাকবিরের ধ্বনি দিয়ে সম্মুখপানে এগুতে হবে।

ইসলামী আন্দোলনের পথ হচ্ছে কাটায় ভরা, গুল্ম ছড়ানো, কাকর বিছানো। এখানে ঝুকি নিতে হবে, সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে হবে। বাধা আসবে , নির্যাতন আসবে, মিছিলের সামনে ব্যারিকেট সৃষ্টি করা হবে। বুকের উপর পিস্তল, বন্দুক আরো দেশী বিদেশী অস্ত্র ধরা হবে। অপহরণ করা হবে। গুম করে খুন করা হবে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। জোরপূর্বক বাসা বাড়ী দখল করা হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হবে। দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এসকল বাধাকে উপেক্ষা করে শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জিবীত হয়ে নিজেকে পেশ করতে হবে সংগ্রামী ময়দানে।

জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকার থেকে পৃথিবীর সকল মানুষকে আলোকিত পথে ফিরয়ে আনতে হলে আজই ইসলামী সমাজ বিপ্লবের কর্মীদের লড়তে হবে , সংগ্রাম করতে হবে আপোষহীন ভাবে। যেখানেই অন্যায় হবে, অবিচার হবে, জুলুম হবে, শরীয়ত বিরোধী কাজ সংগঠিত হবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোন জালেমশাহীর সাথে আপোষ করা চলবে না। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যখনই ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীরা অগ্রসর হয়ে পড়ে তখনই বাতিল শক্তি হুঙ্কার আর গর্জন দিয়ে সামনে বাধা হয়ে এসে দাড়ায়। সত্যের সৈনিকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে হিংস্র জানোয়ারের মতো। তারপরও আল্লাহ তায়লা সর্বদা তার সৈনিকদেরকে বাতিল শক্তির উপর বিজয়ী করেছেন।

আম্বীয়ায়ে কেরামদের যুগে হজরত ইব্রাহিম (আ:) হকের দাওয়াত দিতে গিয়ে নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে। হজরত মুসা (আ:) ফেরাউনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। হজরত ঈসা (আ:) বনী ইসরাইলদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। হজরত ইউসুফ (আ:) কারাগারের অন্ধকারে জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (স:) জালেম, তাগুত ও সকল জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম করেছেন। তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হয়েছেন।  ওহুদের ময়দানে দাত মুবারক শহীদ করেছেন। জালেম,ফাসেক শাসক এজিদের বিরুদ্ধে মহানবীর প্রিয়তম দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা:) তিনি ও তার পরিবারের প্রায় সব পুরুষই সত্যের জন্য নিজেদের শির দিয়েছেন। কারবালার প্রান্তরে নির্দয়, পাষান সীমার হুসাইন (রা:) এর মস্তিস্ক দ্বি-খন্ডিত করে হিংস্রতা ও বর্বরতার আশ্রয় নিয়ে তাকে অপমান করে। শেষপর্যন্ত তিনি শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন। হজরত বেলাল (রা:) সত্যকে গ্রহণ করার কারণে তাকে আরব মরুর উত্তপ্ত বালু-পাথরকুচি ও জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর পাথর চাপা দিয়ে শাস্তি দেয়া হতো। তার গলায় রশি লাগিয়ে টানা হেচড়া করা হতো শহরের অলিতে গলিতে। এসব নির্যাতনের পরও তিনি ইসলাম থেকে চুল পরিমাণও সরে যাননি। বরং নির্যাতনের মধ্যে থেকেও চিত্কার করে ‘আহাদ ‘আহাদ’ বলে তাওহীদের ঘোষনা দিতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা:) ছিলেন একজন প্রতিভাধর তরুণ সাহাবী ও প্রখ্যাত মুজাহিদ ফকিহ, তিনি মারওয়ানী শাসকদের অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং একটি সত্যিকার খেলাফত কায়েমের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামেও লিপ্ত ছিলেন। শেষপর্যন্ত তিনি আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের জালেম গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। হজরত জায়েদ ইবনে আলী (রা:) উমাইয়া শাসক হিশাম বিন আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে জেহাদী পতাকা উত্তোলন করেন এবং শেষপর্যন্ত নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম আবুহানিফা (র:) বনী উমাইয়া ও বনু আব্বাসী শাসকদের বিরুদ্ধে ভুমিকা পালন করেছেন। কখনো তাদের সাথে আপোষ করেননি। জোর জবরদস্তি ও অত্যাচার করা সত্বেও তিনি কোন সরকারী পদ গ্রহণ করেননি। এজন্য উমাইয়া আমলে তাকে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত করা হয়েছে। খলিফা মনসুরের আমলে তাকে কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। তবুও তিনি বাতিলের সামনে নতি স্বীকার করেননি। ইমাম মালেক (রঃ) একসময় খলিফা মনসুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। তখন জালেমরা তাকে বেত্রাঘাতের দন্ড প্রদান করে এবং এর ফলে তার কাধের উপর একটি অংশ স্থানচ্যুত হয়ে যায়। তাছাড়াও তাকে নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র:) জালেমদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন। ফলে তাকেও কারাগারে যেতে হয়েছে। শেষপর্যন্ত কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।

পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে আলেম সমাজ অসংখ্য জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে কতটুকু জেহাদী ভুমিকা রেখেছিলেন ইতিহাস তার জ্বলন্ত প্রমান। ১৬০১ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজরা ব্যবসার নাম নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করে। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তারা দেড়শত বছরের অধিককাল পর্যন্ত রাজত্ব চালায়। মানুষদের শোষণ করে। একসময় তারা ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। তখন ইংরেজদের করতলে দেশ ছিল অবরুদ্ধ। জাতি ছিল বৃটিশ আগ্রাসনে নিস্পেষিত। সকল মজলুমদের এক অভিন্ন আহাজারী ছিল বৃটিশ বেনিয়াদের শাসক নামের শোষণ থেকে কবে মুক্তি পাবো। দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে উলামায়ে কেরাম তথা ইসলামী আন্দোলনের অগ্রসৈনিকেরা ইসলামের শত্রু ইংরেজদের মোকাবেলার জন্য ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েন। এ অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে অসংখ্য সৈনিকদের চরম জুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আল্লাহর সৈনিকদের অন্যায় ভাবে গ্রেফতার করে কারাগারে ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। প্রায় ত্রিশ হাজার আলেমদেরকে গাছের ডালে ঝুলিয়ে ফাসি দেয়া হয়েছে। হজরত সায়্যেদ আহমদ শহীদ (রঃ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে ১ লা মে রাত্রে বালাকোট পাহাড়ে তার বাহিনী নিয়ে অবস্থান করেন। উক্ত এলাকায় এক বিশ্বাসঘাতক সম্প্রদায় ছিল রাজা রনজিত সিং এর সহায়ক। তারা সি.আই.ডি.হয়ে গোপনে সংবাদ পৌছিয়ে দেয় রাজার নিকট। ফলে রাজার বাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় রাত্রিতে সায়্যেদ আহমদ (রঃ) এর উপর আক্রমন চালিয়ে বসে। মে মাসের পাচ তারিখে তাকে তার ইবাদত গৃহে তাহাজ্জুদের নামাজের সময় সেজদারত অবস্থায় শহীদ করে দেয়া হয়। ঐ দিনেই শাহ ইসমাইল শহীদ (রঃ ) বাতিলের মোকাবেলার জন্য ময়দানে অবতরণ করেন। প্রচন্ড লড়াইয়ের পর তাকেও গর্দান দিতে হলো তরবারীর নিচে। শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে মাওলার দরবারে চলে যান তিনি। এসকল ইতিহাস আজ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণা যোগাচ্ছে। শহীদদের শাহাদাত শত শত অনলবর্ষী বক্তার বক্তৃতার চেয়েও অন্তরে অধিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। শাহাদাত ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য পথের সম্বল ও পাথেও। আমরা যখন জীবন চরিত পাঠ করি তখন তাদের শাহাদাত লাভের শত শত বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাবার পরও আমাদের অন্তরে এক অসাধারণ ঈমানী প্রেরণা জেগে উঠে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...