মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১২:৫৭
Home / কওমি অঙ্গন / লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নঃ চেতনায় দেওবন্দ!

লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নঃ চেতনায় দেওবন্দ!

এহতেশামুল হক ক্বাসিমী :

একবিংশ শতাব্দী। নশ্বর ধারিত্রির সংকটময় এক কন্টক শতক। এর  সূচনা হয়েছে সবেমাত্র।  ষোল বছর আগে।  নিয়ে এসেছে অনেক আবর্তন বিবর্তন। আভাস দিয়ে যাচ্ছে এক কটিন কালাবর্তের। এশতাব্দী প্রতিনিয়ত আমাদের নাড়া দিচ্ছে নতুন চিন্তা, নতুন ভাবনা ও নবতর প্রত্যয়ের। জানান দিচ্ছে বিশ্বের দৃশ্যপট পরিবর্তনের । ইঙ্গিত করছে ইতিহাসের নতুন পাঠ প্রবর্তনের।
চলমান এই শতকে বহুমাত্রিক সংকটের আবর্তে উপনীত মুসলিম মিল্লাত। একটি চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রান্ত করছে মুসলিম জাহান। ‘আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহিদা’ বাস্তবে ছিলো সর্বযুেগে। কিন্তু ‘আল মুসলিমু আখুল মুসলিম’ ছিলো শুধু খাইরুল করুণে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ধ্বংসলীলায় শয়তানী শক্তিগুলো আজ কঠোরভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা আমাদের মাঝে অনৈক্যের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। আমরা ক্রমশ নেতৃত্বশূন্য হতে চলেছি। অমাদের মাঝে অশান্তির দাবানল জ্বেলে দিয়েছে বেদীনেরা।
ইসলামের বৈরীচক্রের যুলুম নির্যাতন শুধু বাহ্যিক তথা শারীরিকভাবে মুসলিম উম্মাহকে ঘায়েল করছে না; তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ছলছাতুরি ও ষড়যন্ত্রের কাছে আমরা দিন দিন অসহায় হয়ে পড়েছি। কুফরী শক্তির বহুমূখী আগ্রাসন আমাদেরকে কুপোকাত বানিয়ে ফেলেছে।
দারিদ্রতার সুযোগে সরলমনা মুসলমানদের ধর্মান্তকরণ, নাস্তিক্যবাদ ও সেকুলারিজমের আগ্রাসন, লা-মাযহাবী ও মুসতাশরিকীন তথা প্রাচ্যবিদদের ভয়ালদর্শন, বিদআতী ও কাদিয়ানী ফিতনাসহ সর্বোপরি খ্রীষ্টান মিশনারি ও এনজিওদের অপতৎপরতা গত বিংশ শতাব্দীর তুলনায় চলমান শতাব্দীতে খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে। সবগুলো অপশক্তি আজ একযোগে আমাদের উপর হামলে পড়েছে। এগুলোর সমুচিত জবাবে আমরা আজ দাঁড়াতে পারছি না। একদিকে আমরা বহুমূখী ফিতনা ও ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হয়ে পড়েছি, তো অপরদিকে আমরা পরস্পর গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে লিপ্ত রয়েছি। পশ্চিমা কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির নর্দমায় পড়ে আমাদের সমাজ আজ দুর্গন্ধময় হতে চলেছে। ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুন ধীরে ধীরে সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়ে পড়ছে।

দুই.
একুশ শতকের প্রথম যুগতক সবুজ বাংলায় আমাদের উলামায়ে কেরামের যে শক্তিটুকু অক্ষত ছিলো তাও একটি অদূরদর্শী আন্দোলনের দায়ে আজ খর্ব হয়ে পড়েছে। কথাটি শক্ত হয়ে গেলো; কিন্তু এছাড়া আর কী বলার আছে! নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আন্দোলনটির এপীঠ ওপীঠ পর্যালোচনা করলে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটাই ভারী হয়ে উঠে। এই অপরিণামদর্শী আন্দোলন আমাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল শক্তিকে আজ স্তব্দ করে দিয়েছে। এই আন্দোলন থেকে জাতির শিক্ষা এটাই যে, এমন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে নেই। এত সমর্থন  ও জনবল থাকতে আন্দোলনটি ব্যর্থ হলো কেনো, উহুদ যুদ্ধের ইতিহাস জানা থাকলে তার জবাব অতি সহজেই পাওয়া যায়।
আকাবির ও আসলাফের যামানায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। এসব আন্দোলনে অতবেশি জনবল ছিলো না; কিন্তু তারপরেও তাদের সবগুলো আন্দোলন বিপ্লব সফলতার মুখ দেখেছিল। তাই হাতাইস দফার আন্দোলন নিয়ে আমাদের চিন্তার প্রয়োজন। প্রয়োজন আত্মসমালোচনার।
আমাদের হিংসা-বিদ্ধেষ ও পরস্পর কাদা ছুড়াছুঁড়ি এখন ষোলকলায় টইটুম্বর। গত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। মাঝভাগ ও উপরিভাগ সরাসরি না দেখলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর ইতিহাস পাঠ করেছি। তখন উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে রাজনৈতিক এখতেলাফ থাকলেও তাদের সবাই পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও পরস্পরের মাঝে শ্রদ্ধাবোধ ছিলো অপরিসীম। ছিলো না কোনো নেতিবাচক আচরণ। তখন ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনটাও ছিলো পরম সরগরম। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। ইসলামী রাজনীতির নাজেহাল অবস্থা ও বেহালদশা আমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ময়দানে আমরা আজ পরাস্ত হতে চলেছি। সিংহভাগ উলামায়ে কেরাম রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছেন। একদিকে বিভিন্ন দল উপদলে ইসলামী রাজনীতির ময়দান খণ্ড বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। অপরদিকে দলীয় কোন্দল ঘৃণ্যরূপ ধারণ করেছে। ফলে ইসলামী রাজনীতি দিন দিন কলুষিত হয়ে উঠছে। পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও কাদা ছুড়াছুড়ি আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক ডাল ভাতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন.
একসময় সরকারী গোয়েন্দা ও বাম মিডিয়ার নজরদারিতে আমরা তটস্ত ছিলাম। তারা আমাদের দুর্বলতা খুঁজে বেড়াতো। এখন তাদের দায়িত্ব স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের কিছু ভাই সম্পাদন করে নিচ্ছেন। দোস্ত- দুশমন সবার সামনে আমাদের লুকায়িত মন্দ-দোষ তারা অনায়াসেই গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন। আত্মসমালোচনার নামে আত্মঘাতী এই প্রবণতা পুরো কওমী অঙ্গনকে খাদের কিনারায় এনে দাড় করিয়েছে। এ নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাবার কেউ নেই! কওম ও মিল্লাতের দরদীরা একে একে পাঁড়ি জমাচ্ছেন পরপারে। তাদের সিলসিলা খতম হতে আর বেশ দেরী নেই। তখন এতীম উম্মতের কী হাল হবে আল্লাহই ভালো জানেন।
আমরা চরম বিপদে অাছি। জাতির বিবেকবান উলামা হযরাত কোনো একটি বিষয়েও একমত হতে পারছেন না। স্বীকৃতির চলমান ইস্যু নিয়ে আমরা কত জল ঘোলা করছি; কিন্তু এর সুরাহা করতে পারছি না। ফলে যা হবার তা-ই হচ্ছে, আমরা সরকারের নাচের পুতুল হয়ে পড়েছি। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে কুয়াশাচ্ছন্ন। আগামী প্রজন্ম হবে অনুজ্জ্বল তিমিরাচ্ছন্ন। তাই চিন্তার প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনের তাগিদেই ‘চেতনায় দওবন্দ’র ছায়ায় বৃহৎঐক্যের  আয়োজন। আমাদের জানা থাকা দরকার, সুস্থ ও সম্মিলিত চিন্তার বাস্তবায়ন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে এই মহাসংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।

চার.
গত শতকের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক, শুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পতাকাবাহী এক বিস্ময়কর কাফেলার নাম উলামায়ে দেওবন্দ। শাহজালাল মুজাররদে ইয়ামনী রাহ. এর পদভারে ধন্য, শাহজালালে সানী শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদাননী রাহ. এর পদস্পর্শে ঋদ্ধ আমাদের এই সিলেট বহু আগ থেকেই দেওবন্দিয়াত ও ক্বওমিয়াতের লালনভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সেই লালনভূমি এখন যেনো চেতনা শূন্য হতে চলেছে। বর্তমান দুনিয়ায় অস্ত্রের লড়াই যতটা হচ্ছে। এর চেয়ে ঢের বেশি চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই লড়াইয়ে ঠিকে থাকতে হলে কওমি ঘরাণার আলিমদের ঐক্যের বিকল্প নেই। আকাবির ও আসলাফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বর্তমান প্রজন্মের আলেমদের এককাতারে দাঁড়ানো সাম্প্রতিককালের ঐকান্তিক দাবী।
তরুণদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম তৈরির লক্ষ্যে কিছু ভাইয়ের আহ্বান ও দেশি-বিদেশি দেওবন্দী দর্শনের অনেক ভাইয়ের নিষ্ঠাপূর্ণ উৎসাহে গত ৩রা নভেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা ২ টায় টিলাগড়স্থ ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় একটি সুন্দর ঘরোয়া জনাকীর্ণ ‘মজলিস’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তরুণদের আবেগমথিত বক্তব্য সবাইকে অনুপ্রাণিত করে,  উজ্জীবিত করে তুরে। তবে যেহেতু তরুণ কওমী প্রজন্মের সকল মতের আলিমগণ সেদিন উপস্থিত ছিলেন না।
এজন্যে মাওলানা মুজিবুর রহমার কাসিমী (মুহতামিম, জামেয়া দারুল হুদা সিলেট) হাফিজ মাওলানা ফখরুযযামান, মুহতামিম জামিয়া ফরীদাবাদ, মাওলানা জুনাইদ কিয়ামপুরী, মাওলানা এহতেশামুল হক ক্বাসিমী, মুফতী জিয়াউর রহমান সাহেবদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয় প্রতিনিধিত্বশীল তরুণ আলিমদের নিয়ে নতুন আরেকটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করার। তাদের সার্বিক চেষ্টা-প্রচেষ্টায় বিগত ২৬ নভেম্বর সাগরদীঘিরপার মসজিদে এলাহিতে অনুৃষ্ঠিত হয় মনোরম পরিবেশে একটি প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান।

পাঁচ.
একত্রিত হন বৃহত্তর সিলেটের কওমী অঙ্গনের তরুণ ও পৌঢ় প্রজন্মের ৫১ জন  উলামায়ে  কেরাম। সবার আবেগীকণ্ঠের একই উচ্চারণ, আমরা চাই ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধন। তাদের আলোচনায় ফোটে ওঠে নিম্নবর্ণিত প্রস্তাবাবলি-
১. দেওবন্দের অনুসারীদের সমন্বয়ে একটি সম্ভাবনাময়ী প্লাটফর্ম তৈরি করা।
২. দল-মত-পথসহ সকল প্রকার বিভেদের ঊর্ধ্বে ওঠে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল বাতিল শক্তির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
৩. উম্মাহর উপর আপতিত জুলুম-নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ।
৪. মিশনারীদের ধর্মান্তকরণ, কাদিয়ানী ফিতনা এবং নতুন শতকে কুরআন-হাদীস অনুসরণের মাধ্যমে ঈমান-আক্বিদা সংরক্ষণে কাজ করা।
৫. ইসলামী শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি রক্ষা প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে কাজ করা।

৬. ইসলামি শিক্ষার আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগিতার পলিসি নিয়ে কাজ করা।
৭. নতুন প্রজন্মের উলামাদের কাছে উলামায়ে দেওবন্দের ইতিহাস তুলে ধরা।
৮. সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদপত্র, টিভি-রেডিও ইত্যাদি গণমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহারে পদক্ষেপ-উদ্যোগ নেয়া।
৯. সকল মতভেদ ও ভুল বুঝাবুঝি নিরসনে মধ্যস্থতা-সমাধানে কাজ করা।
১০. সমাজে উলামাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি উলামাদের পারস্পরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সাহসী হওয়া।

১১. পদপদবির পদ্ধতিতে প্লাটফর্ম পরিচালনা না করে শুরাভিত্তিক পরিচালনা হওয়া।
১২. ইসলাহী ইজতেমার আয়োজন করা।
১৩. সর্বক্ষেত্রে দাওয়াতী কার্যক্রম বেগবান করা৷

লেখক : তরুণ মুহাদ্দিস ও কলামিস্ট

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

শবে বরাত মানে লাইলাতুন নিস্ফি মিন শা‘বান!

শবে বরাত সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস নেই? Mohiuddin Kashemi সাহেবের ওয়াল থেকে: অজ্ঞ, নির্বোধ কিংবা ...