মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ রাত ১:১৩
Home / পরামর্শ / অক্ষম প্রবীণদের রেখে তরুণ সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব দেওয়া হোক

অক্ষম প্রবীণদের রেখে তরুণ সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব দেওয়া হোক

মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন কাসেমী ::

দায়িত্বশীলের জন্যে দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক। প্রত্যেকের দায়িত্ব পালন না করা আমানতের খেয়ানত। দায়িত্ব পালনের জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাবলির সঙ্গে সক্ষম ও সামর্থ্যবান হওয়াও আবশ্যক। অর্পিত দায়িত্ব আঞ্জামে ব্যর্থ হলে নিয়োগ প্রদানকারীর ঘাড়েও দায়ভার আসবে।
দায়িত্ব পালনের জন্যে জ্ঞানগত যোগ্যতাও দরকার, শারীরিক সক্ষমতাও প্রয়োজন। নিজ কানে না শুনলে, নিজ চোখে না দেখলে, প্রয়োজনে সরেজমিনে না যেতে পারলে দায়িত্ব যথাযথ পালন করা কঠিনই বটে।
ইসলামে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই তাকে যে কোনো ধরনের দায়িত্ব দেওয়া যায়। বয়সের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। রাসুল সা. উসামা ইবনে যায়েদকে অল্প বয়সেই সেনাপতি বানিয়েছিলেন। তাঁর অধীনে অনেক প্রবীণ সাহাবি যুদ্ধ করেছেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. এর নেতৃত্বে প্রবীণ অনেক সাহাবি যুদ্ধে গিয়েছেন। কেউ তো বয়সের কারণে প্রশ্ন তোলেননি।
ভারত বিজয়ের সময় মুহাম্মদ বিন কাসিমের বয়স ছিল ১৭।
স্পেন জয়ের নায়ক তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন ১৯ বছরের যুবক।
তুরস্কবিজেতা মুহাম্মদ আল-ফাতিহের বয়স ছিল ২১।
কেউ তো প্রশ্ন তোলেননি।

আমাদের দেশে বয়স্ক অক্ষমদের দায়িত্ব দেওয়া একটি (অ) নিয়মে পরিণত হয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক মন্ত্রী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিংবা কার্যক্ষম। অতি বয়সের কারণে কথা মনে রাখতে পারেন না। দস্তখতও করতে অক্ষম।
এদের দেখাদেখিই কিনা ইসলামী ঘরানার লোকদের মাঝে এ রোগটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। সভাপতি, সেক্রেটারি, মহাসচিব ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও আরযালে উমর বা অতিশয় বৃদ্ধ লোকদের বসানো হয়। যারা ঠিকমতো চোখে দেখেন না, কানে শোনেন না, তারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করবেন কিভাবে? তখন তারা বহুলাংশে খাদেম ও সাহেবজাদাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
রাজনীতি, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রেই একই অবস্থা।
প্রবীণদের শ্রদ্ধা করা দরকার। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে। তাদের উপদেশ মতো চলতে হবে। কিন্তু তাই বলে তাদেরকে নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী বানানো যায় না। প্রতিটি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ না করলে তিনি সভাপতি থাকেন কিভাবে? এটা কি আমানতের খেয়ানত হবে না?
বেশি কিছু বলতে চাই না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে চিন্তা করুন, সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব না দেওয়ার কারণে কী ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
হযরত উমর রা. আমাদের উসওয়া, আদর্শ। তাঁর কর্মপদ্ধতি আমাদের জন্যে অনুসরণীয়। বিচারক, গভর্নর ও দায়িত্বশীল নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর কৌশল আমাদের কাজে লাগবে।
.
দায়িত্বশীলদের শক্তি ও সামর্থ্যরে (القوة والقدرة) অধিকারী হওয়া আবশ্যক :
হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যাকে মুসলমানদের কল্যাণে কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত করতে চাইতেন, তার জন্যে উক্ত দায়িত্বপালনে সক্ষম ও সামর্থ্যবান হওয়া আবশ্যক ছিল। যেন অর্পিত দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের হক ও অধিকার বিনষ্ট না হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :

لو علمتُ أنَّ أحداً من الناس أقوى عليه مني لكنت أُقدَّمُ فتُضربُ عنقي أَحبُّ إليَّ من أن أَليَه

-আমি যদি জানতে পারি যে, অন্য কোনো মানুষ এ কাজে আমার চেয়ে বেশি সামর্থ্যবান, তাহলে উক্ত দায়িত্ব আমাকে দেওয়ার চেয়ে আমার গর্দান কেটে ফেলা বেশি পছন্দ করব। ( . ইবনে সা’দ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা : খ. ৩, পৃ. ২৭৫)

তিনি আরো বলেন :

إني لأتحرج أن أستعمل الرجل وأنا أجد أقوى منه

‘আমি কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব অর্পণ করা থেকে বিরত থাকব- যদি তার থেকে অধিক শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান কাউকে পাই।’ ( . ইবনে সা’দ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা : খ. ৩, পৃ. ৩০৫)

أشكو إلى الله جلد الخائن وعجز الثقة

হে আল্লাহ তোমার কাছে বিশ্বাসঘাতকের কশাঘাত এবং বিশ্বোসযোগ্য ব্যক্তির অক্ষমতার অভিযোগ করছি। (আবদুর রহমান ইবনুল জাওযী প্রণীত তারীখে উমর ইবনুল খাত্তাব : প. ১৪২; আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রচিত ‘আসসিয়াসাতুশ শারঈয়্যাহ ফী ইসলাহির রাঈ ওয়ার রাঈয়্যাহ’ নামক গ্রন্থেও ভিন্ন শব্দে অভিন্ন মর্ম উল্লেখ হয়েছে : পৃ. ২১, মুদ্রণ : দারুল কিতাব আলআরাবী)

আরও বলেন :
لا يصلح هذا الأمر إلا بشدة في غير تجبر ولين في غير وهن
‘প্রশাসনের এই দায়িত্ব অহংকারমুক্ত কঠোরতা এবং দুর্বলতামুক্ত নম্রতা ছাড়া পালন করা যথাযথ হবে না।’ (ইমাম আবু ইউসুফ প্রণীত আলখারাজ : পৃ. ১১৮; প্রায় কাছাকাছি বিষয়বস্তু মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাকেও রয়েছে, কিতাবুল বুয়ু, অনুচ্ছেদ : বিচারক কেমন হওয়া কাম্য : খৃ. ৮, পৃ. ২৯৯)
আরও বলেন :

يأيّها الناس؛ إني قد ولّيت عليكم، ولولا رجاء أن أكون خيركم لكم، وأقواكم عليكم، وأشدّكم استضلاعاً بما ينوب من مهمّ أموركم، ما تولّيت ذلك منكم؛ ولكفيَ عمر مهماً محزناً انتظار موافقة الحساب بأخذ حقوقكم كيف آخذها، ووضعها أين أضعها؛ وبالسير فيكم كيف أسير! فربّي المستعان؛ فإنّ عمر أصبح لا يثق بقوّة ولا حيلة إن لم يتداركه الله عزّ وجلّ برحمته وعونه وتأييده.

‘আমাকে তোমাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আমি তোমাদের কল্যাণ করতে পারব, তোমাদের মাঝে অধিক সামর্থ্যবান হবো, তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পাদনে কঠোর হতে পারব। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে দায়িত্ব গ্রহণ করতাম না। উমরকে চিন্তান্বিত ও বিষণ্ন করার জন্যে এ চিন্তাই যথেষ্ট যে, আমি কোত্থেকে তোমাদের হক গ্রহণ করি আর কোথায় তা ব্যবহার করিÑ এ বিষয়ে যথাযথ হিসাব দেওয়ার চেষ্টায়রত এবং তোমাদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করি। আল্লাহই সাহায্য প্রার্থনার উপযুক্ত। কারণ, আল্লাহর রহমত, সাহায্য ও সমর্থন উমরের সঙ্গী না-হলে সে কোনো শক্তি, সামর্থ্য ও কৌশলের ওপর নির্ভর করে না।’ (আল্লামা ইবনে জারীর তাবারী প্রণীত তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক : খ. ৫, পৃ. ২৬)

হযরত উমর রা. কথা ও কাজে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেনও। একবার শোরাহবীল ইবনে হাসানাকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন, পরে তাকে বরখাস্ত করে মুআবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ানকে দায়িত্ব দেন। তখন তিনি বলেছিলেন :
أيّها الناس، إني والله ما عزلت شرحبيل عن سخطة، ولكني أردت رجلا أقوى من رجل.
‘হে লোকসকল! আমি শোরাহবীলকে ক্রোধ ও অসন্তোষের কারণে অপসারণ করি নি, বরং তার স্থানে অধিক সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে চেয়েছি।’
তদ্রƒপ আবু মারয়াম ইবনে সাবীহ আল-হানাফীকে দায়িত্ব দেওয়ার পর তার দুর্বলতা দেখতে পেয়ে তাকে বলেন :
لأعزلن أبا مريم وأولين رجلاً إذا رآه الفاجر فرِقَه
‘আমি অবশ্যই আমু মারয়ামকে অপসারণ করে তার স্থানে এমন একজনকে দায়িত্ব দেব, যাকে দেখে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।’ (সুনানে বায়হাকী, কিতাবু আদাবিল কাজী, অধ্যায় : বিচারকের সামনে বাদী-বিবাদীর কারো ঝগড়ার পবিষয়টি প্রকাশ পেলে তাকে নিষেধ করে দিবে : খ. ১০, পৃ. ১০৮; আলমুগনী : খ. ৯, পৃ. ৪৩, ১০৩; আখবারুল কুজাত : খ. ১, পৃ. ২৭৪)

পরবর্তী সময়ে বাস্তবেই উমর রা. আবু মারয়ামকে বসরার বিচারকের পদ থেকে বরখাস্ত করেন এবং কা’ব ইবনে সুরকে দায়িত্ব দেন।
ইবনুল জাওযী রহ. বর্ণনা করেন : হাসান বসরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রা. বলেছেন :

أعياني أهل الكوفة؛ فإن استعملت عليهم ليِّنا استضعفوه، وإن استعملت عليهم شديدا شكوه ولوددت اني وجدت رجلاً قوياً، أميناً مسلماً، أستعمله عليهم

‘কুফাবাসী আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। নরম ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী কাউকে তাদের দায়িত্ব দিলে তাকে দুর্বল মনে করে। আর কঠোর কাউকে পাঠালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে। সুতরাং অবশ্যই আমি এমন ব্যক্তির সন্ধানে রয়েছি, যিনি শক্তিশালী, বিশ্বস্ত ও মুসলিম হবে; তাকে আমি কুফার দায়িত্বশীল বানাব।’ (তারীখে উমর ইবনুল খাত্তাব : পৃ. ১৩৯-১৪০)

ইবনুল জাওযী রহ. আরও বর্ণনা করেন :

كتب عمر بن الخطاب رضي الله عنه إلى أبي عبيدة بن الجراح كتاباً فقرأه على الناس بالجابية: “أما بعد: فإنه لم يُقِم أمرَ الله في الناس إلا حصيف العُقدة، بعيد الغِرّة، لايطّلع الناس منه على عورة ، وولا يخشي في الحق علي جراة، ولا يخاف في الله لومة لائم، والسلام عليكم .

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আবু উবাইদা ইবনুল র্জারাহ রা. এর কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তিনি জাবিয়া নামক স্থানে পত্রটি পড়ে মানুষকে শোনান। পত্রে লেখা ছিল : ‘পরসমাচার এই যে, মানুষের মাঝে আল্লাহর বিধান একমাত্র সে-ই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যিনি শক্তিশালী অভিমতের অধিকারী হবেন এবং মুক্ত হবেন অলসতা থেকে। উপরন্তু লোকজন তার দুর্বলতার বিষয়ে অনবগত থাকে এবং সে সত্য প্রতিষ্ঠার কাজে সাহসিকতা প্রদর্শন করে আর আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরোয়া করে না। তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

লেখক : ভাষা গবেষক

About Abul Kalam Azad

mm

এটাও পড়তে পারেন

প্যান্ডেলের বাইরে সাউন্ড ব্যবহার করা নাজায়েয!

মুহিউদ্দীন কাসেমী: কিছুদিন আগে কী এক কাজে যেন ঢাকায় গেলাম। এশার সময় ট্রেনে ফিরলাম। স্টেশনে ...