মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১:৪৩
Home / কওমি অঙ্গন / দ্বীনী প্রতিষ্ঠান চালাবেন কীভাবে?

দ্বীনী প্রতিষ্ঠান চালাবেন কীভাবে?

খতিব তাজুল ইসলাম :

দ্বীনী প্রতিষ্ঠান পরিচালনার রূপরেখা নামক একটি পরিকল্পনার পোস্টার বছর পাঁচেক আগে ছাপিয়ে ছিলাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মারাকিজ এদারা তা সাদরে গ্রহণ করেছে। যে কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য দক্ষতা অভিজ্ঞতা খুব জরুরি। বিশেষ করে মাদারিসে কওমিয়া পাবলিক ফান্ডে চলে। পাবলিকের দ্বারা পরিচালিত। সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এখানে যেমন আছে কাজের স্বাধীনতা তেমনি আছে সম্ভাবনার অপার সম্ভার।
সামান্য মাথা খাটালে ছোট্ট পরিসরে সম্ভব বড় বড় কাজ। সমৃদ্ধি উন্নতি আছে গবেষণায়, চিন্তায়, পর্যালোচনায়। কওমি মাদরাসার ভিতর আমরা অযুত নিযুত স্বপ্ন দেখি। আসুন সে সম্পর্কে কিছু পর্যালোচনার অবতারণা করি।

পরিচালনা পর্ষদ
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে উজুদে আসে। প্রতিষ্ঠানটি যেভাবেই শুরু হোক শক্ত একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকা চাই। মুহতামিম-প্রধান-পরিচালক-প্রিন্সিপাল যে উপাধিই হোক তিনিই হবেন এই পরিষদের সমন্বয়কারী। কওমি মাদরাসাগুলোতে দেখা গেছে একেক মাদরাসায় একেক নিয়ম বা পদ্ধতি। কোথাও কমিটি কর্তৃক পরিচালিত। কোথাও মুহাতামিম একক ক্ষমতার মালিক। নামমাত্র কমিটি আছে তবে তাদের কোনো পাওয়ার নেই। কোথাও উভয়টি কার্যকর। কমিটি কর্তৃক যেসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত হয় সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক-স্টাফ সুখে থাকেন না। চলে আযাচিত হস্তক্ষেপ। তার বিপরীত মুহতামিম সাহেবের একচ্ছত্র পাওয়ার থাকলেও সমস্যা। চলে একাধিপত্য। তাই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা আমাদের জন্য নিরাপদ। পাওয়ারফুল পরিচালনা কমিটি হবে, সাথে থাকবে যোগ্য একজন পরিচালক বা মুহতামিম। নিয়ম নীতি, আইন কানুন লিপিবদ্ধ থাকবে। সবাই আইনের ভিতর থেকে কাজ করে যাবেন। কমিটি অবশ্যই পরিচালককে কাজের স্বাধীনতা দিবেন। শিক্ষক স্টাফগণ যাতে স্বাচ্ছন্ধে দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারেন থাকতে হবে তার নিশ্চয়তা। লাগামহীন স্বাধীনতা মানুষকে অরাজকতার দিকে নিয়ে যায়। তাই সকলের উপর জবাবদিহির খড়গ থাকা খুব প্রয়োজন। আমাদের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিটি ডিগনিটি বাড়ানো। দিনদিন তরক্কী-উন্নতির দিকে যাতে চলমান থাকে সেদিকে নজর ঢালা।

যত ভাল মেনেজমেন্ট তত ভাল প্রতিষ্ঠান। কে কীভাবে ম্যানেজ করবেন তা যার-তার নিজস্ব ব্যাপার। তবে সাধারণ কিছু গাইড লাইন আছে যা সকলের জন্য প্রযোজ্য।

কার্যকর পরিচালনা পর্ষদের প্রধান কাজ ও অন্যান্য কিছু জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয়
ক- সঠিক পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ও তার আয়োজন। প্রতিষ্ঠানের সকল নীড বা জরুরতের যোগান দেয়া। শিক্ষা ক্যাম্পাস, আবাসিক-অনাবাসিক সকল বিষয়ে উন্নত ও স্বাস্থসম্মত পরিবেশ বজায় আছে কি-না তা খেয়াল রাখা।
খ- নিয়মিত মনটিরিং বা তদারকি। বছরে একবার শুধু মিটিং-প্লান পর্যাপ্ত নয়। সময়ে সময়ে কোন বিভাগ কীভাবে কাজ করছে তা খতিয়ে দেখা।
গ- বার্ষিক রিপোর্ট হবে বিগত বছরের চুড়ান্ত রূপরেখা। যা হয়েছে ভাল হলে মোবারকবাদ পেশ, ভুল হলে শোধরিয়ে নেয়ার পন্থা বের করা। আগামী দিনের খসড়া প্লানও থাকতে হবে সামনে। সার্বিক বিষয়ের উপর চূঁড়ান্ত পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এক্টিভ শুরা চাই। যাতে তারা ভাবে যে, সে যথাযথ মর্যাদা পেয়েছে। নামমাত্র মৌখিক শুরা না রেখে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শুরাকে কার্যকর করার বিকল্প নেই। শুরা থেকে প্রতিষ্ঠান আর্থিক সাপোর্ট পাক তা কাম্য। এতে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানের পেরেশানি লাঘব হবে।
ঘ- পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্টের বড় আরেকটি কাজ হলো আর্থিক বিষয়টি নিশ্চিতকরণ। কারণ আর্থিক ব্যাপারের কারণে সুন্দর প্লানও মাঠে মারা যায়।
ঙ- শিক্ষারিপোর্টের পুর্ণাঙ্গ রিপোর্ট গ্রহণ পর্যালোচনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ ভাল রিজাল্ট। সাধারণত ভাল রিজাল্টই হলো উন্নত শিক্ষার বাহ্যিক আলামত। পরিচালনা পর্ষদ ও শুরা বৈঠকে শিক্ষা বিষয়ে হাল্কা টাচ মোটেই সুখকর নয়। শিক্ষার মান ভাল না খারাপ, প্রতিষ্ঠানের মান বাড়ছে না কমছে- তা খতিয়ে দেখা কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যাবশক। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব এড়িয়ে চলে কিংবা শিক্ষা রিপোর্ট নিয়ে কোন মুল্যায়নধর্মি আলাপ-আলোচনা করে না সেখানের শিক্ষার মান বাড়ার কোন যৌক্তিকতা নেই।
চ- বিকেন্দ্রিকরণ ব্যবস্থা। আমাদের মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাবিভাগ নিয়ে চলে তুঘলকি কাণ্ড। অর্থাৎ মক্তব থেকে টাইটেলের স্তর পর্যন্ত থাকেন একজন জিম্মাদার বা শিক্ষাসচিব। প্রাইমারি মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর ডিগ্রী ক্লাসগুলোর জন্য নুন্যতম তিনজন জিম্মাদার থাকা উচিত। মক্তব বা প্রাইমারি ও মাধ্যমিকের দায়ীত্বশীলকে আমরা কিভাবে প্রিন্সিপাল বলি? প্রিন্সিপাল হবেন কলেজ পর্যায়ের। তাই তালগুল পাকিয়ে না ফেলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ করতে হবে। মক্তব ও মাধ্যমিকের থাকবেন প্রধান শিক্ষক। তিনি হবেন এই বিভাগের সার্বিক জিম্মাদার। উচ্চমাধ্যমিক ও টাইটেলের জন্য থাকবেন প্রধান শিক্ষাসচিব। নির্বাহি প্রধান থাকবেন প্রিন্সিপাল। যারা মুহতামিমের পরিভাষা ব্যবহার করেন তারাও সমানভাবে কাজ বণ্টন করে নিবেন।
ছ- একই ছাদের নিচে একই ম্যানেজমেন্টের আন্ডারে কচি-কাচাদের আসরে যুবকদের নিয়ে সমান্তরাল আয়োজন সুখকর নয়; বা কাংখিত পরিবেশ সম্ভব হবে না। তাই একই বাউন্ডারির ভিতর হলেও আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপনা রাখা দরকার। ১৪ বছরের নিচে কোন ছাত্রকে আবাসিক রাখা তথক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ রাখা উচিত যতদিন পর্যন্ত তাদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাস না করা হয়েছে।
জ- প্রতিটি বিভাগের জিম্মাদারদের নিয়ে মুহতামিম বা প্রিন্সিপাল-পরিচালক নিয়মিত বৈঠক করবেন। নিয়মিত আলাপ আলোচনা, পর্যালোচনা করলে অনেক দুর্বলতা যেমন কাটিয়ে ওঠা যায় তেমনি দায়িত্বে অবহেলা করাও দূরিভুত হয়। আমরা ভাবি শিক্ষাসচিব শুধু কিতাব বণ্টনের মালিক আর সময়মত পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশ। শিক্ষাসচিব চাইলে পুরো দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টার বেশি ক্লাস নেয়া অনুচিত। কারণ অন্যান্য বিষয় দেখতে হলে তাকে ফ্রী থাকা চাই। অবশ্য মনিটরিংয়ের বিষয়ে মুহতামিম শিক্ষাসচিবকে সাপোর্ট দিলে কাজ আরো সহজতর হবে। সাধারণত কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষা-সিলেবাস নিয়ে কোন আলাপ আলোচনা হয় না। তারা ভাবেন ইহা একটি অলঙ্ঘনীয় বিধান। যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা নিয়ে কোন কথা হয় না, লাভক্ষতির কোন হিসাব নেই, তার তুলনা পঙ্গু নারীর মত- যে নিয়মিত বাচ্চা প্রসব করে ঠিকই কিন্তু সব বিকলাঙ্গ।
ঞ- কর্তৃপক্ষের এ্যাকশন। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় যারা শিক্ষকতা করেন তাদের অনেকের নেই প্রয়োজনীয় যোগ্যতা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আজ্ঞাবহই তার যোগ্যতা। কেন এমন হবে? যেখানে মুহতামিম-পরিচালক-প্রিন্সিপালগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আর্থিক যোগান দিয়ে যাচ্ছেন সেখানে কেন সবিধাভুগী চামচাদের কাছে জায়গা দিবেন? যে কাজের যে কাজি হবেন তাকে সে কাজের দায়িত্ব দেয়া আল্লাহর বিধান, রাসুলের আদেশ, সফলতার চাবিকাঠি। তাই চামচা-অযোগ্যদের সুযোগ দিয়ে নিজে নিজের পায়ে কুড়াল মারার নামান্তর। যারাই মেধার মুল্যায়ন করতে অপারগ, সুবিধাভুগীদের প্রশ্রয় দিবেন আখেরে বেইজ্জতি জিল্লতিই নসিব হবে।

অতএব শিক্ষার মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। টার্গেট এবং মান নির্ধারণ করে দেয়া চাই। যারা এই মাপে উঠতে অপারগ তাদের হেন্ডশ্যাক করে বিদায় দিন। ফার্মের মুরগি ডিমও দেয় না বেশিদিন বাঁচেও না। তাই আমরা এমন সব প্রডাকশন চাইনা যাতে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হয়।
শিক্ষা গবেষণায় যারাই অগ্রগামি তারাই সফলতা পাচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছ হতে স্টাফের যেমন মধুর ব্যবহার পাওয়া আশা করে তেমনি নিজের অযোগ্যতার জন্য তিরস্কার নিতে প্রাস্তুত থাকতে হবে তাদের।

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

শবে বরাত মানে লাইলাতুন নিস্ফি মিন শা‘বান!

শবে বরাত সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস নেই? Mohiuddin Kashemi সাহেবের ওয়াল থেকে: অজ্ঞ, নির্বোধ কিংবা ...