বৃহস্পতিবার, ২০শে জুন, ২০১৯ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ সকাল ৯:০০
Home / কুরআন / কথায় কথায় নাস্তিক মুরতাদের ফতোয়া : একটি পর্যালোচনা

কথায় কথায় নাস্তিক মুরতাদের ফতোয়া : একটি পর্যালোচনা

মুফতি রেজাউল কারীম আবরার :
ইলমের সাথে সামান্য সম্পর্ক রাখে, তারা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর নাম  শুনেছে। যারা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর লিখিত ‘আদ দুরারুল কামিনাহ’ (১/১৪৪-১৬০) থেকে তাঁর জীবনী পড়েছেন, তারা জানেন ইবনে তাইমিয়া রহ. এর যাল্লাতের কথা। তাহকীকের নামে তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা পূববর্তী কারো থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা যাহিদ কাউসারী রহ. এর লিখিত “আস সাইফুল সাক্বীল ফির রাদ্দি আলা ইবনে যাফিল’ যারা দেখেছেন, তারা হয়তো ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বিচ্যূতি কত মারাত্মক তা আঁচ করতে পেরেছেন। শায়খুল ইসলাম তাকী উসমানী দা.বা. তাঁর লিখিত সফরনামা ‘সফর দর সফর’ (৮৭-৮৯) এ  সংক্ষিপ্ত হলেও অত্যান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে।
আল্লাহ রহম করুন শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার উপর, যদি তিনি মিযযী, যাহাবী, ইবনুল কায়্যিম এবং ইবনে কাসীরের যুগে না হয়ে বর্তমানের আল্লামাদের যুগে হতেন, তাহলে ফতোয়ার কি ঝড় তাঁর উপর বয়ে যেতো!
.
কুফরের ফতোয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সঙ্গীন মাসআলা। কাউকে কাফের, মুরতাদ, নাস্তিক ফতোয়া দেওয়া এতটা সহজ ছিলোনা পূর্ববর্তীদের নিকট। যতটা সহজ করে নিয়েছে ফেইসবুকের কথিত মূর্খ আল্লামারা! এখানে আমি শুধু হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফতোয়া  আলমগীরী’-থেকে একটি উদ্বৃতি পেশ করছি।সেখানে বলা হয়েছে:
إذَا كَانَ فِي الْمَسْأَلَةِ وُجُوهٌ تُوجِبُ الْكُفْرَ ، وَوَجْهٌ وَاحِدٌ يَمْنَعُ ، فَعَلَى الْمُفْتِي أَنْ يَمِيلَ إلَى ذَلِكَ الْوَجْهِ كَذَا فِي الْخُلَاصَةِ فِي الْبَزَّازِيَّةِ إلَّا إذَا صَرَّحَ بِإِرَادَةٍ تُوجِبُ الْكُفْرَ ، فَلَا يَنْفَعُهُ التَّأْوِيلُ حِينَئِذٍ كَذَا فِي الْبَحْرِ الرَّائِقِ ،
, যদি কোন ব্যক্তি অস্পষ্ট কোন কথা বলে, যার নিরানব্বইটি ব্যাখ্যা হল কুফর। কিন্তু একটি ব্যাখ্যা এমন রয়েছে, যা সঠিক। তাহলে মুফতীর জন্য জরুরী হল নিরানব্বইটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ঐ একটি ব্যাখ্যা গ্রহণ করে তাকে কাফের ফতোয়া প্রদান থেকে বিরত থাকা। তবে শর্ত হল, ঐ ব্যক্তি তার কোন কথা বা কাজ দ্বারা যদি কোন নির্ধারণ না করে দেয়। (ফতোয়া আলমগীরী,  ৩/৩১২)
ফতোয়া আলমগীরীর ইবারত সামনে রাখুন আর বর্তমানে প্রতিদিন কয়েকবার কুফরী ফতোয়া দানকারী মুফতী সাহেবদের প্রতি লক্ষ করুন, একজনের বক্তব্য যেখানে কুফরের লেশ নেই, সেটাকে টেনে একদম ঈমানহারা বানিয়ে ফেলছেন! একজন মানুষকে কখন আপনি নাস্তিক, মুরতাদ, কাফের বলতে পারেন? বিষয়টি লম্বা আলোচনার দাবী রাখে। প্রথমে এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস শুনুন। তিনি বলেন:
” ثلاث من أصل الإيمان الكف عمن قال لا إله إلا الله ولا نكفره بذنب ولا نخرجه من الإسلام بعمل…..
অর্থাৎ তিন জিনিস হল ঈমানের মূল। সেই লোক সম্পর্কে বিরত থাকা যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়েছে। কোন গোনাহের কারণে আমরা তাকে কাফের বলবোনা এবং কোন আমলের কারণে ইসলাম থেকে বের করে দিবোনা। (আবু দাউদ, ২৫৩২ শায়খ মুহি উদ্দীন আবদুল হামীদ তাহকীককৃত। সুনানে সাইদ বিন মানসুর, ২৩৬৭, মাকাতাবাতুশ শামেলা)
মানুষ ভুল করতেই পারে! হয়তো আপনার  ইজতেহাদে মনে হতে পারে তিনি ভ্রান্ত! তাই বলে তাকে একেবারে ইসলামের গন্ডি থেকে বের করে দিয়ে প্রতিদিন ফতোয়া প্রদান!!
শরীয়তে যারা আহলে কিবলা, তাঁদেরকে ও ‘কাফের’ ফতোয়া প্রদান করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে দ্বীনের আত্যাবশ্যকীয় কোন বিষয় অস্বীকার করলে ভিন্ন কথা। এ প্রসঙ্গে কয়েকজন ইমামের বক্তব্য তুলে ধরছি।
মোল্লা আলী কারী রহ. বলেন:
“إعلم أن المراد بأهل القبلة الذين اتفقوا على ماهو من ضروريات الدين كحدوث العالم وحشر الأجساد وعلم الله تعالى بالجزئيات وماأشبه ذلك من المسائل المهمات فمن واظب طول عمره على الطاعات والعبادات مع اعتقاد قدم العالم ونفي الحشر أو نفي عمله سبحانه تعالى بالجزئيات لا يكون من أهل القبلة وإن المراد بأهل القبلة عند أهل السنة انه لا يكفر ما لم يوجد شيئ من امارات الكفر ولم يصدر عنه شيئ من موجباته.
অর্থাৎ আহলে কিবলা দ্বারা উদ্দেশ্য হল যারা দ্বীনের আত্যাবশ্যকীয় বিষয়ে সকলের সাথে একমত। যেমন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া, কিয়ামতের দিন মানুষের আমলে হিসাব-নিকাশ সহ অন্যান্ন আকীদা। যে ব্যক্তি জীবনভর আল্লাহর আনুগত্য করল, কিন্তু সাথে সাথে আকীদা পোষণ করল পৃথবী চিরস্থায়ী, হিসাব-নিকাশ মিথ্যা। তাহলে সে আহলে কিবলা হবে না। আহলে কিবলা দ্বারা আহলুস  সুন্নাহ এর নিকট উদ্দেশ্য হল: কুফর সংক্রান্ত কোন আকীদা প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে কাফের বলা যাবেনা। (শারহু ফিকহিল আকবার,  পৃষ্টা নং, ১৮৯)
আল্লামা ফাখরুল ইসলাম বাযদাওয়ী “কাশফুল আসতার” ইজমা সংক্রান্ত আলোচনায়, ইমাম সাইফুদ্দীন আমুদী এবং “গায়াতুত তাহকীক শরহে হুসামী”তে রয়েছে:
“وإن غلى فيه حتي وجب إكفاره به لايعتبر خلافه و وفاقه أيضا لعدم دخوله في مسمى الأمة المشهود لها بالعصمة وإن صلى إلى القبلة واعتقد نفسه مسلما لأن الأمة ليست عبارة عن المصلين إلى القبلة.بل عن المؤمنين وهو كافر وإن كان لا يدري أنه كافر.
অর্থাৎ অর্থাৎ যদি সে কূপ্রবৃত্তির অনুসরণে বাড়াবাড়ি করে, যার কারণে কাফের হওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়, তাহলে এর কারণে ইজমা এর মধ্যে তার বিরোধিতার কোন প্রভাব পড়বে না। যদিও সে কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়ে। নিজেকে মুসলমান দাবী করে। কেননা উম্মত কেবলার দিকে মুখ করে নামায আদায়কারীর নাম নয়। বরং মুমীনদের নাম। আর সে হল কাফের। যদিও নিজেকে সে কাফের মনে না করে। (আল ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম, ১/২১৪ দারুল কুতুবিল আরাবী, বায়রুত)
আল্লামা ইবনে আবীদীন শামী রহ. ইবনুল হুমামের “তাহরুরীল উসূল”এর হাওয়ালায় লিখেন:
إذ لا خلاف في كفر المخالف في ضروريات الإسلام من حدوث العالم وحشر الأجساد ونفي العلم بالجزئيات وإن كان من أهل القبلة المواظب طول عمره على الطاعات كما في شرح التحرير
অর্থাৎ দ্বীনের আত্যাবশ্যকীয় বিষয়কে যারা অস্বীকার করবে, তাদের কুফরীর ব্যাপারে করো কোন মতানৈক্য নেই। যদিও সে আহলে কিবলা। সারা জীবন আল্লাহর আনুগত্য করছে। (ফতোয়া শামী, ৪/২৪৩ দারুল কুতুবিল আরাবী।)
আল্লামা ইবনে নুজাইম মিশরী বলেন:
فالحاصل أن المذهب عدم تكفير أحد من المخالفين فيما ليس من الأصول المعلومة من الدين ضرورة ،
দ্বীনের মূল উসূল ব্যতিত যদি অন্য কোন বিষয়ে মতানৈক্য করে, তাহলে তাকে কাফের বলা হবেনা।( আল বাহরুর রায়েক, ৩/৪০১ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বায়রুত।)
ইলমে আকায়িদের প্রসিদ্ধ কিতাব “আল মাওয়াকিফ” এর মধ্যে রয়েছে:
“لايكفر أهل القبلة إلا فيما فيه انكار ما علم مجيئه به بالضرورة أو اجمع عليه كإستحلال المحرمات.
অর্থাৎ আহলে কিবলাকে কাফের বলা হবেনা। তবে যে দ্বীনের আত্যাবশ্যকীয় বিষয়কে অস্বীকার করবে, যে বিষয়ে সকলে ঐক্যমত, তাহলে তাকে কাফের বলা হবে। যেমন কেউ হারামকে হালাল মনে করল। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১/১০৫)
“কুল্লিয়াতে আবুল বাকা” এর মধ্যে রয়েছে:
“فلا نكفر أهل القبلة ما لم يأت بما يوجب الكفر وهذا من قبيل قوله تعالى إن الله يغفر الذنوب جميعا مع أن الكفر غير مغفور ومختار جمهور أهل السنة من الفقهاء والمتكلمين عدم إكفار أهل القبلة من المبتدعة المأولة في غير الضرورة لكون التاويل شبهة كما في خزانة الجرجاني والمحيط البرهاني وأحكام الرازي وأصول البزدوي. وراه الكرخي والحاكم الشهيد عن الإمام أبي حنيفة والجرجاني عن الحسن بن زياد وشارح المواقف والمقاصد ولأمدي عن الشافعي والأشعري لا مطلقا.
অর্থাৎ আমরা আহলে কিবলাকে কাফের বলবোনা। যতক্ষণ পর্যন্দ তাদের থেকে কুফরকে ওয়াজিবকারী কোন কাজ প্রকাশ পাবেনা। এটার উদাহরণ হল: যেমন আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন “আল্লাহ সমস্ত গোনাহকে মাফ করে দেন” অথচ তিনি কুফরকে মাফ করেননা। আর আহলে সুন্নাহ এর অধিকাংশ ইমামদের বক্তব্য হল: যে বেদয়াতী দ্বীনের আত্যাবশ্যকীয় বিষয় ছাড়া অন্য কোথাও তাবীল করবে, তাকে কাফের বলা হবেনা। যেমনটা আছে! খিজানাতুল জুরজানী” ও “মুহিতুল বুরহানী”, আহকামে রাযী” এবং “উসূলে বাযদাভী”তে। আর ইমাম কারখী এবং হাকিম শাহীদ রহ. ইমাম আবু হানীফা থেকে এমনটা রেওয়ায়াত করেছেন। আর জুরজানী হাসান ইবনে জিয়াদ থেকে এবং আমুদী, মাওয়াকিফের ব্যাখ্যাকার ইমাম শাফেয়ী এবং আশআরী রহ. থেকে এমনটি রেওয়ায়াত করেছেন। (কুল্লিয়াতু আবুল বাকা, পৃষ্টা নং, ৫৫৪)
শরীয়তে একজন ‘আহলে কিবলা’-কে কাফের, মুরতাদ ফতোয়া দিতে কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করেছে! নফসের সাথে জিহাদ বড় জিহাদ, শালিনতার সাথে নিজেকে আবৃত রাখলে হিজাবের প্রয়েজান নেই এমন বক্তব্য কেউ দিলে আপনার ইলম অনুযায়ী তাঁর পর্যালোচনা করার অধিকার অবশ্যই  রয়েছে! হিজাবের বিষয়টি অন্তত ভাইয়েরা আল্লামা যাহিদ কাউসারী রহ. এর লিখিত মাকালা ‘হিজাবুল মারআহ’ এবং আবু মুয়াজ তারেক বিন আউযুল্লাহ এর কিতাব  “النقد البناء لحديث أسماء في كشف الوجه والكفين للنساء” বইটি পড়ার অনুরোধ থাকলো।
একজনের কার্যকলাপ আপনার কাছে ভালো না লাগতে পারে! তাকে  মনে হতে পারে গাদ্দার! আপনি থাকে ইচ্ছামত গালিগালাজ করেন! কোন সমস্যা নাই! কিন্তু কাউকে নাস্তিক, মুরতাদ ফতোয়া দেওয়ার আগে অন্তত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীসটি মনে রাখবেন:
 أجرأكم على الفتيا أجرأكم على النار
অর্থাৎ যারা দ্রুত ফতোয়া দেয়, তারা দ্রুত জাহান্নামে যাবে। (সুনানে দারেমী, হাদীস নং ১৫৭)
মাওলানা নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ.কে আশা করি সবাই চিনেন। তাহকীকের ক্ষেত্রে উনি ইমাম বুখারী থেকে শুরু করে কাউকে সমালোচনা থেকে বাদ দেনন্ িইমাম বুখারী, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমীযীর কিতাবকে দুই ভাগে ভাগ করে তিনি তাঁদেরকে হাদীস শিখিয়েছেন! আশ্চর্য কথা হলো: যিনি ইমাম বুখারী, মুসলিমদের মতো মহান জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের সমালোচনাকে জায়েয মনে করতেন, কিন্তু তাঁর সমালোচনা কেউ করুক এটা তিনি সহ্য করতে পারতেননা। আলবানী রহ. এর লিখিত ‘সিফাতু সালাতিন নাবী’ এর ভূমিকা যারা পড়েছেন, আশা করি তাঁদের নিকট বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি কী  বিশ্রী ভাষায় তাঁর পর্যালোকদের বকেছেন!
ফেইসবুকে ইদানিং কিছু সেলিব্রেটি এ রকম দাঁত গজিয়েছেন! যারা সর্বক্ষণ অন্যের সমালোচনা এবং পর্যালোচনা নিয়ে ব্যস্থ! কিন্তু যখন তাকে অথবা তাঁর দলের কাউকে নিয়ে কেউ লেখে, তখন তিনি চেতনার ফেরি করে বেড়ান! তখন নসীহত করেন আমাদের মুখে বড়দের সমালোচনা মানায়না! আল্লাহ তুমি আমাদের রক্ষা করো।

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

আদর্শ দাম্পত্য জীবনের উপমা

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ শিক্ষক ও লেখক কিছু দিন আগে আমার এক প্রিয় তালিবে ইলম দেখা করতে ...