শনিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ৮:৫৯
Home / অনুসন্ধান / অলৌকিক কুদরতি কিছু করার জন্য আল্লাহপাকের নিকট দুয়া করছি!

অলৌকিক কুদরতি কিছু করার জন্য আল্লাহপাকের নিকট দুয়া করছি!

ইকবাল হাসান জাহিদ:

আমরা সব সময় প্রথম আলোকে গালি দেই, এই অমিও। কিন্তু আজ তাকে ধন্যবাদ জানালাম। কারণ রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে এইরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা সংবাদ প্রথম পৃষ্ঠায় নির্মোহভাবে ছেপেছে। যে সংবাদ পড়তে গিয়ে কয়েকবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়কে আল্লাহপাক পানি করতে পারেন। সাগরকে শুকিয়ে মরুভূমি বানাতে পারেন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য এমন অলৌকিক কুদরতি কিছু করার জন্য আল্লাহপাকের নিকট দুয়া করছি। সংবাদটি পড়ুন। আর এই রমজানে তাদের জন্য খাস দিলে দুয়া করুন। সামর্থ অনুযায়ী সাহায্যের হাস প্রসারিত করুন।

বালুখালি ক্যাম্পের ‘মাজি’ মোহাম্মদ হোসেনের (মিয়ানমার থেকে এবার বাংলাদেশে এসেছেন) খোঁজ করতেই একটি ছাপরাঘর থেকে শতচ্ছিন্ন লুঙ্গি আর ব্লাউজ গায়ে বেরিয়ে এলেন হামিদা বেগম। কোলের শিশুটি উলঙ্গ। হাতের আঙুল ধরে থাকা অন্য শিশুটির পরনেও কিছু নেই।

হামিদার স্বামী জকির মিয়াকে ‘মেলিটারি’রা গুলি করে মেরে ফেলেছে। লাশটাও পাননি। মাস পাঁচেক আগে জমানো টাকার সবটা দিয়ে কেয়ারিপাড়া থেকে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। নিজে ঘর তুলতে পারেননি। মাজির বাসায় উঠেছেন। এক কামরার ছাপরায় নয়জন থাকেন। ঘরগুলোর দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১২ ফুট, প্রস্থ ৭ ফুট। তাও ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ উড়িয়ে নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরের অন্যদের মতো তিনি শিশুদের নিয়ে টিলার ওপরই ছিলেন।

গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর নাফ নদী পেরিয়ে এখানে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গোপনীয় প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৪৮ হাজার ৮৮৩। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাবে এই দফায় সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়া উপজেলার বালুখালিতে। কুতুপালং এবং টেকনাফের লেদায়ও পুরোনো অনিবন্ধিত শিবিরে গিয়ে উঠেছেন অনেকে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ঘরপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল দিচ্ছে। কিন্তু একেক পরিবারে ৮ থেকে ১২ জন মানুষ। ওই চালেও চলছে না। সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। মারা যায়নি। এখনো বেঁচে আছে।

মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের বড় অংশ শিশু। রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বড়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একেকটি পরিবারে কমপক্ষে পাঁচটি সন্তান আছে।

হামিদার দুই সন্তানের মতো কয়েক মাস বয়সী থেকে বছর চারেক বয়স পর্যন্ত প্রায় কোনো শিশুর পরনেই কাপড় নেই। গোটা গায়ে ফোড়া উঠেছে কারও কারও। ছাপরার ভেতর থেকে কোনো কোনো শিশুর কাশির ভয়জাগানিয়া শব্দ ভেসে আসে। একটু যারা বড়, তারা শরণার্থী শিবিরের এ-মাথা ও-মাথা ছুটে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ খোলা জায়গায় টয়লেট সারছে। কথাবার্তা বলে দেখা গেল, অনেক অভিভাবক সন্তান শুধু বেঁচে আছে এটুকুতেই খুশি। কিছুটা সচ্ছল ঘর থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন।

কথা হচ্ছিল আবুল কালামের সঙ্গে। কেমন আছেন—জানতে চাইলে বললেন, ভালো আছেন। চোখের সামনে অন্তঃসত্ত্বা বোনকে খুন হতে দেখেছিলেন। বোনটির তখন প্রসববেদনা উঠেছে। তাঁকে ঘিরে ধাত্রীসহ গোটা সাতেক মানুষ ছিলেন। কেউ ‘মেলিটারি’র হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। ওই দিনের পর দুই বছরের ছেলে আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। ছেলে ও ছেলের মায়ের আলাদা কি যত্ন করছেন, কী খেতে দিচ্ছেন—জানতে চাইলে বললেন, আগের রাতে ভাতে পানি দিয়ে খেয়েছেন। ঘরে লবণও ছিল না।

আবুল কালাম দিনমজুরের কাজ করেন। বাঙালি শ্রমিকদের চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করানো যায় রোহিঙ্গাদের। পাশের গ্রামে প্রায়ই ডাক পড়ে। যেদিন এক-দেড় শ টাকা জোগাড় করতে পারেন, সেদিন শাক কেনেন, তেল-লবণও। ছেলে-ছেলের মাকে খাওয়ান।

সামনে সামনে একটা দোকান আছে। দোকানির নাম আবদুল হালিম। দোকানের পাশে একটি খাঁচায় দুটি মুরগিও দেখা গেল। আর সামনে ছোট ছোট বাক্সে কাঁচা মরিচ, পাকা কাঁকরোল, শসা, আলু আর শুঁটকি। বেচাকেনা কেমন—জানতে চাইলে বললেন, এই এলাকায় মাছ বিক্রি হয় না। ৪০ হাজার মানুষের এই এলাকায় গত সাত দিনে ১০টি মুরগি বিক্রি হয়েছে। বিক্রি বলতে ১৫ টাকা কেজির একটি নিম্ন মানের আলু, ডিম আর কাঁচা মরিচ। একেকটি পরিবার সর্বোচ্চ এক হালি ডিম কেনে। ৮-১২ জনের পরিবারে আলু দিয়ে ডিম ঘুঁটে সবাই মিলে খায়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় কাঁচা মরিচ। তাঁর ভাষায়, ছোট একটি শিশু এক বেলায় যে পরিমাণ কাঁচা মরিচ খায়, বাঙালিদের গোটা পরিবারে সেই পরিমাণ মরিচ এক দিনে খরচ হয় না। তরকারি ঝাল হলে খরচ কম হয়। সে জন্যই এই ব্যবস্থা বলে ধারণা তাঁর। এত এত ছোট শিশু বালুখালিতে, দুধ বিক্রি হয় কেমন? জানতে চাইলে তিনি দুটি প্যাকেট বের করে দিলেন। বললেন, একপর্যায়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি চাল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ধারে চাল নিয়েছিলেন অনেকে। শোধ করতে না পেরে দানে পাওয়া দুধের প্যাকেট দিয়ে মাফ চেয়ে গেছেন।

যেসব শিশু বাবাকে হারিয়েছে বা যাদের বাবা পঙ্গু হয়ে গেছেন, তাদের অবস্থা বেশি খারাপ। জিয়াউর রহমানের হাত অকেজো। রাইফেলের আঘাতে হাত কয়েক টুকরা হয়ে গেছে। গ্রামে ভিক্ষা করেন। যা পান তাই দিয়ে সন্তানদের খাওয়ান। চিংড়ি ব্যবসায়ী বেলালের পায়েও ব্যান্ডেজ পাঁচ মাস ধরে। ব্যথা উঠলে প্যারাসিটামল খান। অস্ত্রোপচার লাগবে। টাকার অভাবে এভাবেই আছেন। দেখাশোনা করেন ফুফু নূরজাহান বেগম। ভিক্ষা করে কত দিন, ছেলেমেয়ে নিয়ে কীভাবে চলবে—জানতে চাইলে জবাব দিলেন বেলালের ষাটোর্ধ্ব ফুফু নূরজাহান। বললেন, তিনি ১৪ কানি জমির মালিক। ফেলে আসা ঘরের জন্য মন কাঁদে। ছয় ছেলের মা। বড়টিকে খুন করেছে মিলিটারি। নূরজাহান বলছিলেন, ‘সেদিন সকালে মিলিটারিরা সব পুরুষকে বের করে দিল। আমি, আমার মেয়ে, ছেলের বউ, আমার ননদ সবাই বসে থাকলাম। আমি বুড়ো মানুষ। তাও মিলিটারিরা গায়ে হাত দিল। আমার ছোট ছেলের বউটা ছিল সবচেয়ে সুন্দরী। এক মিলিটারি আমাদের পাহারা দিল, অন্যজন আমার বউটাকে রেফ করল। আমি সু চির বাবাকে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে ভোট দিতে গেছি। কিন্তু কী পেলাম। আমার নাতি-নাতনিরা কি ওখানে নিরাপদে থাকতে পারবে? আমি তো ফিরতে চাই।’ নূরজাহানের ছেলের বউয়েরও একটি মেয়ে। একটু বড় হলেই মেয়ের বিয়ে দেবেন, তেমনই পরিকল্পনা।

কেউ কেউ এত কিছুর পরও দেশে ফিরতে চান। তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, মিয়ানমারের ১৩৫টি নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ সমানাধিকার পাবে। তাঁরা চান না, সন্তানেরাও তাঁদের মতো করে বেঁচে থাকুক। নুরুল আলম তাঁদের একজন। বুচিদংয়ের বাসিন্দা ছিলেন। চিকিৎসক বাবা, শিক্ষক চাচা ও বড় ভাইকে বিভিন্ন সময় সরকারি কর্তৃপক্ষ তুলে নিয়ে গেছে। তবু তাঁরা মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। এই দফায় আর পারেননি। পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছেন। নুরুল আলম বলেন, মিয়ানমারেও মুসলিমরা পঞ্চম শ্রেণির পর এখন আর পড়ার সুযোগ পায় না। লেখাপড়া বলতে মাদ্রাসাশিক্ষা। গোটা জনগোষ্ঠীই বলতে গেলে অশিক্ষিত। শরণার্থী শিবিরেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বা বৃত্তিমূলক কাজের তেমন সুযোগ নেই। তিনি যতটুকু জানেন, মেয়েকে ততটুকু শেখাবেন। তারপর কী হবে জানেন না। শুধু জানেন এ জীবন গ্লানির। কেউ সম্মান দেয় না।

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

বাবা, ভাই ও ছেলের হাতেই মুসলিম নারীরা বঞ্চিত হয়েছে বেশি

শাইখ আবদুস সালাম আজাদী: -“সালাম ভাই, ঈদের দিনে আপনাকে এইভাবে বলছি বলে রাগ কইরেন না”। ...