শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
কমাশিসা পরিবারবিজ্ঞাপন কর্নারযোগাযোগ । সময়ঃ বিকাল ৫:২২
Home / অনুসন্ধান / দারুল উলূম দেওবন্দের ‘উসুলে হাশতেগানা’ কি ও কেন? (১)
দারুল উলূম দেওবন্দ

দারুল উলূম দেওবন্দের ‘উসুলে হাশতেগানা’ কি ও কেন? (১)

darul-uloom-dewbond

খতিব তাজুল ইসলাম ::

‘উসুলে হাশতেগানা’ বা ৮টি মূলনীতি নিয়ে আমরা ধারাবাহিক প্রতিবেদন পেশ করবো। ‘তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ’ থেকে নেয়া তথ্য থেকেই আমাদের বিশ্লেষণ।

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা কাসিম নানুতবী রাহ. এই আজিমুশ শান ইসলামি আন্দোলনকে উচ্চতার সর্বোচ্চ আসনে পৌছানোর জন্য এবং ধারাবাহিকভাবে যাতে আন্দোলনটি উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে গিয়ে পৌছে সেজন্য ৮টি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন । যা এই প্রতিষ্ঠানের সকল নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে বুনিয়াদী ভূমিকা পালন করবে।’

১ম মূলনীতি : ‘সর্বপ্রথম মূলকথা হলো, যথাসম্ভব মাদরাসার কর্মকর্তাগণ হর-হামেশা বেশি বেশি করে চাঁদা সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশ করবেন। নিজে চেষ্টা করবেন অন্যদের দ্বারাও করাবেন। মাদরাসার কল্যাণকামিরা সবসময় এ ব্যাপারে বিশেষ নজর রাখবেন।’

প্রেক্ষাপট : ঘরহারা, বাড়িহারা, রাজ্যহারা বিধ্বস্থ মুসলমানদের করুণ পরিস্থিতি। যুদ্ধের পর যুদ্ধ করে পর্যুদুস্ত অবস্থা। বিক্ষিপ্ত মুসলমান ও মুজাহিদিনদের সুসংগঠিত করা। প্রশিক্ষণ প্রদান। তা’লিম বা শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আদর্শ মানস গঠন ছিলো তখনকার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। যারা ছিলো রাজ্যের অধীনে বা যে শিক্ষাসমূহ সরকারি তত্বাবধানে চলতো। এখন রাজ্যই নেই সরকারের আশা করা বাতুলতা মাত্র। ভরসা কেবলমাত্র দরদী মুসলমানদের সহায়তা। দুর্ভাগ্য যে আজকের মতো যেভাবে একদেশে মুসলমান মারা গেলে অন্যদেশ যেমন তামাশা দেখছে তেমনি ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের উপর কিয়ামত নেমে আসলেও তাদের উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় ও জানবাজ মুজাহিদিন তৈরিই মূল উদ্দেশ্য ছিলো। তারা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মসজিদ মাদ্রাসা। ফাঁসির কাষ্টে হাজার হাজার উলামাদের টাঙ্গিয়ে দিয়ে বেনিয়ারা একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বসে। এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিলো দায়।10677418_539373276227811_1614355827_o

হুজ্জাতুল ইসলাম কাসিম নানুতবী রাহ. খুব বিচক্ষণতার সাথে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্ততি নিলেন।ইতিহাস সাক্ষী, এই দারুল উলূম দেওবন্দের সুর্যসন্তানরাই বেনিয়াদের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা এনেছেন। কিন্তু রাজ্যটা ধরে না রাখার পেছনে আছে বহু চড়াই-উতরাই আর কাফিরদের ষড়যন্ত্র। কাসিম নানুতবীর কাছে তখনকার যুগে মাদরাসা পরিচালনার জন্য জনগণের কাছে চাঁদা সংগ্রহ ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলো কি? আর দেশ এবং জাতির সর্বস্তরের নাগরিককে স্বাধীনতাযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাদের কাছে যাওয়াও ছিলো কর্তব্য। মাদারাসার জন্য চাঁদা সংগ্রহের সুযোগে তরুণদের কালেকশন করে এনে ট্রেনিং-প্রশিক্ষণ, তা’লিম সবই চলতো একসাথে। চাঁদার বিষয়টা সামনে না থাকলে সহসা ধরা পড়ে যাবার আশংকা থাকতো। তাই এই কৌশলটা ছিলো খুবই সময়োপযুগী ও যথাযথ। বেশি বেশি করে চাঁদা সংগ্রহের কথা আমাদের সেদিকেই ইংগিত দেয় যে, মুজাহিদিনদের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন আছে।

তিনি নিজে একজন সেনাপতি। যুদ্ধের পর যুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে বুঝতে পেরেছেন যে, গোটা জাতির ঈমান দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাদশাহীর অধীনে থেকে মুসলমানরা ফার্মের মুরগির মতো জীবনে অভ্যস্ত। দুশমনের সাথে মোকাবেলা করা বা পরাধীনতা কী তা তারা জানেই না। ইংরেজ এবং তার দোসরদের কুমন্ত্রণায় পা দিয়ে বারবার নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে। অতএব আগে জানবাজ চৌকস একটি বাহিনী গঠনের প্রয়োজন। এমনি গুরুত্বপুর্ণ পরিকল্পনা নিয়েই কালের এই সিংহপুরুষ দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করে তার মূলনীতি নির্ধারণ করেন। তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের চলমান বা সমকালীন পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই তিনি এই মূলনীতিগুলো সন্নিবেশতি করেছিলেন।

এই মূলনীতি কি ওহী?

না মোটেই না। এমনকি কেউ যদি সওয়াবের নিয়তে সাধারণ মুস্তাহাবও বলে তাহলে পাক্কা বিদাতী বলে গন্য হবে গোনাহগার হবে। আল্লামা ইলিয়াস রাহ.’র তাবলীগী আন্দোলনের দিকে যদি আমরা তাকাই, তখন ঠিক একই নজরিয়া দেখতে পাই। তিনিও এই আন্দোলনের জন্য ৬টি  উসুল নির্ধারণ করে দেন। মকবুল এই জামাতের ৬ উসুল কি শরীয়তের কোন বিধান? না, অবশ্যই না; বরং ছয় উসুলের ভিতর ইসলামের বুনিয়াদী বিষয় যুক্ত আছে। অনেক তাবলিগি ভায়েরা ৬ উসুলের বাইরে চিন্তা করাকেই নাজায়েয মনে করেন। অথচ হজরত  ইলিয়াস রাহ. কাজের সুবিধার্থে ভারতবর্ষের মানুষের ঈমান ও আমলের পরিস্থিতিতি দেখে বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন। ৬ উসুল না মেনে কেউ যদি ১০ উসুল করে বা ইসলামের স্তম্ব ৫টি করে তাতে কিছু যায় আসে না। অতএব বুঝতে হবে ৮ মূলনীতি শরীয়তের কোন বিধান নয়। সময় ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী যখন যেমন তখন তেমন করতে কোন আপত্তি নেই।

১ম মূলনীতিতে মৌলিকভাবে আমরা ৩টি দিকনির্দেশনা পাই।

ক- চাঁদা করবেন মাদরাসার কর্মকর্তাগণ।

খ- নিজে চেষ্টার পাশাপাশি অন্য কারো সাহায্য নিয়ে।

গ- মাদরাসার কল্যাণকামীদেরও দায়িত্ব তারা যেন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করে।

এখানে ছাত্রদের দ্বারা কালেকশনের কোন অবকাশ নেই। মাদরাসার নির্ধারিত কর্মচারি বা কর্মকর্তাবৃন্দ এই দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন। অন্যান্য বলতে আরো যাদের কথা বলা হয়েছে তাঁরা কারা? তাঁরা অপরাপর উস্তাজ মুন্তাজিমিনদের বুঝানো হয়েছে।

কল্যাণকামী বলতে কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় নেক, দ্বীনদার মানুষের দান-খয়রাতের কথা। কথা হলো এই দিকনির্দেশনা আপতকালীন সয়ের জন্য। দ্বীনদারী কম হলেও যখন মুসলমানদের নিজস্ব ভূমি বা দেশ হয়ে যাবে তখন চাঁদার বিষয়টির জরুরত রহিত হয়ে যায়। মুসলমান সরকারকে বাধ্য করা সরকারি খাজানা থেকে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে ফান্ড প্রদান। এবং উলামাদের উচিত রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের বেতন-ভাতা পাওয়ার অধিকারের আওয়াজ বুলন্দ করা। তবে হ্যাঁ, রাষ্ট্র যদি বেতন-ভাতার সাথে ঈমান-আমল কিনে নেয়ার চেষ্টা করে, তখন ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করা। কিংবা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত আয়ের পথ বের করা।

ইসলামের প্রথম জামানায় রাসুল সা. এবং সাহাবাগণ নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করেছেন। তবে ঘরে ঘরে গিয়ে নয়। পথে-ঘাটে ঘোড়া-গাড়ি খাড়া করে নয়। ছোট শিশুদের দিয়ে নয়। যারা দায়িত্বশীল তারা করবে বিশেষ বিশেষ সময়। কিন্তু যখন মুসলমানদের সুদিন ফিরে আসলো তখন থেকে রাষ্ট্রীয় খাজানা থেকে ভাতা দেয়া শুরু হলো। যা আজ অবদি কাফির রাষ্ট্রগুলোতে বহাল। কে কোন দল বা মতের উপর তা দেখা হয়না। দেশের নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়া শাসকদের উপর কর্তব্য। সে হিসেবে বলবো, চাঁদা করার বিষয়টি ইমার্জেন্সি-জরুরী ভিত্তিতে। বছরের বারো মাসই যুগের পর যুগ যদি ইমারজেন্সি লেগেই থাকে, জরুরি হালত বহাল থাকে তাহলে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হবে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সবসময় থাকে না বা থাকতে পারে না।

তাই আট উসুলের ১ম উসুল বলবো, বিশৃঙ্খল হালতের উপর নির্ভর করে উজুদে এসেছিলো। স্বাভাবিক জীবনে সবসময়ের জন্য তা কার্যকর নয় বা কাম্য হতে পারে না।

লেখক : খতিব ও কওমি গবেষক

About Islam Tajul

mm

এটাও পড়তে পারেন

প্রশ্নপত্র ফাঁস সমাচার, বেফাক ও হাইয়ার দ্বায়!

খতিব তাজুল ইসলাম: কলামের শুরু এবং শেষ নিয়ে বেশ বিব্রতে আছি। পুরাটাই আগুছালো অবস্থা। স্বকীয়তার ...