বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ৯:৫৪
Home / কওমি অঙ্গন / চেতনায় কওমী মাদরাসার মতবিনিময় সভা : আমার অনুভূতি

চেতনায় কওমী মাদরাসার মতবিনিময় সভা : আমার অনুভূতি

এহতেশামুল হক ক্বাসিমী ::

%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a7%9fএক.
একসময় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। একদিকে দারস- তাদরীসের চাপ। কারণ মাদরাসার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা অত্যাসন্ন। নেসাব পর্যন্ত পড়ানো একাডেমিক কর্তব্য। অপরদিকে আমাদের কওমী অঙ্গনের সরেতাজ উলামায়ে কেরাম যে বিষয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, সে বিষয়ে জ্ঞান-গরিমায় নাবালক আমার মত এক নাদান কী করতে পারবে ভাবতেই অবাক লাগে।

যাইহোক উদ্যোক্তাদের ইসরার আর আমাদের মুহতামিম সাহেবের ইতিবাচক ইশারায় “চেতনায় কওমী মাদরাসা”র ডাকে সমগ্র বাংলার সচেতন তরুণপ্রজন্মের আলেমদের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করি। বৃহত্তর সিলেট থেকে আরো যারা নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন কিন্তু ব্যক্তিগত অসুবিধার দরুণ যেতে পারেন নি তারা হলেন, শ্রদ্ধেয় অগ্রজ মুহতারাম মুসলেহ উদ্দীন রাজু, মুআযযম সামীউর রহমান মূসা, মুকাররাম জুনাইদ কিয়ামপুরী, মুবাজ্জাল মুসা আল হাফিজ, স্নেহাস্পদ অনুজ জিয়া রহমান, মুআয্যায এহসান বিন মুজাহির, সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ। তাদের অনুপস্থিতিতে অধমকেই বৃহত্তর সিলেটের তরুণ আলেমদের প্রতিনিধিত্বের ভূমিকা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পালন করতে হয়েছে।

যাইহোক ২৯ অক্টোবর ঢাকায় গিয়ে ফজররের নামায আদায় করি। নামাজান্তে মাওলানা ওয়ালী আরমান ভাইয়ের দিক-নির্দেশনায় সবার আগে সভাস্থলে গিয়ে হাজির হই। তখন সকাল সাড়ে ৬টা। আয়োজক কাউকে না পেয়ে প্রথমে ভড়কে যাই। পরে বনানির চেয়ারম্যানবাড়ী এলাকার বড় মসজিদের ২য় তলায় গিয়ে অনুষ্ঠান সূচনার অপেক্ষায় থাকি। একসময় অজান্তেই রাজ্যের সকল ঘুম এসে নয়নযুগলে ভীড় জমায়। অনুষ্ঠান শুরুর আধাঘণ্টা আগে আরমান ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভাঙ্গে। সর্বপ্রথম যার মোলাকাতে আনন্দিত হই তিনি হলেন ঢাকার মাকতাবাতুল আযহারের মালিক বন্ধুবর মাওলানা উবায়দুল্লাহ আযহারী। তারপর একে একে দেখা হয় বাংলার আগামী প্রজন্মের কওমী অঙ্গনের ভবিষ্যতকাণ্ডারী তারুণ্যের প্রতীক সকল উলামায়ে কেরামের সাথে। যাদের কেউ কেউ আগে থেকেই অদমের কাছে পরিচিত আর কারো কারোর মুখচ্ছবি পূর্ব থেকে পরিচিত না হলেও নামের সাথে অবশ্যই একটা পরিচয় ছিলো। তাদের সৌহার্দপূর্ণ আচরণে হৃদয়ে অনেক আনন্দ অনুভব করি। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।

দুই.
সকাল ৯টায় শুরু হয় কাঙ্খিত অনুষ্ঠান। যথাসময়েই উপস্থিত হন আমন্ত্রিত অতিথিগণ। যোগ্য পিতার প্রতিভাবান সন্তান মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের সভাপতিত্বে এবং হাসান জামীল ভাইয়ের সুললিত কণ্ঠের তেলাওয়াত ও নান্দনিক সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভার প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। পরিচয়পর্ব শেষে অনুষ্ঠানের মূল পর্বের সূচনা ঘটে। প্রথমেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুহতারাম সভাপতি। তার বক্তব্যেই চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে অনুষ্ঠানের আলোচ্যসূচি। নিম্নোল্লেখিত বিষয়গুলো ছিলো আলোচনার মূল খোরাক।
১. কওমী মাদরাসা শিক্ষার সরকারী স্বীকৃতি বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য ও পরিস্কার অবস্থান তুলে ধরা ৷
২. কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার ব্যখ্যা আলোচনা ৷
৩. কওমী মাদরাসা শিক্ষানীতি ও কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া বিশ্লেষণ ৷
৪. মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের আপত্তিকর বক্তব্য বিষয়ে জবাবদিহিতার উদ্যোগ গ্রহণ৷
৫. বড়দের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় করনীয় বিষয়ে মতবিনিময় ৷

আলোচনার জন্য সভাপতি মুহোদয় সর্বপ্রথম অধমকেই আহ্বান করেন। আমি হচকচিত হয়ে পড়ি। আচমকা নিজের নাম শুনে প্রথমে বিব্রতবোধ করি। তারপর একটা নাতিদীর্ঘ অগোছালো বক্তব্য তুলে ধরি। স্বীকৃতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয় নিয়ে কথা বলি। কী কারণে স্বীকৃতির বিষয়টা আটকে আছে তাও বলে ফেলি। বক্তব্যের সর্বশেষে জানিয়ে দেই, কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে সকল বোর্ড ও উলামায়ে কেরামের ঐক্যের ভিত্তিতে সনদের সরকারী স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে। আর স্বকীয়তা বহাল না থাকার অশংকা থাকলে ঐক্যের ভিত্তিতে স্বীকৃতি বর্জন করা হবে দেশ-জাতি ও ধর্মের জন্য শুভনীয়-কল্যাণকর। হবে ফায়দাজনক ও মঙ্গলময়।
এরপর আগত সবাই যার যার অবস্থান থেকে আলোচ্য বিষয়ের উপর নিজেদের সুস্পষ্ট সুন্দর মতামত তুলে ধরেন। দীর্ঘ ৬/৭ ঘণ্টা ধরে জাতির উদীয়মান একঝাঁক রাহবারের মুখনিঃসৃত সন্মোহিত ইলমী কথাগুলো তন্ময় হয়ে শুনতে থাকি। আলোচনার আগে আমরা ছিলাম পরস্পর দূরে বহুদূরে। আলোচনার পরে আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম এক কাতারে। চলে আসলাম একদম কাছাকাছি। সবার হৃদয়ে ঝংকৃত হলো একই সুর। মিলাও হাতে হাত আমরা সবাই দেওবন্দিয়্যাত। সবার মনে একই আযান, আমরা কাসিমবাগের কওমী সন্তান। গাইতে পারি ঐক্যের জয়গান।

তিন.
মতবিনিময় সভায় মনখোলা অনেক কথার মধ্য দিয়ে যে বিষয়গুলোতে সকলে একমত হয়েছেন, সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবনার আকারে তা উল্লিখিত হল –

সিদ্ধান্তাবলী:

১. আমাদের মুরব্বী ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও বেয়াদবীমূলক, অশোভন উক্তি ও মন্তব্য করা থেকে সকলকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হবে ৷ কওমী মাদরাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি ইস্যুতে যেই মুরব্বীর অবস্থান যেদিকেই হোক না কেনো, সকলের প্রতি আমাদের সন্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থাকবে সমভাবে ৷
২. উপস্থিত তরুণ ওলামায়ে কেরাম নিজেরাও বড়দের ব্যপারে সংযত থাকবেন এবং নিজ নিজ ফেসবুক আই ডি থেকে কিংবা অন্যান্য উপায়ে ব্যক্তিগতভাবে তরুণ প্রজন্মের প্রতি বিতর্ক ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সৌজন্যতা ও শালীনতা রক্ষার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন ৷সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাবেন।
৩. যে সকল ব্যক্তি ফেইসবুক কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশালীন, আপত্তিকর বা ব্যক্তিআক্রমণাত্মক পোস্ট, কমেন্ট ইত্যাদি করবে, তাদেরকে সংশোধনের ও এ থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হবে৷ এক্ষেত্রে যার সাথে যার যোগাযোগ বা সুসম্পর্ক রয়েছে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখবেন ৷অন্যরাও প্রয়োজনে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন ৷
৪. ফেইক বা ছদ্ম পরিচয়ের আইডি থেকে কারো বক্তব্যে আপত্তিকর কমেন্ট ইত্যাদি করলে তা তিনি ডিলিট করবেন এবং প্রয়োজনে ছদ্ম পরিচয়ধারীকে ব্লক করে তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন ।
৫. কওমী মাদরাসা ও বোর্ডসমূহের মুরব্বিয়ানে কেরামের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সামনে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ তুলে ধরা হবে-
ক. উলামায়ে কেরাম যেনো যে কোনো সিদ্ধান্ত ঐক্যবদ্ধভাবে গ্রহণ করেন ৷ স্বীকৃতি নিলেও যেনো ঐক্যবদ্ধভাবে নেন, না নিলেও যেনো ঐক্যবদ্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করেন ৷
খ. বেফাকুল মাদারিসের সাথে অপরাপর চার বোর্ডের প্রস্তাবিত বৈঠকটি যেনো যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হয়।
গ. কওমী কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়ায় সরকারের হাতে কর্তৃপক্ষ গঠনের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকা ও পরবর্তিতে কওমী বিশ্ববিদ্যালয় গঠন ও তাতে ভিসি নিয়োগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারী হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টির আশংকার কথা জানানো ৷
এসকল লক্ষ্য বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মের আলেমদের পক্ষ থেকে ছয় সদস্যের নিম্নোক্ত প্রততিনিধিদলকে সাব্যস্থ করা হয়েছে ৷ প্রয়োজনে প্রতিনিধিদল আরো বর্ধিত হবে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা হলেন-
মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক
মাওলানা হাসান জামিল
মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন
মাওলানা মুফতী এনায়েতুল্লাহ
মাওলানা এহতেশামুল হক ক্বাসিমী
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান।

লেখক : মুহাদ্দিস ও প্রবন্ধকার

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

জাগতিক ও ইসলামী শিক্ষা

#জাগতিক_ও_ইসলামী_শিক্ষা মানুষের খুদি বা রূহকে উন্নতিসাধনের প্রচেষ্টার নামই হলো শিক্ষা, কথাটি আল্লামা ইকবালের। রবীন্দ্রনাথের মতে, ...