রবিবার, ৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ৯:২১
Home / আকাবির-আসলাফ / ঝরে পড়া এক মনিষী মহান!

ঝরে পড়া এক মনিষী মহান!

মুহাম্মাদ নাজমুল ইসলাম :

জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই যারা আমরণ সাধনা করেন। তাদের লক্ষ্য থাকে অনেক বড় হওয়া। ধ্যানে জ্ঞানে পরমে থাকে ডানা মেলে আকাশে উড়বার অদম্য বাসনা। তাদের অনেকে বড়ও হন একদিন। যশ-খ্যাতি তাদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। সবাই তাদের চেনে। শ্রদ্ধা করে। বরণ করে। তারা নন্দিত। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ আমাদের সবার আড়ালে থেকে জীবনযাপন করে এ দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে যান। যারা নীরবে নিরালায় সবার অজান্তে মানুষের জন্য, সমাজের কল্যাণে, দেশের হিতে এবং বিশ্ব মানবতার সেবায় তিলতিল করে আপন অস্তিত্ব বিকিয়ে দিয়ে চলেছেন। জীবনের উষালগ্ন থেকে যারা ব্রতী হয়েছেন উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে, আদর্শ জাতি গঠনে এবং বিশ্ব সংসারের কুশল কামনায়। সাফল্য ও কর্মবৈচিত্রের এই পড়ন্ত বেলায়ও যারা নিরন্তর সাধনা করে চলেছিলেন। তাদের ভুলে যাওয়া বড় অন্যায়। বরং তারাইতো বেশী শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আসে অন্তরের গহীন থেকে। তাদের গলায় সাফল্যের মালা দান হয় ভালোবাসার টানে, আত্মার শক্তিতে। তাদের মহানুভবতা আকাশসম বরং তারও ওপরে।

এমনভাবে কোনো কোনো মানুষ সবার প্রিয় হয়েও বাস করেন নিভৃতে। কোনো কোনো মানুষ সবার মান্য হয়েও বাস করেন নিঃশব্দে।তারা আল্লাহর দুনিয়ায় এসে আল্লাহর দীনের কাজে ডুবে থাকেন। নিজের চেষ্টা, শ্রম-সাধনা বিলিয়ে যান অকাতরে। আর সেটা দেওয়াটাই থাকে তাদের কাজ। নির্দিষ্ট সময় এলে আবার আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে যান। দুনিয়ার মানুষ তাকে হারিয়ে বুঝতে পারে-তিনি কতো বড়ো আশ্রয় ছিলেন। কতো বড়ো ঠিকানা ছিলেন।কতো বড়ো মনীষী ছিলেন।তখন মানুষ শোকে-কেদে বুক ভাসায়। এমনি একজন মানুষ,সর্বজনমান্য আল্লাহর ওলী,উস্তাদুল আসাতিযা,মুস্তাজাবুদ দাওয়াত,আল্লামা হুসাইন আহমাদ মাদানি রাহ.’র অন্যতম স্নেহাশিস ও ছাত্র মাওলানা আব্দুল হক্ব আ’জমী রাহ. আমাদের ছেড়ে মাওলানার সান্যিধ্যে চলে যান ৩১/১৩/১৬ঈসা.রোজ শুক্রবার বাদ মাগরীব।

আহ! চলে গেলেন শায়খে সানি। বিদায় নিলেন এ নশ্বর ধরণী থেকে।মিলিত হলেন রফীক্বে আ’লার সাথে। এতোদিন বলেছি আদামাল্লাহ,হায়্যাহুল্লাহ আর এখন বলতে হচ্ছে রাহিমাহুল্লাহ।

শায়েখে ছিলেন আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন।আত্মার খোরাক,মনের শান্তি,চোখের শীতলতা,ক্লান্তির অবসান,আমাদের একটু পেরেশানীর হাজারো শান্তনার ক্ষেন্দ্রবিন্দু।

শায়েখ প্রায় ৩৪ বছরই শুধু মাদরে ইলমি দারুল উলূম দেওবন্দ কুতুবে সিত্তাহ’র মাশহুর কিতাব সহিহ বুখারি শরিফ দ্বিতীয় খন্ড -এর দরস প্রদান করে। শায়খের দরসটা থাকতো সবসময় প্রাণবন্ত। সাধারণত শেষ দিকে এসে শারারিক অসুস্থতার কারণে হুইল চেয়ারে করেই দরসে আসতেন। আসা-যাওয়াবস্থায় মুখে থাকতো সবসময় যিকিরের ধ্বনি। দরসে কিছুটা গরম মেজাযের মনে হলেও যে-ই হজরত’র কাছে যেতো মুহূর্তেই আপন করে নিতেন।সবসময় সবার হালপুরসি করতেন।সামান্য হলেও কিছু দ্বারা আতিথেয়তা করতেন।এটা ছিলো হজরতের অনন্য এক আখলাক।

শায়েখ ছিলেন মাদানি রহ.-এর অন্যতম মুহাব্বাতের এক ছাত্র। শায়েখ রাহ. বুখারি ১ম ২য় ছাড়াও তিরমিজি শরিফ প্রথম খন্ড মাদানি রহ.-এর কাছে পড়েন।এবং তিরমিজি দ্বিতীয় খন্ড ও শামিয়ল এবং সুনানে আবু দাউদ আল্লামা ইবরাহিম বলয়াবি রহ.-এর কাছে অধ্যায়ন করেন। শায়েখ রহ. মাদানি রহ.-এর কাছে বুখারি পড়াকালীন বুখারি শরীফ’র একটা সবকও ছুটেনি। সবসময় দরসের পাবন্দি করতেন।

আমরা যখনই শায়েখ’র কাছে যেতাম।অনেক মুহাব্বাতে আগলে নিতেন।বলতেন সবসময় নিজের সময়কে কিতাবাদি পড়ায় কাটাবে। মনোযোগ দিয়ে পড়বে।বুঝে বুঝে পড়বে। উস্তাদদের খেদমত করবে। পাচওয়াক্ত জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের পপাবন্দি করবে।কখনও অলসতাবসত নামাজ ফাকি দেবে নানা। দেখবে জীবনটা অনেক শানদার হবে। আল্লাহ ইজ্জতের জিন্দেগি নসিব করবেন

শায়েখ’র মৃত্যুর আগেরদিন বিকেলেও কিছু ছাত্র গিয়েছিলো উনার খেদমতে।ওদের জিজ্ঞেস করেন-কিরে তোমরা ছুটি কিভাবে কাটাচ্ছো। সবাই বলল আলহামদুলিল্লাহ্‌ শায়েখ পড়ালেখায়ই কাটাচ্ছি। একজন বলল শায়েখ! ইচ্ছা ছিলো এ ছুটিতে হিন্দের কিছু পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখবো। বললেন,আরে ভাই!
এসবে ঘুরে বেপর্দা নারীদের দেখে গুনাহ কামিয়ে লাভ কি?
এর চেয়ে ভালো ওই রুপি দিয়ে ছুটিতে ভালো খাবার খাও। তাহলে শরীরের সুস্থতা বাড়বে। ভালো করে পড়ালেখা করতে পারবে।

শায়েখ রহ. দরস তদরিস এর পাশাপাশি ইলমি সফরে বিভিন্ন দেশ ও সফর করেন।অনেকবার বাংলাদেশও সফর করেন।এবং বিভিন্ন মাহফিল, খতমে বুখারি ও দোয়া মাহফিলে শরিক হোন।বাংলাদেশেও শায়েখের ছাত্রের সংখ্যা অনেক। শায়েখ নিজেই বলতেন আমার শুধু হাদিসের ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজারের চেয়েও বেশি।

উল্লেখ্য যে, শায়খে সানি রহ.১৩৪৫ হিজরি মোতাবেক ১৯২৮ খৃস্টা.আজমগড় এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন।প্রাথমিক লেখাপড়া নিজের এলাকায়ই করেন।পরবর্তীতে দারুল উলূম চলে আসেন এবং ১৯৪৯খৃস্টা. দারুল উলুম থেকে তাকমিল (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে শায়েখ তিনটে বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে করেন আজমগড়’র বসিয়া গ্রামে। এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেন আজমগড়’র  নন্দুয়া গ্রামে। এবং তৃতীয় বিয়ে করেন ইউপি’র প্রসিদ্ধ এলাকা বানারসে। তিন বিয়ের ঔরসে শায়েখ ৬ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন।

অবশেষে লাখো আলেম-তালাবা ও তাওহিদি জনতার উপস্থিতিতে দারুল উলূমের নওদারা আঙিনায় হজরত-এর শেষ জানাযার নামাজ পড়ান আওলাদে রাসূল, সদরে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ মাওলানা সায়্যিদ আরশাদ মাদানি হাফিযাহুল্লাহ। নামাজ শেষে হজরতকে ‘আকাবিরের কবরের মিছিল’ মাকবারায়ে কাসিমিতে দাফন করা হয়।

দোয়া করি,আল্লাহ যেন শায়খে সানি রহ.-এর মাকামকে আরো উচু করেন। জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।এবং আমরা সকল ছাত্রকে তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন।আমিন।

লেখক: শিক্ষার্থী, দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত।

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

প্রশ্নপত্র ফাঁস সমাচার, বেফাক ও হাইয়ার দ্বায়!

খতিব তাজুল ইসলাম: কলামের শুরু এবং শেষ নিয়ে বেশ বিব্রতে আছি। পুরাটাই আগুছালো অবস্থা। স্বকীয়তার ...