শুক্রবার, ১৪ই জুন, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১০:২৫
Home / কওমি অঙ্গন / অজানা দেওবন্দ ১২

অজানা দেওবন্দ ১২

মুহাম্মাদ নাজমুল ইসলাম :

রাসূলের দেয়া পাচরুপি এবং মাসলাকে দেওবন্দ!

দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়াতই হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের একমাত্র খালিস প্লাটফর্ম ও মুখপত্র। যেখান থেকে সমগ্র দুনিয়ার কোনায় কোনায় নির্ভেজাল ইলম সরবরাহ করা হচ্ছে। যার আলোয় দিকহারা জাতি আজ আলোকিত। যার বাড়াবাড়ি ছড়াছড়িহীন মতাদর্শ মিল্লাতে মুলিমার কাছে গ্রহণীয় এবং অনুসরণীয়।

আরো স্পষ্ট করে যদি বলতে যাই তাহলে বলবো দেওবন্দের শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররীসীন মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী এর ভাষায়, কোন বিষয়কে দলীলসহ গ্রহণ করার নামই হলো দেওবন্দ ও মাসলাকে দেওবন্দিয়্যাত। কালের আবর্তনে, রঙ্গের চমকে এবং হুজুগের স্রোতে মাসলাকে দেওবন্দ ভাসে না। কুরআন হাদীসের সারমর্ম যে পথই দেখায় এবং স্পষ্ট করে দেয় সেটাই দেওবন্দ গ্রহণ করে।

এবার চলুন প্রেক্টিকেলি একটা ঘটনার মাধ্যমে মাসলাকে দেওবন্দকে বুঝে নেই।

আজ থেকে প্রায় দিন অনেকদিন পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো দেওবন্দের শতবার্ষিকী মহাসম্মেলন।
কিন্তু এ সম্মেলনের গোড়ায়ও রয়েছে অসাধারণ শিক্ষণীয় এক কাহিনী, যেটা আজ আমাদের মাসলাকে দেওবন্দকে সহজ করে বুঝিয়ে দেবে। চলুন জানা যাক তা কী।

অনুষ্ঠিত হবে শতবার্ষিকী মহাসম্মেলন। সে হিসেবে প্রস্তুতিটাও নেওয়া ছিলো, যেহেতু অনেক বড় ব্যাপার। তাই ছয় মাস আগ থেকেই আসাতিজায়ে কেরামরা চাঁদা কালেকশন’এর জন্য পুরো হিন্দুস্তান ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেন। দিনভর চাঁদা কালেকশন করে আইসা আবার যেটুকু সময় পেতেন দরস দিতেন। এভাবেই চলে যায় ছয়মাস। এবার আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি।

এরই মাঝে সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেরদিন মাদরাসায় উপস্থিত হলেন এক মেহমান। যিনি হাকীমুল উম্মাত হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহ.’র আজাল্লে খলিফা শাহ ওসিউল্লাহ সাহেব’র অন্যতম এক খলিফা।

সবার মতো তিনিও দারুল উলূমের গেস্ট হাউসে রাত থাকলেন। মাশাআল্লাহ! মেহমান খুব আমলী ছিলেন। তাহাজ্জুদগুযার তো ছিলেনই। সেদিনও তিনি তাহাজ্জুদ’র নামাজ পড়ে ফজরের নামাজও আদায় করে জায়নামাযে বসলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি কিছু ঘুম এবং কিছু জাগ্রত এমতাবস্থায় স্বপ্নে দেখলেন আল্লাহর রাসূল সা.কে। আল্লাহর রাসূল সা.তাকে বলছেন, এই নাও পাঁচ রুপি। এত্থেকে এক রুপি দিবা মাওলানা যাকারীরা কান্ধলবীকে; এক রুপি দিবা আলী আহসান নদভীকে; এক রুপি দিবা ক্বারী তায়্যিবকে, এক রুপি তুমি নিবা আর আরেক রুপি আমার পক্ষ থেকে দারুল উলূমের সদসালা সম্মেলনে দিবা।

তিনি স্বপ্ন থেকে স্বাভাবিক হওয়ার পর হাতে পাচ রুপি পেলেন। তিনি হুজুরের কথানুযায়ী চার রুপি চারজনকে দিয়ে এক রুপি নিয়ে ক্বারী তায়্যিব সাহেব’র কাছে গেলেন। গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বলে উনার রুপি উনার কাছে হস্তান্তর করে সদসালা সম্মেলন’র রুপিটিও তার কাছে দিলেন। তিনি তা গ্রহণ করে বললেন আপাতত তা আপনার কাছে রাখেন কাল সবার সামনে পূর্ণ ঘটনা বলে হস্তান্তর করবেন।

আসলো পরদিন। সদসালা সম্মেলন’র সার্বিক শৃঙ্খলা ঠিক করার জন্য দারুল উলূমের পুরাতন দারুল হাদীস এর দরসগাহে ক্বারী তায়্যিব সাহেব মেহমানকে মঞ্চে আসার আহ্বান জানিয়ে বললেন। এখন আপনি সবার সামনে আপনার সাথে ঘটা পূর্ণ ঘটনাটি বলেন। তিনি আগের মতো সবার সামনে পূৃর্ণ ঘটনা বলে সাদসালা সম্মেলন দেয়া রাসূলের এক রুপিয়া ক্বারী তায়্যিব সাহেব’র কাছে হস্তান্তর করলেন।

যাইহোক, এভাবেই সেদিনের যুহর কাটলো। যুহর পর সাধারণত সকল ছাত্র বিভিন্ন উস্তাদের মজলিসে উপস্থিত হয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের সমাধান জানে। এবং উক্ত মজলিসে সাধারণত হজরতগণ অনেক খাছ খাছ বয়ান করেন।
আসরের আযান হলো। অন্যদিনের ন্যায় এইদিনও ছাত্ররা উস্তাদদের বিভিন্ন মাজলিসে উপস্থিত হলো। ছাত্ররা প্রতিদিনের ন্যায় মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী হজরতের মজলিসেও উপস্থিত হলো। কিছু ছাত্র হজরতকে এ ঘটনা শোনালো।
উল্লেখ্য যে, হজরত এ ঘটনা জানতেন না। যেহেতু তিনি মাদরাসার বাইরে ছিলেন চাঁদার কাজে। হজরত শুনে তো একদম থ হয়ে গেলেন। কাউকে কিছু না বলে সারারাত এ বিষয়ের উপর মুতালা’আ করলেন। বাস্তবেই কি অতীতে এরকম ঘটনা ঘটেছে কি না!
পরদিন সোজা চলে আসলেন ক্বারী তায়্যিব সাহেব রাহ’র এর নিকট।
এসে বললেন!
হজরত আমি তো এরকম একটা ঘটনা ছাত্রদের মুখ থেকে শুনলাম। কিন্তু ছাত্রদের কথা তো! আমি পুরা বিশ্বাস করিনি। অনুগ্রহ করে যদি আপনি পূর্ণ ঘটনাটা শোনান!
ক্বারী তায়্যিব সাহেব পুরা ঘটনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শোনালেন। শোনার পর পালনপুরী সাহেব ক্বারী তায়্যিব সাহেবকে বললেন:
আমি ঘটনাটা শোনার পর সারারাত কিতাবাদী ঘাটাঘাটি করলাম। কিন্তু আজ অবধি এরকম কোনো ঘটনা (আলমে গাইব থেকে আলমে যমীনে কোন মাহসুস বস্তু এসেছে) তা তো পাইনি।

এছাড়াও যদি মেনে নেই যে ঠিকই আল্লাহর রাসূল সা. দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন তো দুটো থেকেই যায়। ১. যে টাকা মেহমান দিয়েছেন তা রুপি। যেখানে ছবি অঙ্কিত। আল্লাহর রাসূল তো ছবিকে হারাম বলেছেন! ২. রুপি আল্লাহর রাসূল পাবেন  কেমনে?
তাহলে একথা মানতেই হবে, নিশ্চয় তিনি হিন্দুস্তানের কারো পকেট থেনে রুপি অনুমতি ছাড়া নিয়েছেন। আর এটা তো চুরি..!?

ক্বারী তায়্যিব সাহেব এবার কিছুটা থমকে গেলেন। ভাবলেন। বললেন, আসলেই তো! চিন্তার বিষয়!
এ বলে তিনি তৎক্ষণাৎ ঘণ্টা বাজিয়ে দফতরে সকল আসাতিজায়ে কেরামকে একিত্রত করলেন। সবাই যখন একিত্রত হলেন, তখন তিনি পালনপুরী সাহেবকে বললেন, এবার আপনি আপনার বক্তব্য সবার সামনে উপস্থাপন করুন। পালনপুরী সাহেব সবার সামনে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন কলেন। শোনার পর সবাই-ই  তো থমকে গেলেন। বাস্তবই তো!
এবার সবাই এ কথার উপর ইত্তেফাক হলেন যে! মেহমান রাসূলকে যদি বাস্তবেই স্বপ্নে দেখেন তাহলে তা সত্য। যেহেতু রাসূল সা. বলেছেন, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে সে আমাকেই দেখবে কারণ শয়তান আমার আকৃতির রূপ ধারণ করতে পারবে না”। কিন্তু টাকার যে বিষয়টা এটার বাস্তবতা নেই। শয়তানের ওয়াসওয়াসা।

এই বলে সিদ্ধান্ত হলো যে, সবাই এখনি প্রত্যেকের দরসে গিয়ে সকল ছাত্রের সামনে বিষয়টি পরিপূর্ণ স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য। তারপর বিষয়টি এখানেই সমাপ্ত হয়ে গেলো।

(সুত্র:মাওলানা আমিন পালনপুরী দা.বা.)

পুনশ্চ :
হজরত ঘটনাটি এই প্রসঙ্গে বলেন যে, যদি ঘটনাটি আমলে নিয়ে নেয়া হতো তাহলে আজ যে কেউ নিজেকে পীর বানানোর জন্য এরকম হাজারো ঘটনা বানিয়ে বলতো। আর তা মানতেই হতো। অথচ ইতিহাসে এরকম ঘটনার কোনো অস্থিত্ব নেই।
যেটা আজ বিভিন্ন ভ্রান্তবাদীরা অহরহ করেই যাচ্ছে। নিশ্চয় এই ঘটনাটা উলামায়ে দেওবন্দের জন্য এক চমক। এরকম ঘটনা না ঘটলে হয়তো সামনে অনেক বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো। এরম মাসাআলা সামনে আসলে কখনো সমাধানে পৌছা যেতো না।

লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলূম দেওবন্দ

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

কওমি মাদরাসা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ

খতিব তাজুল ইসলাম ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তাঃ কওমি অংগন একটি স্বীকৃত ও তৃণমূল প্লাটফর্ম। দেশ ও জাতির ...