বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ১০:০২
Home / পরামর্শ / একক কওমি বোর্ড এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাঝে আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি

একক কওমি বোর্ড এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাঝে আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি

qutub-minar-new-delhi
কুতুব মিনার, দিল্লি

খতিব তাজুল ইসলাম ::

কমবেশ প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদরাসা পুরো দেশজুড়ে। ছোটবড় সবমিলিয়ে যদি ২০ হাজার মাদরাসার একটি বোর্ড হয় তাহলে বলতে হবে অকল্পনীয় সম্ভাবনা আছে সেখানে। সনদের স্বীকৃতির ব্যাপারে মোটামুটি প্রায় সকলে একমত। দ্বিধাদ্বন্ধ চলছে কীভাবে, কোন পথে তা নিয়ে। আমরা বারবার বলেছি এখনো বলবো যে, বিষয়টি গবেষণার। বিচক্ষণ উলামাদের সমন্বয়ে এই মুহূর্তে একটি নিজস্ব কমিটি গঠন খুব জরুরী। যারা সরকার গঠিত বা প্রস্তাবিত কমিশনের সাথে নিয়মিত বৈঠক করে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে শিক্ষাবোর্ড কোন রাজনৈতিক দলের কমিটি নয়। তাই কোন দলই যেন এই চেষ্টা না করে যে, এখানে আমাদের লোক কত পার্সেন্ট নিয়োগ পেল। যারাই যোগ্য বা সিলেবাস এবং আইন বিষয়ে পারদর্শি তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া। মুরব্বিগণ কাজের দিকনির্দেশনা দেবেন। পরামর্শ দেবেন। প্রয়োজনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের খেয়ালাত শেয়ার করবেন। এভাবে আমাদের কওমির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা কুরবানি পেশ করতে হবে।

সংস্কার কেন প্রয়োজন?

বিশ্ব এগিয়েছে অনেক। পাঠদান পদ্ধতি উপকরণের মাঝে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনকে আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। তাই যুগের সাথে দক্ষতার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের এগুতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন জরুরী সংস্কার। নিজের মত করে আয়োজন উদ্যোগ এবং সিদ্ধান্তগুলো তৈরি না করলে অন্যে করে দিলে ব্যতিক্রম হবেই। তাই অন্যের ধোকা থেকে বাঁচতে হলে থাকতে হবে নিজস্ব প্লান।

সনদের স্বীকৃতি হলে ফায়দা কি?

পৃথিবীতে এখনো মেধার মুল্যায়ন আছে। এই মুল্যায়নের একটা ধরাবাধা কিছু নিয়মও আছে। আর তা হলো চলমান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কারণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলে অফিসিয়ালি ক্ষমতা প্রয়োগ কিংবা সক্ষমতা দেখানো অথবা দেশে ও বহির্বিশ্বে গিয়ে অবদান রাখার ক্ষেত্রে তা মূল বাধা হয়ে দেখা দেয়। দেখা গেছে যোগ্যতা থাকা সত্বেও একজন ব্যক্তি একটি পদের জন্য আবেদনের অনুপযোগী হলো। তার বিপরীত আরেকজনের যোগ্যতার ঘাটতি আছে; কিন্তু সে পেল সুযোগ। কারণ সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নাগরিক জীবনে বিরাট ভুমিকা রাখে।

কওমি শিক্ষাসনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বালাই না থাকার কারণে মেধার যাচাই বাছাইর ভাল কোন উপায় বা সুযোগ নেই। কেউ তিন ক্লাস ডিঙ্গিয়ে উপরে ওঠে। কেউ ফেইল করেও দাওরা পাশ। কতজন ছাত্র হলে একটি প্রতিষ্ঠানে দাওরা খোলার অনুমতি আছে তার কোন কানুন নেই। তাই যার তার ইচ্ছামতো খোলা আর বন্ধ চলছে। টাই্টেল পাশের পর দেখা যায় একজন দু’লাইন না বাংলা না উর্দু না আরবি শুদ্ধ করে লিখতে জানে। অথচ ঠিকই আরেকজন তা পারে। এভাবে শিক্ষার মধ্যে আছে স্বেচ্ছাচারিতা বা অরাজকতা। তাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয় জড়িত থাকলে সেখানে নিয়মানুবার্তিতা থাকবে। যোগ্যরা সুযোগ পাবে অযোগ্যরা টাইটেলের নাম নিয়ে আর বদনাম করতে পারবে না।

আরো সুবিধা আছে…

সংস্কার এবং স্বীকৃতি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। স্বউদ্যোগে কিছু করার সাহস তৈরি হবে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তি টেকসই বা মজবুত হয়না। কওমি অঙ্গনের ভিত্তিকে আরো মজবুত এবং চলমান সচল রাখতে হলে সংস্কার স্বীকৃতির বিকল্প নেই।

আরো অনেক কিছু করা সম্ভব হতো…

বর্তমান বিশ্বের শিক্ষানীতি অর্থনীতির বাগডোর ইহুদীদের হাতে। তাদের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো উচ্চ শিক্ষা অর্জন। দক্ষতার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার দরকার। এমনকি কাদিয়ানীরাও আজকাল বিশ্বে অনেকি এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সেনা, পুলিশ, ব্যাংক, বিচারালয়, অফিস-আদালতের উচু উচু জায়গায় তারা ঘাপটি মেরে বসে আছে। মামা-ভাগনার কারণে নয়; যোগ্যতা দিয়ে তারা এসেছে। মোটকথা, সুদক্ষ জনশক্তি না হলে পুরোটাই বেকার। তাই সংস্কারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হলেও আমাদের সে পথে এগুনো এখন সময়ের দাবি।

একটি মিশনকে, চিন্তাকে বাঁচিয়ে এবং জিইয়ে রাখতে হলে থাকতে হয় নানামুখি আয়োজন। শুধু শুধু ইমাম-মুয়াজ্জিন আর মাদরাসার শিক্ষক পয়দা করে আমরা আমাদের এই মিশনকে শক্তিশালি রূপে জাহির করতে পারবো না কখনো। আপনিই বিচার করুন, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে সামাজিকভাবে আমাদের পলিসিগুলো কতটুকু এফেক্টিভ।

ভিন্ন প্রসঙ্গ

আমরা কেন পূর্ণাঙ্গ একটি ইসলামি ব্যাংক পরিচালনা করতে পারি না? কেন আমাদের একটা চামড়াজাত ইন্ডাস্ট্রি নেই? আমাদের কি শক্তিশালী কোন মিডিয়া আছে? আমরা চাইলে কিন্তু তা করতে পারতাম। আর তার জন্য দরকার দক্ষ ফারেগীন। ২০ হাজার কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি একক বোর্ডের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোন কিছু করার চিন্তা ভাবনা করে তাহলে তা প্লান তৈরি করতে দেরী; কিন্তু বাস্তবায়নে দেরি হবে না। একহাজার টাকা করে ২০ হাজারে হবে ২ কোটি। ৫ হাজার করে দিলে ১০ কোটি। ১০ হাজার করে দিলে ২০ কোটি। ৫০ হাজার করে দিলে ১০০ কোটি। আমরা চাইলে অনায়াসে বছর পাঁচেকের ভিতর একটা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারি। আমরা পারি নিজস্ব একটা টেলিভিশন কায়েম করতে। আমরা পারবো একটা চামড়াজাত ইন্ডাস্ট্রি চালাতে। পরিবহণ জগতেও পদার্পন সম্ভব। হাসপাতাল, ফার্মাসিকেল ইন্ডাস্ট্রি আমরা কায়েম করতে পারি। সারা বিশ্বব্যাপী কওমির সন্তানরা যেমন ছড়িয়ে আছে আরো যখন যোগ্যতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে তখন হাজার কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ কোন সমস্যা হবে না। বিশ্বের মুসলিম দাতা দেশের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারলে পালে লাগবে আরো তেজি হাওয়া।

একবার ভাবুন! তখন আমাদের কি আর চাকুরির জন্য কারো কাছে যেতে হবে? শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ্ব শক্তিগুলো তখন আপনার মনমর্জি পেতে পেছনে পেছন ঘুরবে। আমরা আমাদের শিক্ষাবোর্ড নিয়ে খোলা মাঠে রাজনীতি করতে যাবো না। তবে রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন।

এবারকার চামড়া শিল্প নিয়ে কি ভেবে দেখেছেন? ঘাটের টাকা খরছ করে কিনে তা আবার মাটিতে দাফন করতে হয়েছে। কেউ কেউ নদীতে ফেলে দিয়েছেন। অনেকে ফ্রি দিয়ে দিয়েছেন। এসব কিসের আলামত? তাই ভাবুন! শতবছর সামনের দিকে নজর দিয়ে। হাজার বছরের প্লান থাকতে হবে হাতে।

এই ইসলাম মিটে যাবার জন্য আসেনি দুনিয়াতে। এসেছে বিজয়ী হতে। আপনি বিজয়ী জাতি। তাই বিজয়ের জন্য বিজয়ের কর্মসূচি নিয়ে সামনে এগুতে হবে ভাই।

অতএব যোগ্যতা দক্ষতার বিকল্প নাই। আর তার জন্য প্রয়োজন সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আসুন আমরা আমাদের ভবিষ্যতকে গড়ি ইসলামের সোনালি ইতিহাসের মত করে।

লেখক : খতিব ও কওমি মাদরাসা বিষয়ক গবেষক

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

জাগতিক ও ইসলামী শিক্ষা

#জাগতিক_ও_ইসলামী_শিক্ষা মানুষের খুদি বা রূহকে উন্নতিসাধনের প্রচেষ্টার নামই হলো শিক্ষা, কথাটি আল্লামা ইকবালের। রবীন্দ্রনাথের মতে, ...