শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৫:৪৩
Home / অর্থনীতি / জাকাত : ধনীদের সম্পদে গরিবের হক

জাকাত : ধনীদের সম্পদে গরিবের হক

0000

অনেকে মনে করেন, জাকাত শুধু ফকির-মিসকিনকে দিতে হবে। অথচ আত্মীয়স্বজন যদি গরিব হয়, তারা আপনার জাকাত পাওয়ার অধিক হকদার। আপনি যাদের সূত্রে জন্ম নিয়েছেন বা আপনার সূত্রে যারা জন্ম নিয়েছে অর্থাৎ মা, বাবা, দাদা-দাদি কিংবা ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি ছাড়া অন্য যে কোনো নিকট বা দূরের আত্মীয়কে উপযুক্ত হলে জাকাতের টাকা পৌঁছে দিলে সওয়াবের পরিমাণ বেশি হবে

জাকাত কি গরিবদের প্রতি ধনী লোকদের অনুগ্রহ ও দান, নাকি ধনীদের কাছে গরিবদের প্রাপ্য হকÑ এটি দার্শনিক প্রশ্ন। যারা ধর্ম মানে না বা ধর্মের প্রতি উদাসীন তারা বলতে পারে, আমাদের অর্জিত সম্পদে শতকরা আড়াইভাগ হারে গরিবদের জন্য ভাগ বসানো নিশ্চয়ই অন্যায়। আরবের মোশরেক-কাফেররা এর চেয়েও ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় মোমিনদের যে দার্শনিক যুক্তি দেখিয়েছিল, কোরআন মজিদে সূরা ইয়াসিনে তার রেকর্ড রয়েছে।
‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে যাদের খাওয়াতে পারতেন তাদের আমরা কেন খাওয়াবÑ এ তো চরম বোকামি। আসলে তোমরা স্পষ্ট গোমরাহিতে নিমজ্জিত।’ (সূরা ইয়াসিন : ৪৭)।
কোরআন মজিদ এ যুক্তি ও দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহপাক স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন। ‘ধনীদের সম্পদে সওয়ালকারী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’ (সূরা আজ জারিয়াত : ৫১:১৯)।
সমাজে কোনো মানুষ একাকী যেমন বসবাস করতে পারে না, তেমনি একাকী সম্পদশালী হওয়াও অসম্ভব। জীবনযাপনের প্রয়োজনে আমরা প্রত্যেকে সমাজের নানা শ্রেণীর সাহায্য নিতে বাধ্য। তাঁতি, দর্জি, ধোপা থেকে নিয়ে পরিবহন শ্রমিক, কৃষক, মজুর, প্রত্যেকের সর্বতোমুখী চেষ্টায় সমাজ চলে, অর্থনীতির চাকা ঘুরে। ফলে মনের অজান্তেই একজনের হক ও দাবি আরেক জনের ওপর বর্তায়। সমাজের সম্মিলিত প্রয়াসে যখন দেখা যায়, একজন বা একটি শ্রেণীর কাছে অনেক সম্পদ জমা হয়েছে আর একটি শ্রেণী হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়েছে, তখন বুঝতে হবে, পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত শ্রেণীর প্রাপ্য হক যথাযথ আদায় হয়নি, যা ধনীর কাছে গিয়ে জমা হয়েছে। যার ফলে জীবন বাঁচানোর জন্য সে সওয়াল করে অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য বা বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন পিছিয়ে পড়া লোকদের কি পরিমাণ সম্পদ ধনীর কাছে জমা হয়েছে বা কত পরিমাণ সম্পদ গরিব শ্রেণীর কাছে ফেরত দিলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হবে বা এ কাজটি কীভাবে সম্পাদন করা হবে, সে তথ্য দুনিয়ার দার্শনিকদের কাছে নেই। তাই স্বয়ং আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসুল (সা.) এ হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন শতকরা আড়াই ভাগ হারে।
জাকাতের শাব্দিক অর্থ পবিত্রতা। অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসুল (সা.) নির্ধারিত হারে অর্থ দান করলে প্রথমেই ধনীর মনের লোভ মোহ নাস্তনাবুদ হয়ে যাবে। এ লোভ-মোহই দুনিয়াতে অধিকাংশ অনর্থের মূল। তাদের লোভ-মোহ মুক্ত করার জন্য জাকাতের চেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার আর কিছু হতে পারে না। তাই জাকাত ধনীর অন্তরকে লোভ-মোহমুক্ত পরিচ্ছন্ন করে। অন্যদিকে জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে। কীভাবে? সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে দু’একজন যখন বিরাট অর্থবিত্তের মালিক হয়; তখন স্বভাবতই তাদের সম্পদের প্রতি গরিব ও বঞ্চিত মানুষের ঈর্ষা জাগে। হিংসার আগুন জ্বলে উঠে। কিন্তু যখন ধনীলোক বছর শেষে হিসাব করে আল্লাহর হুকুম পালনার্থে জাকাত দিয়ে দেয়। তখন ধনীর প্রতি গরিবের ঈর্ষা-লোভ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পরিবর্তিত হয়। দেখা যায়, এ গরিবরাই এমন ধনীর সম্পদের পাহারা দেয়। এভাবেই জাকাত ধনীর মন ও ধনকে পবিত্র করে।
রমজানে জাকাতের প্রসঙ্গ এলে অনেক সম্পদশালী লোক আতঙ্কে ভোগেন। কারণ মনে করেন যে এত গাড়িবাড়ি, দোকান-কারখানা সবকিছুর মূল্য হিসাব করে জাকাত দিতে হলে তো ফতুর হয়ে যেতে হবে। আসলে জাকাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে এমন ধারণা জন্মায়। অন্যথায় হিসাব করলে দেখা যাবে, অনেকের ওপর জাকাত ফরজ হয়নি। হলেও তার পরিমাণ বেশি নয়। যেমন নিজের ঘর, ভাড়া দেয়ার বাড়ি, গাড়ি, ঘরের আসবাবপত্র, দোকানের ফার্নিচার, কলকারখানার যন্ত্রপাতি যত দামিই হোক, জাকাত দিতে হবে না। জাকাত দিতে হবে জমা টাকা, সোনা-রুপা, ব্যবসার পণ্যসামগ্রী ও চলতি মূলধনের ওপর, তাও লোন থাকলে সে পরিমাণ বিয়োগ দিয়ে যা এক বছরকাল স্থায়ী থাকে, তার ওপরে।
এক বন্ধু বললেন, এসব কথা বললে ঢাকা শহরের অধিকাংশ লোকের তো জাকাত আসবে না। কারণ, প্রত্যেকে তো বাড়ি করা বা কলকারখানার জন্য বিরাট অঙ্কের লোন নেন। বললাম, হিসাব করে প্রয়োজন হলে ধনীদেরই গরিবের খাতায় এনে জাকাত দেবেন। আপত্তি কোথায়? তবুও সবাই আল্লাহকে ভয় করে নিজের সম্পদের প্রকৃত জাকাতটুকু বের করে দিলে দেখবেন সমাজের চেহারা বদলে যাবে।
তবে লোনের ব্যাপারে একটি কথা হচ্ছে, মানুষ একান্ত দায়ে ঠেকলে লোন নেয়Ñ এটিই ছিল মানব সমাজের চিরাচরিত নিয়ম। কাজেই লোন অভাবের প্রতীক এবং এ কারণে জাকাতযোগ্য মাল থেকে লোনের পরিমাণ বাদ যাবে, এটিই শরিয়তের বিধান। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় লোন নেয় শখের বশে, ব্যবসার খাতে, দায়ে ঠেকে নয়। সরকারি আয়কর থেকে বাঁচার জন্য মোটা অঙ্কের ব্যাংক লোন নিয়ে জমি কিনে, বাড়ি করে, গাড়ি কিনে, ব্যবসা পাতে, শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ করে। এ বাড়ি, গাড়ি, জমি, কারখানা তো জাকাতের আওতায় আসে না। এখন যদি এসবের বরাতে নেয়া লোন জাকাতযোগ্য মালের হিসাব থেকে বাদ দেয়া হয় তাহলে তো ধনীদের উল্টো জাকাত দিতে হবে। শখের বা ব্যবসায়িক লোন সম্পর্কিত এ জটিল মাসআলায় আমার ক্ষুদ্র মত হচ্ছে, যে সম্পদের বরাতে ব্যাংক লোন নেয়া হয়েছে, তার বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে লোনের যোগ-বিয়োগ হিসাব করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, এক ব্যক্তির জাকাতযোগ্য মাল আছে ১ কোটি টাকার। তিনি নতুন কারখানার জন্য ২ কোটি টাকা লোন নিলেন। জাকাতযোগ্য মালের হিসাব থেকে সেই লোনের টাকা বাদ যাবে না; বরং হিসাব হবে আলাদা। কারখানার বর্তমান বাজারমূল্য ও লোনের টাকা সমন্বয় করার পর যদি লোনের পরিমাণ বেশি প্রতীয়মান হয়, তবেই তা জাকাতযোগ্য মালের হিসাব থেকে বাদ যাবে, অন্যথায় নয়।
গাড়ি যখন নিজে ব্যবহার করে বা ভাড়ায় খাটায় তখন জাকাতযোগ্য মাল হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু যখন গাড়ি কেনাবেচার ব্যবসা করে, তখন গাড়ি পণ্য হিসেবে গণ্য হবে এবং জাকাতের আওতায় এসে যাবে। যারা জমি কেনাবেচার ব্যবসা করে তাদেরও জমি পণ্য হিসেবে জাকাতযোগ্য মাল বলে গণ্য করতে হবে।
অনেকে মনে করেন, জাকাত শুধু ফকির-মিসকিনকে দিতে হবে। অথচ আত্মীয়স্বজন যদি গরিব হয়, তারা আপনার জাকাত পাওয়ার অধিক হকদার। আপনি যাদের সূত্রে জন্ম নিয়েছেন বা আপনার সূত্রে যারা জন্ম নিয়েছে অর্থাৎ মা, বাবা, দাদা-দাদি কিংবা ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি ছাড়া অন্য যে কোনো নিকট বা দূরের আত্মীয়কে উপযুক্ত হলে জাকাতের টাকা পৌঁছে দিলে সওয়াবের পরিমাণ বেশি হবে। কারণ তাতে আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জাকাত দেয়ার সময় শর্ত হলো, যাকে জাকাত দেবেন তিনি জাকাত গ্রহণ করার উপযুক্ত কিনা দেখা। যেসব আত্মীয় সংসারে টানাপড়েনে আছেন এবং ব্যাংকে বা কোথাও টাকা জমা রেখে মুনাফা খাচ্ছেন না, তারা আপনার জাকাত পেতে পারেন। তাদের জাকাত দেয়ার সময় জাকাতের টাকা বলে দেয়া শর্ত নয়। মুখে না বললে বরং তাদের মন রক্ষা হবে, সওয়াব বেশি হবে। বলতে পারেন ঈদের হাদিয়া। তবে মনে রাখতে হবে, এর পেছনে যেন অন্য উদ্দেশ্য না থাকে। কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বোনাস-বখশিশ তাদের পাওনা হক। এ খাতে জাকাতের টাকা দিলে জাকাত আদায় হবে না। এগুলো আদায় করার পর তাদের জাকাত দিতে পারেন। সূত্র. আলোকিত বাংলাদেশ।

About Abul Kalam Azad

এটাও পড়তে পারেন

প্রশ্নপত্র ফাঁস সমাচার, বেফাক ও হাইয়ার দ্বায়!

খতিব তাজুল ইসলাম: কলামের শুরু এবং শেষ নিয়ে বেশ বিব্রতে আছি। পুরাটাই আগুছালো অবস্থা। স্বকীয়তার ...