রবিবার, ১৯শে মে, ২০২৪ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ৮:৩৩
Home / প্রবন্ধ-নিবন্ধ / রোহিঙ্গা নির্মূলে নেমেছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা নির্মূলে নেমেছে মিয়ানমার

আলী ইমাম মজুমদার:

সম্প্রতি রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে শিরোনামের বাক্যটি ব্যবহার করেন সংস্থাটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এমনিতর হাজারো প্রতিক্রিয়া রয়েছে এ বিষয়ে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার একটি বিশ্লেষণ অনুসারে মিয়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা এমন একটি জনগোষ্ঠী, যাদের সে দেশ নাগরিক বলে স্বীকার করে না। তাদের বিয়ে, ধর্মের বিধানাবলি অনুসরণ এবং শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনেক বাধা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মিয়ানমারবাসী রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সে নিপীড়ন চলমান। সময়ে সময়ে কিছুটা কমে। তবে ইদানীং মনে হয় এর মাত্রা চরমে পৌঁছেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামক একটি মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুসারে, গত ছয়–সাত সপ্তাহে সেখানে রোহিঙ্গাদের ১ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাঝে গত সপ্তাহেই আট শতাধিক। সে দেশটির রাখাইন রাজ্যে এখনো ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে। তারা মুসলমান ধর্মাবলম্বী। বিভিন্ন তথ্যানুসারে বহুকাল আগে থেকেই বসবাস করছে সে অঞ্চলটিতে। কিন্তু মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়েই রোহিঙ্গা বিতাড়নের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিতে থাকে। সফলও হয়েছে অনেকাংশে। তারা ঠাঁই নিয়েছে বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ, সৌদি আরবে ৪ লাখ, পাকিস্তানে ২ লাখ, থাইল্যান্ডে ১ লাখসহ আরও অনেক দেশে। ১৯৮২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়।

হাল আমলের চিত্র হচ্ছে, বিদ্রোহ নির্মূল কার্যক্রম পরিচালনার নামে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান পরিচালনা। আল-জাজিরার একটি খবর অনুসারে, নিহতের সংখ্যা শতাধিক। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে প্রায় এক লাখ। প্রাণের ভয়ে পালানো লোকগুলো ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। আমাদের এ জনবহুল দেশটি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ বহনে সম্পূর্ণ অক্ষম। তাই নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্ত বন্ধ করেছে। ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের নৌকা। তাও কিছু কিছু ঢুকে পড়েছে এমনটাই জানা যায়। এমনকি চীনে চলে গেছে হাজার তিনেক। নাফ নদীতে নৌকায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভেসে বেড়াচ্ছে।

কিছুদিন আগে মিয়ানমারের একটি সীমান্ত ফাঁড়িতে কিছু সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীর হামলায় কয়েকজন সীমান্তরক্ষী নিহত হন। ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। মিয়ানমার বলছে, রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গ্রুপ এমনটা করতে পারে। তবে হামলা পরিচালনাকারীরা যাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে এ দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যাপ্ত ও দৃঢ় ব্যবস্থা নেয়। এ ধরনের দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা সম্পর্কে কোনো ভিন্নমত থাকতে পারে না। তবে তা করতে লাখ খানেক লোককে আশ্রয়হীন করা, সহস্রাধিক বাড়িঘর জ্বালানো, শতাধিক লোককে হত্যা কি যৌক্তিক বলা যায়? আর ব্যাপারটি এবারেই ঘটছে, এমন তো নয়। এটা তো রাখাইন রাজ্যের শাসন সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। ২০১২ সালে এ ধরনের একটি বিধ্বংসী হামলার শিকার হওয়ায় বহু রোহিঙ্গা জীবন বাজি রেখে মাছ ধরার নৌকায় পাড়ি দিয়েছে ভিনদেশে। কারও-বা ঘটেছে সলিলসমাধি আর কারও ভাগ্যে জুটেছে দীর্ঘ কারাবাস। অবশ্য ভাগ্যবান কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ও পেয়ে গেছেন।

মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আশায় বুক বেঁধেছিল রোহিঙ্গারা। ভেবেছিল মানবতার দাবিকে তারা উপেক্ষা করবে না। ক্ষমতাসীন দলটির নেতা ও সরকারের মুখ্য ভূমিকা পালনকারী অং সান সু চি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। জীবনভর সংগ্রাম করেছেন গণতন্ত্রের জন্য। স্বাভাবিকভাবেই তিনি তাঁর দেশের এ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বেদনা উপশমে কিছুটা হলেও অবদান রাখবেন, এমন আশা ছিল। তবে দেশটির ক্ষমতাকাঠামোয় এখনো সামরিক বাহিনী অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। মনে হচ্ছে বেসামরিক নেতৃত্বের অবস্থান প্রান্তিক পর্যায়ে। তা সত্ত্বেও নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে তো তাঁরা বলীয়ান। কিন্তু আমরা হতাশ হলাম। দেখছি বর্তমান সরকারও আগের মতোই রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক মনে করে না।

তবে পশ্চিমা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দাবিকেও তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। জাতিসংঘের সাবেক নন্দিত মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠন করলেন একটি কমিশন। কমিশন বৈঠকে বসল ইয়াঙ্গুনে। প্রথমবারের মতো ঘুরে দেখে গেলেন রাখাইন রাজ্যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। আরও অনেক কিছু করার পরিকল্পনা আছে তাঁদের। আর এর মাঝেই ঘটে গেল বিপত্তি। দুর্গত ব্যক্তিদের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদেরও যেতে দিচ্ছে না। গণমাধ্যমকেও নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের নিজস্ব গোপন সূত্রের ওপর। আর এর ভিত্তিতেই তারা সোচ্চার এ অমানবিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন দেশও ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে চলছে। জাতিসংঘ ও ওআইসি প্রকাশ করেছে উদ্বেগ। তবে মিয়ানমার কোনো তোয়াক্কা করছে না এসব প্রতিবাদের।

সমস্যাটি শুধু মিয়ানমারে হলে আমরা হয়তো এতটা উদ্বিগ্ন হতাম না। সে দেশের অভ্যন্তরের ঘটনার জের পোহাতে হচ্ছে আমাদের। এ দেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখে। একদিকে যেমন তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বেশ কিছু আবার ঢুকেও পড়ছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করেছিলাম কয়েকবার। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় ১৯৭৪ আর ১৯৭৯ সালে দুই দফায় শিবিরে বসবাসকারীরা ফিরে গেছেন নিজ দেশ মিয়ানমারে। তবে ১৯৯২ সালে আসা শরণার্থীদের প্রায় ৫০ হাজার এখনো শিবিরেই রয়ে গেছে। এ ছাড়া অনিবন্ধিত শরণার্থীরা তো আছেই। এটা আমাদের মতো সমস্যাসংকুল জনবহুল দেশের জন্য বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে আমাদের সরকারের প্রতিক্রিয়া দেরি হলেও যথোচিত। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে এনে আমাদের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদেরও আমন্ত্রণ করে এ সমস্যা সমাধানে বৈশ্বিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি মিয়ানমারে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূতকে সে দেশের প্রেসিডেন্ট এবং অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানোর জন্য বলা যায়। তিনি উপদ্রুত অঞ্চল ঘুরে দেখতেও সে দেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাতে পারেন। আমাদের দেশে তো কোথাও সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ হলে ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতেরা অকুস্থল পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। রোহিঙ্গা সমস্যাটি স্থানীয় গণমাধ্যম যথাসাধ্য গুরুত্ব দিয়ে সবার নজরে আনছে। তবে সুশীল সমাজের এখানে আরও সোচ্চার হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। আমাদের দেশের অভ্যন্তরে এ রকম কিছু ঘটলে এ সংগঠনগুলো তা করে এবং করাটাই সংগত। ঠিক তেমনি যে সংঘাতের উত্তাল ঢেউ আমাদের তীরে এসে ধাক্কা দিচ্ছে, সেটাকে আমাদের সমস্যা বলে বিবেচনা করা শ্রেয়। এটা শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।

মিয়ানমারে জাতিগত সংঘাত নতুন নয়। রাখাইন সম্প্রদায়ের যে লোকগুলো আমাদের দেশের কক্সবাজার ও পটুয়াখালী অঞ্চলে বসবাস করেন, তাঁরাও সে রাজ্যের জাতিগত সংঘাতের শিকার হয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে সংখ্যায় খুবই কম। ছোটখাটো কোনো বিপত্তি ঘটলেও সংগঠিত কোনো নিষ্ঠুরতার শিকার হন না তাঁরা। বরং তাঁদের মাঝ থেকেই একাধিকবার সংরক্ষিত মহিলা আসনে সাংসদ নির্বাচিত করে ক্ষমতার বলয়ে আনা হয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা ছাড়াও আরও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বর্মিরা ৬৮ শতাংশ। তারা এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। আর তা করতে গিয়েই সংঘাত লেগে আছে কাচিন, কারেন, সান ও ওয়া গোত্রের লোকদের সঙ্গে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এ রকম আছে। তবে সমঝোতার পথে না গিয়ে সংঘাত বেছে নিলে এর টেকসই সমাধান হয় না। মিয়ানমারের আগের শাসকেরা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলো সমাধানে সচেষ্ট ছিলেন। নির্বাচিত সরকারকাঠামোয় এমনটা ঘটা অযাচিত। দুর্ভাগ্য যে মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের চোরাবালিতে বারবার পা দিচ্ছে। দেশটি দীর্ঘকাল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে ছিল। প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী দেশটিতে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় হতদরিদ্রের সংখ্যা ২৬ শতাংশ। মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশটির অবস্থান বেশ পেছনে। গণতান্ত্রিক আবহাওয়ায় পরিস্থিতি বিপরীতমুখী হতে চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে একটি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার প্রয়াস তা ব্যাহত করতে বাধ্য। আর অস্থিতিশীল করবে প্রতিবেশী বাংলাদেশকেও। আমরা আশা করব, সে দেশের নির্বাচিত নেতারা এ বিভ্রান্তি থেকে পিছু হটবেন। তাঁদেরই গঠিত কমিশনকে সুযোগ দেবেন কাজ করার। তার আগে থামাতে হবে আলোচিত সন্ত্রাস। পুনর্বাসিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে রোহিঙ্গাদের।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

majumder234@yahoo.com

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

বিকৃত যৌনতায় দিশেহারা জাতি: সমাধান কোন পথে?

শাইখ মিজানুর রাহমান আজহারী: বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হচ্ছে। নারীকে বিবস্ত্র করা ...